মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিতাড়নের পর সেনাবাহিনী তাদের গ্রাম ও মসজিদ ভেঙে ফেলেছে। রোহিঙ্গাদের জমি দখল করে সেখানে নিরাপত্তা ঘাঁটি নির্মাণ করেছে তারা। জাতিসংঘের উদ্যোগে পরিচালিত একটি তদন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, প্রতিবেদনটি গতকাল সোমবার প্রকাশিত হয়েছে।
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে পুলিশের কমপক্ষে ৩০টি চৌকিতে সশস্ত্র হামলা হয়। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১২ সদস্য নিহত হন। এরপর সেনাবাহিনী দমন অভিযান শুরু করলে রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন হয়। ফলে উপকূলীয় এই রাজ্য থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালায়। তখন বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল নামে। এরপর থেকে বাংলাদেশের জনাকীর্ণ শরণার্থীশিবিরে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। জাতিসংঘ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এ অভিযানকে ‘জাতিগত নিধনের স্পষ্ট উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
জাতিসংঘের উদ্যোগে গঠিত ইনডিপেনডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার (আইআইএমএম) তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘মিয়ানমার কর্র্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে রোহিঙ্গাদের গ্রাম, মসজিদ, কবরস্থান ও কৃষিজমি ধ্বংস করেছে। তারা সরকারি নথির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জমির মালিকানা সম্পর্কে জানত।’
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০১১ সাল থেকে মিয়ানমারে সংঘটিত গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধ তদন্তের জন্য ২০১৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ আইআইএমএম গঠন করে।
প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, স্যাটেলাইট চিত্র, ভিডিও ফুটেজ ও সরকারি নথির ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে আইআইএমএম। রয়টার্স মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মুখপাত্রের কাছে প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আগে বলেছিল, ২০১৭ সালের অভিযানে তারা গণহত্যা চালায়নি। তবে ব্যক্তিগতভাবে অপরাধ ঘটে থাকতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আগের দিন এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের শরণার্থীশিবিরের ক্রমবর্ধমান সংকট ও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার স্থবিরতা নিয়ে আলোচনা হবে।
আইআইএমএমের তদন্তে দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের গ্রাম ধ্বংস করতে রাষ্ট্রীয় চুক্তির অধীনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা যন্ত্রপাতি ও শ্রমিক সরবরাহ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে ইন দিন গ্রামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে সেনাবাহিনী বসতি ধ্বংস করে নতুন স্থাপনা তৈরি করেছে। ২০১৮ সালে রয়টার্স জানিয়েছিল, এই গ্রামে ১০ জন রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ইন দিনের মতো গ্রামগুলো ধ্বংস করে ধ্বংসাবশেষের ওপর ঘাঁটি নির্মাণ করা হয়। জমি খালি করে সেখানে নতুন সড়ক, স্থায়ী ভবন, সুরক্ষিত কম্পাউন্ড ও দুটি হেলিপ্যাড তৈরি করা হয়।’
রোহিঙ্গারা অস্ত্র হাতে তুলছে : ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে সেনাবাহিনী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করার পর থেকে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। এরপর গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। বর্তমানে রাখাইনে সংঘাত তীব্র হওয়ায় রোহিঙ্গারা আবারও সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কিছু সদস্য অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছেন।
