ইসলাম নারীকে মা, বোন, স্ত্রী, কন্যা হিসেবে সর্বোচ্চ মর্যাদায় ভূষিত করেছে। পুরুষের জীবনে নারী হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে পবিত্র উপহার। যার উদ্দেশ্য হচ্ছে সুখ-শান্তি ও স্বস্তি লাভ করা।
পুরুষের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার ও মর্যাদা দান করা এবং নারীর জীবনে সুখ-শান্তি নিশ্চিত করা। কারণ কোনো নারী যদি তার পরিবারে লাঞ্ছিত ও অসম্মানিত হয়, তার জীবনে যদি অশান্তি থাকে তাহলে সে পুরুষের জন্য সুখ-শান্তি ও স্বস্তির মাধ্যম কিছুতেই হতে পারবে না। তাই ইসলাম নারীর হকের ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের সঙ্গে অত্যন্ত কোমল আচরণের নির্দেশ দিয়েছে। এখানে নারীজীবনের মর্যাদার নানা দিক নিয়ে বিবরণী তুলে ধরা হলো।
কন্যা হিসেবে নারীর মর্যাদা : হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুটি কন্যা সন্তান লালন-পালন ও দেখাশোনা করবে, (বিয়ের সময় ভালো পাত্রের কাছে বিয়ে দেবে) সে এবং আমি জান্নাতে এরূপ একসঙ্গে প্রবেশ করব, যেরূপ এ দুটি আঙুল। তিনি নিজের দুই আঙুল মিলিয়ে দেখালেন।’ (তিরমিজি ১৯১৪)
নারীর সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তাদের সঙ্গে সৎভাবে জীবনযাপন করো। তোমরা যদি তাদের অপছন্দ করো, তবে এর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে যে, তোমরা কোনো জিনিসকে অপছন্দ করছ, অথচ আল্লাহ তাতে প্রভূত কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।’ (সুরা নিসা ১৯)
নবীজির সুপারিশ : হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা স্ত্রীদের জন্য মঙ্গলকামী হও। কারণ নারীকে পাঁজরের (বাঁকা) হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড়ের সবচেয়ে বেশি বাঁকা হলো তার ওপরের অংশ। যদি তুমি এটাকে সোজা করতে চাও, তাহলে ভেঙে ফেলবে। আর যদি তাকে ছেড়ে দাও তাহলে তো বাঁকাই থাকবে। তাই তোমরা নারীদের জন্য মঙ্গলকামী হও।’ (সহিহ বুখারি ৩৩৩১)
গর্ভাবস্থায় মারা গেলে শহীদি মর্যাদা : ইবনে জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়া ছাড়াও আরও সাত ধরনের শহীদ আছে। এক. মহামারীতে মৃত্যুবরণকারী শহীদ। দুই. পানিতে মৃত্যুবরণকারী শহীদ। তিন. পক্ষাঘাতে মৃত্যুবরণকারী শহীদ। চার. পেটের রোগের কারণে (কলেরা, ডায়রিয়া ইত্যাদিতে) মৃত্যুবরণকারী শহীদ। পাঁচ. অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ। ছয়. কোনো কিছুর নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ। সাত. যে নারী গর্ভাবস্থায় মারা যায় সেও শহীদ।’ (আবু দাউদ ৩১১১)
গর্ভবতীর পুরস্কার : একজন গর্ভবতীর জন্য মহান আল্লাহ পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। কষ্টের কারণে সে অফুরন্ত সওয়াব পায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নারী সাহাবি সালামা (রা.)-কে বলেছেন, তোমাদের কেউ কি এতে খুশি নয় যে, সে স্বামী কর্র্তৃক গর্ভবতী হয় এবং স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্টও থাকে? তখন (এই গর্ভকালীন) সে আল্লাহর পথে সর্বদা রোজা পালনকারী ও সারা রাত নফল ইবাদতকারীর মতো সওয়াব পাবে। তার যখন প্রসবব্যথা শুরু হয়, তখন তার জন্য নয়ন শীতলকারী কী কী নেয়ামত লুকিয়ে রাখা হয়, তা আসমান-জমিনের কোনো অধিবাসী জানে না। সে যখন সন্তান প্রসব করে তখন তার দুধের প্রতিটি ফোঁটার পরিবর্তে একটি করে নেকি দেওয়া হয়। এই সন্তান যদি কোনো রাতে তাকে জাগিয়ে রাখে (অসুখ ইত্যাদির কারণে বিরক্ত করে মাকে ঘুমাতে না দেয়) তাহলে সে আল্লাহর পথে ৭০টি দাস আজাদ করার সওয়াব পাবে। (তাবরানি ৬৯০৮)
মা হিসেবে নারীর মর্যাদা : হজরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, একটি লোক রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার কাছ থেকে সদ্ব্যবহার পাওয়ার বেশি হকদার কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার বাবা। (সহিহ বুখারি ৫৯৭১)
বোন হিসেবে নারীর মর্যাদা : ইসলাম ধর্মে বোনের মর্যাদা অনেক। কারণ রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের মধ্যে ভাই-বোনের সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি। তাই যে ব্যক্তি বোনদের প্রতি যতœশীল হবে তাদের ফজিলতের কথা তুলে ধরে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, যার তিনটি মেয়ে বা তিনটি বোন আছে, অথবা দুটি মেয়ে বা দুটি বোন আছে, সে তাদের প্রতি ভালো ব্যবহার করলে এবং তাদের (অধিকার) সম্পর্কে মহান আল্লাহকে ভয় করলে তার জন্য জান্নাত নির্ধারিত আছে। (তিরমিজি ১৯১)
স্ত্রী হিসেবে নারীর মর্যাদা : স্ত্রী হিসেবে ইসলাম নারী জাতিকে অধিকার ও মর্যাদা দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ এবং তোমরাও তাদের জন্য পোশাকস্বরূপ।’ (সুরা বাকারা ১৮৭)
মোহর নারীর মর্যাদা : মোহর মূলত একটি সম্মানী, যা স্বামী তার স্ত্রীকে দিয়ে থাকে, যার মূল উদ্দেশ্যই হলো নারীকে সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া। স্বামীর ওপর মোহর ফরজ করে শরিয়তের উদ্দেশ্য হলো, যখন কোনো পুরুষ স্ত্রীকে ঘরে আনবে তখন তাকে মর্যাদার সঙ্গে আনবে এবং এমন কিছু উপহার দেবে, যা তাকে সম্মানিত করে। আর সেটাই হচ্ছে মোহর। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা খুশি মনে নারীদের মোহর আদায় করো। তারা নিজেরা যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার কিছু অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা সানন্দে, স্বাচ্ছন্দ্যভাবে ভোগ করতে পারো।’ (সুরা নিসা ৪)
নারী জাতিকে কেউ যেন হয়রানি করতে না পারে, এ কারণে নারীকে শরিয়ত বোনের দৃষ্টিতে দেখেছে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নারীরা পুরুষদের সহোদর (বোন) স্বরূপ।’ (আবু দাউদ ২৩৪)
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া কাশেফুল উলুম মাদ্রাসা
মধুপুর, টাঙ্গাইল
