জর্ডানের একটি শরণার্থী শিবিরে বেড়ে উঠা ফিলিস্তিনি বিজ্ঞানী ওমর ইয়াগি রসায়ন শাস্ত্রে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কার জিতেছেন চলতি বছর। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানোর সম্ভাবনাময় এক নতুন ধরনের আণবিক স্থাপত্য (মলিকিউলার আর্কিটেকচার) উদ্ভাবনের জন্য নোবেল জিতেছেন তিনি।
এ বছর যৌথভাবে রসায়নে নোবেল জিতেছেন ওমর ইয়াগি, সুসুমু কিতাগাওয়া ও রিচার্ড রবসন। তাদের কাজ ছিল ‘মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস বা এমওএফ’ উদ্ভাবন। এগুলো এমন একটি আণবিক কাঠামো যা ক্ষতিকর গ্যাস ও রাসায়নিক পদার্থ সংগ্রহ, সংরক্ষণ বা ভেঙে ফেলতে ব্যবহৃত হতে পারে।
সুইডিশ একাডেমি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এমওএফ প্রযুক্তি ব্যবহার করে মরুভূমির বাতাস থেকে পানি আহরণ, কার্বন ডাই–অক্সাইড সংগ্রহ, বিষাক্ত গ্যাস সংরক্ষণ, কিংবা রাসায়নিক বিক্রিয়াকে অনুঘটক হিসেবে পরিচালনা করা সম্ভব। এই আবিষ্কারগুলো মানবজাতির সবচেয়ে বড় কিছু সংকট সমাধানে অবদান রাখতে পারে।
তবে নোবেল জেতার খবর জানার পর, ইয়াগি নোবেল পুরস্কার প্রচার বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অ্যাডাম স্মিথের সঙ্গে টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি ‘বিস্মিত, আনন্দিত ও অভিভূত।’ স্মিথ উল্লেখ করেন, ৬০ বছর বয়সি ইয়াগি সম্ভবত জর্ডানে জন্ম নেওয়া প্রথম নোবেল বিজয়ী।
ইয়াগি জর্ডানের রাজধানী আম্মানের এক ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরে জন্মগ্রহণ ও বেড়ে ওঠেন এবং ১৫ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।
তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমি খুবই সাধারণ এক পরিবারে বড় হয়েছি। আমরা ডজনখানেক মানুষ এক ছোট ঘরে থাকতাম, যেখানে আমাদের পালিত গবাদিপশুদের সঙ্গেও স্থান ভাগ করে নিতে হতো। আমি শরণার্থী পরিবারের সন্তান, আর আমার বাবা-মা প্রায় পড়তেও পারতেন না, লিখতেও না।’
‘তাই এই যাত্রা ছিল এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা, আর বিজ্ঞানের কারণেই তা সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞানই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমতাসৃষ্টিকারী শক্তি। বুদ্ধিমান, প্রতিভাবান ও দক্ষ মানুষ পৃথিবীর সর্বত্রই আছে। তাই আমাদের উচিত তাদের সম্ভাবনা উন্মোচনের দিকে মনোযোগ দেওয়া।’
জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ এক্স-এ পোস্ট করে এই বিজ্ঞানীকে অভিনন্দন জানিয়ে লেখেন, ‘রসায়নে ২০২৫ সালের নোবেল পুরস্কার জয়ের জন্য জর্ডানের বিজ্ঞানী অধ্যাপক ওমর ইয়াগির প্রতি গর্বিত। তার অর্জন জর্ডানের গর্ব।’
ইয়াগি ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলিতে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।
এক্স-এ পোস্ট করা এক বার্তায় ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মোহাম্মদ শেহাদা ইয়াগির বেড়ে ওঠার ‘দারিদ্র্যপূর্ণ বাস্তবতা’র দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, গাজায় শত শত মেধাবী গবেষক ও অধ্যাপক ইসরায়েলের গণহত্যায় নিহত হয়েছেন।
নোবেল কমিটির রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান হেইনার লিঙ্কে এক বিবৃতিতে বলেন, ইয়াগি ও তার সহকর্মীরা এমন উপায় আবিষ্কার করেছেন যার মাধ্যমে পুরোপুরি নতুন ধরনের পদার্থ তৈরি করা যায়। যার ভেতরে বিশাল ফাঁকা স্থান থাকে, প্রায় যেন কোনো হোটেলের ঘরের মতো, যেখানে অণুগুলো প্রবেশ করতে এবং আবার বেরিয়ে যেতে পারে।
এই পদার্থগুলোর অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে কমিটি জানায়, এগুলোর কিছু এতটাই ছিদ্রযুক্ত ও বিস্তৃত যে একটি ছোট ‘সুগার কিউব’ আকারের পদার্থের ভেতরে একটি বড় ফুটবল মাঠের সমান পৃষ্ঠতল থাকতে পারে।
লিঙ্কে এই আবিষ্কারকে তুলনা করেন হ্যারি পটারের হারমায়োনির হ্যান্ডব্যাগের সঙ্গে, কারণ এটি অতি ক্ষুদ্র স্থানে বিপুল পরিমাণ গ্যাস সংরক্ষণ করতে সক্ষম।
তিনি আরও বলেন, রসায়নবিদদের এই কাজের রয়েছে অসীম সম্ভাবনা যা সম্পূর্ণ নতুন কার্যকারিতাসম্পন্ন, নির্দিষ্ট চাহিদাভিত্তিক পদার্থ তৈরির পথ উন্মুক্ত করেছে।
ইয়াগি শেষে বলেন, ‘আমি সুন্দর কিছু নির্মাণ করতে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলাম।’
