বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় বিপত্তি ঘটে যায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে। ২০২৪ সালের আগস্টের এ ঘটনার জন্য ভারত প্রস্তুত ছিল না। সেই থেকে সম্পর্কে শীতলতা চলছে। দেশটি এখন বাংলাদেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলছে।
এই সম্পর্ক আবার গড়ার ক্ষেত্রে দুই প্রতিবেশীর পরস্পরের ওপর আস্থাহীনতা একটি বড় বাধা, এমনটা মনে করছেন এপার-ওপারের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বহুমাত্রিক এই সম্পর্কের ওঠানামা সবসময়ই ছিল। কিন্তু গত ১৬/১৭ বছর যা যেভাবে হয়েছে, আর এখন যা চলছে, দুটিই অস্বাভাবিক। সীমান্তের উভয় দিকের মানুষের স্বার্থে এই অস্বাভাবিকতা কাটিয়ে উঠে সমতাভিত্তিক, পরস্পরের জন্য সম্মানজনক ও স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে নজর দেওয়া দরকার।
বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে বাংলাদেশের বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত যেটাকে ‘সোনালি অধ্যায়’ হিসেবে অভিহিত করত, সেই ১৬/১৭ বছর দেশটির সরকার বাংলাদেশে জনগণের পরিবর্তে কেবল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এটা যে একটি ‘ভুল’ ছিল, তা ভারত এখন বুঝতে পেরেছে কি না, এটা গুরুত্বপূর্ণ। যদি বুঝে থাকে সেটা তারা শোধরাবে কি না, তার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার সম্পর্ক কোন দিকে যাবে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বলটা অনেকটা ভারতের কাছে। দিল্লি কেবল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার ভুলটা শোধরাবে কি না, এখানে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করবে কি না, তার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে সম্পর্ক কেমন হবে।’
প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক অনেক দিক আছে, এটা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এর ওপর বহু মানুষের জীবন ও জীবিকা জড়িত। কিন্তু ভারত সম্ভবত ভুলে গেছে একটি সার্বভৌম দেশের সঙ্গে সম্পর্কে কী কী করা ঠিক নয়। এ কারণে তারা বাড়াবাড়িও করেছে। সম্পর্ক ভালো করতে হলে ভারতকে এমন দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।’
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি গত ৬ অক্টোবর দিল্লিতে সাংবাদিকদের জানান, দেশটি বাংলাদেশের সঙ্গে মানুষকেন্দ্রিক ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক চায়। এখানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করার জন্য ভারত অপেক্ষা করছে। তবে তিনি একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন যত শীঘ্র সম্ভব হওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
আগামী জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে ভারত সরকারের এ মন্তব্য ‘অযাচিত,’ এমনটা উল্লেখ করে পরদিন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
স্থানীয় কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশসহ অধিকাংশ প্রতিবেশীর ওপর ভারত ‘জবরদস্তিমূলক এক ধরনের সম্পর্ক’ চাপিয়ে দেয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেশটি সরে আসবে কি না, সে বিষয়ে সন্দিহান বাংলাদেশে কর্মরত কূটনৈতিকরা।
বিক্রম মিশ্রি দিল্লিতে বাংলাদেশের একদল সাংবাদিকের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রায় সব বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন, ১০টি প্রশ্ন নেন। কেবল ‘জবরদস্তিমূলক সম্পর্ক’ চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়ে করা প্রশ্নটি তিনি এড়িয়ে যান। আর সম্পর্ক কেবল ‘একটি দলের সঙ্গে,’ এ অভিযোগ অনেকটা অস্বীকার করে তিনি বলেন, অন্যদের উপেক্ষা করা হয়, বিষয়টি এমন নয়।
বাংলাদেশের একজন সাবেক হাইকমিশনার বলেন, ভারত এখানে ১৬/১৭ বছর নিজের পছন্দমতো সরকার দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ‘যেমন ইচ্ছে’ করতে পেরেছে। ‘যখন যে সরকার একটি দেশে থাকে, তার সঙ্গেই কাজ করা’ একটি আন্তর্জাতিক রীতি হলেও ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতন মেনে নিতে না পারা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কে শীতলতা দেখানোর একটি কারণ হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার সীমিত সময়ের জন্য, এটাও একটি কারণ হতে পারে।
ভারতীয় বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এর আগে এত খারাপ কখনো হয়নি।
দুই দেশের সরকারিপর্যায়ে আস্থার অভাব আছে, এটা স¦ীকার করে ঢাকায় দেশটির সাবেক এক হাইকমিশনার দিল্লিতে গত ৭ অক্টোবর বলেন, ‘স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী’ চায় না দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ভালো থাকুক। আর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণেও বিরোধ তৈরি হয়। কিন্তু তাতে অসুবিধা হয় দুই দেশের মানুষের।
ভারতকে একটি ‘কোলাহলপূর্ণ গণতন্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, এ কারণে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। সম্পর্কে চড়াই-উৎরাই আছে। এটা সামাল দেওয়ার দক্ষতা দুই দেশের নেতাদের থাকতে হবে। সম্পর্ক ভালো করার ক্ষেত্রে ‘আশা ছেড়ে না দেওয়ার’ ওপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন।
ভারতের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বলেন, সীমান্ত আর প্রতিবেশী যেহেতু বদলানো যাবে না, দুই দেশকেই পরস্পরের জন্য আস্থার সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। মানবিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিকগুলো বিবেচনায় রেখে ‘দরজা বন্ধ’ রাখার নীতি থেকে সরে আসতে হবে।
বাংলাদেশের একজন ঊর্ধ্বতন কূটনীতিক বলেন, ভারত ভেতর থেকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিগত তিন দশক ধরে অনেক বদলে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও ভবিষ্যতে এর প্রভাব পড়ার ঝুঁকি আছে। এ কারণে ভবিষ্যতে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারে যারাই আসবে, তাদের সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে।
