তরুণদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় ক্ষমতার পালাবদল হওয়ায় ভারতের শাসক দল বিজেপির আদর্শগত মুরুব্বি সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) উদ্বিগ্ন।
আরএসএস প্রধান মোহন ভগবত বিজয়া দশমী উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার নাগপুরে সংগঠনের সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ উদ্বেগের কথা জানান।
প্রতিবেশী দেশগুলোয় অস্থিরতা ভালো লক্ষণ নয়, এমনটা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জনগণের ক্ষোভ থেকে তৈরি হওয়া সহিংস গণবিস্ফোরণে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও সম্প্রতি নেপালে সরকারে পালাবদল ঘটে গেছে। এ বিষয়টি ভারতের জন্যও উদ্বেগের।’
নৈরাজ্য দেখা দিলে বিদেশি শক্তি সুযোগ খোঁজে, এমনটা উল্লেখ করে আরএসএস নেতা বলেন, ভারতেও একই ধরনের ঝামেলা তৈরির জন্য দেশের ভেতরকার ও বাইরের শক্তি সক্রিয় রয়েছে।
ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া ‘পাল্টা শুল্কের’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো রাষ্ট্রই বিচ্ছিন্ন থেকে টিকতে পারে না। পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রগুলো টিকে থাকে। তবে এ নির্ভরতা ‘বাধ্যতামূলক’ করা যাবে না।
বাংলাদেশের বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রতিবেশী বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাসহ কোনো দেশের সঙ্গেই ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ভালো নেই। ভারতের প্রভাব বিস্তারের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার দিকগুলোও সেভাবে বিকশিত হয়নি। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে ভারতকে তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় ধর্মীয় উগ্রবাদকে মোকাবিলা করে গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশ ঘটাতে হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে আরএসএস প্রধানের এ বক্তব্য কীভাবে দেখেন এমন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘরের ভেতর দুর্বলতা থাকলে বিদেশি শক্তি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবেই। দেশের ভেতরে অগণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি হতে থাকলে, ব্যাপক দুর্নীতি চলতে থাকার পরও তা দমনে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এবং স্থানীয়ভাবে বিভাজন বাড়তে থাকলে বিদেশিরা একটা কিছু করতে চাইবে।’
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের বিষয়ে আওয়ামী লীগ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ‘এখানে একটি দলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বড় আকারে ছিল। জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল না। যিনি সরকারে ছিলেন, তিনি দেখিয়েছেন ভারত আমাদের সঙ্গে আছে। ভারতও দেখিয়েছে সরকার তাদের সঙ্গে আছে। এতে লেবু কচলালে যা হয় তাই হয়েছে। তেতো হয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে হলে যে যে কারণে সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে ভিন্নতা আনতে হবে।
গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ত্যাগ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতে চলে যান।
আরএসএস প্রধানের বক্তব্যের বিষয়ে একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ভারত তার প্রতিবেশী অঞ্চলকে গুরুত্ব দেয় এটা মোহন ভগবতের বক্তব্যে স্পষ্ট। একই কারণে তারা এখন নানারকম কাহিনি তৈরির চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘সহিংসতার মাস্টার এখন বলছে সহিংসতা চাই না।’
বাংলাদেশে উগ্রবাদী শক্তির সঙ্গে আরএসএসের পরোক্ষ হলেও যোগাযোগ থাকতে পারে এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এর ফলে বাংলাদেশে উগ্রবাদীদের প্রভাব বাড়লে ভারতেও উগ্রবাদের বিস্তার জায়েজ হয়ে যায়। তবে বাংলাদেশে সরকার কীভাবে বিষয়গুলো সামাল দেয়, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে গতকাল আলাপকালে সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. আব্দুল হাই বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশ ও টিকে থাকার ক্ষেত্রে ধর্মীয় উগ্রবাদকে পরাস্ত করাই আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ।’
