রসিকতার ছলে প্রায়ই বলা হয়, পৃথিবীতে যদি কখনো ভয়াবহ পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটে তবে মানবজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে তেলাপোকাই। ২০০৮ সালের পিক্সার চলচ্চিত্র ‘ওয়াল-ই’-তে এই পৌরাণিক কাহিনিটিকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেছিল। ওই সিনেমাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীতে একাকী আবর্জনা সংগ্রহকারী রোবট ‘ওয়াল-ই’র একমাত্র সঙ্গী হিসেবে দেখানো হয়েছিল এক তেলাপোকাকে, যেন সে-ই শেষ জীবিত প্রাণ। এমনকি বাংলা সাহিত্যেও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের তার ‘বিলাসী’ উপন্যাসে বলেছেন, ‘অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।’
কিন্তু এ দাবির পেছনে সত্যতা কতটা? মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী যেখানে পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরবর্তী বিকিরণে টিকে থাকতে পারবে না, সেখানে কি তেলাপোকা সত্যিই বেঁচে থাকতে পারবে? ‘ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন’-এর নোবেলজয়ী অধ্যাপক ও পারমাণবিক অস্ত্রের স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে গবেষক টিলম্যান রাফ বলেছেন, তিনি কখনো এমন কোনো প্রমাণ দেখেননি যে, বোমা হামলার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তেলাপোকারা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ লিখেছে, পারমাণবিক তেজষ্ক্রিয়ায় ধ্বংসযজ্ঞের প্রভাব থেকে তেলাপোকা রেহাই পেয়েছে এমন প্রমাণ নেই।
এ দাবিটি যাচাইয়ের জন্য ২০১২ সালে বিভিন্ন তেলাপোকাকে তেজস্ক্রিয় পদার্থের সংস্পর্শে এনে পরীক্ষা চালায় মার্কিন টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘মিথবাস্টার্স’। পরীক্ষার ফলাফলে উঠে এসেছে, তেলাপোকা মানুষের তুলনায় অনেক বেশি মাত্রার বিকিরণ সহ্য করতে পারে। তবে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার বিকিরণে এরাও শেষ পর্যন্ত মারা যায়। অন্যান্য গবেষণায় দেখা মিলেছে, মানুষের তুলনায় প্রায় ৬ থেকে ১৫ গুণ বেশি বিকিরণ সহ্য করতে পারে তেলাপোকা। তবে এরাই সবচেয়ে সহনশীল পোকামাকড় নয়। গবেষকদের মতে, ফলের মাছি ও মাটির গভীরে বাস করা কিছু প্রজাতির পিঁপড়ে তেলাপোকার চেয়েও বেশি সময় টিকে থাকতে পারে, এমনকি বিপর্যয়-পরবর্তী সময়ের পৃথিবীতেও।
তবে পারমাণবিক বিপর্যয়ের পর টিকে থাকা শুধু বিকিরণ সহ্যের বিষয় নয়, বরং খাবারের অভাবও বড় সমস্যার বিষয়। তেলাপোকারা সাধারণত জৈব বর্জ্যে খাবার খায় এবং এরা শুরুতে পচা শরীর বা ধ্বংসাবশেষের ওপর কিছুক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে। তবে এক সময় খাবারের উৎস শেষ হয়ে যাবে। ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের অধ্যাপক মার্ক এলগার বলেছেন, মানুষ বা অন্য প্রাণীরা যদি বর্জ্য তৈরি না করে তবে তেলাপোকাদের বেঁচে থাকা কঠিন হবে। চেরনোবিল থেকে প্রমাণ মিলেছে, প্রতিটি জীব, বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, পোকামাকড়, পাখি ও স্তন্যপায়ীদের মধ্যে এই বিকিরণের প্রভাব কম। পরীক্ষাগারের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মানুষের চেয়ে বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে পোকামাকড়। তবে বাস্তব পারমাণবিক ঘটনার ফলে ধ্বংসের মাত্রা অনেক বেশি। এ সময় পরিবেশ দূষিত হবে, বাস্তুতন্ত্র ভেঙে যাবে ও খাদ্য শৃঙ্খল ব্যাহত হবে। এমন পরিস্থিতিতে শেষপর্যন্ত তেলাপোকাও বেঁচে থাকতে পারবে না।
