ট্রাম্প-মোদির দূরত্ব কমছে!

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৫, ০২:৪১ এএম

গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি জেপি মর্গানের প্রধান জেমি ডিমন বিবিসির বিজনেস এডিটর সাইমন জ্যাকের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বোমা ফাটানোর মতো তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, মার্কিন প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তার কাছ থেকে তিনি শুনেছেন যে, দীর্ঘ জটিল আলোচনার পর ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ট্যারিফ নিয়ে একটি ‘ব্রেকথ্রু’ অর্জিত হয়েছে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের পথ প্রশস্ত হচ্ছে, যা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ এবং বৃহত্তম গণতন্ত্রের মধ্যে এই চুক্তি যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা ঐতিহাসিক একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

সেদিন বিবিসির কাছে জেমি ডিমন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ পোষণ করেননি। তিনি আরও কিছু তথ্য শেয়ার করেছিলেন, তবে তা ‘অব দ্য রেকর্ড’ হওয়ায় এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। ওই ঘটনার কয়েক দিন পরেই হোয়াইট হাউজে দিওয়ালি উৎসবের এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয়-আমেরিকান সম্প্রদায়ের উপস্থিতিতে ঘোষণা করেন যে, তিনি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। এ আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল বাণিজ্য এবং ভারতের রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি কমানো। ট্রাম্প এ বিষয়টি খোলাখুলি উল্লেখ করেন। এ সময় তার পাশে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত বিনয় মোহন কোয়াট্রা। এর কিছুক্ষণ পর প্রধানমন্ত্রী মোদি একটি টুইটে জানান, ট্রাম্প তাকে দিওয়ালির শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং তিনি আশা করেন যে, বিশ্বের দুই বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ একসঙ্গে বিশ্বকে আলোকিত করবে। মোদি সরাসরি বাণিজ্যের প্রসঙ্গ উল্লেখ না করলেও তার বক্তব্যে সহযোগিতার সুর ছিল স্পষ্ট।

ভারতের প্রথম সারির অর্থনৈতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য মিন্ট’ তাদের একটি প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে, তিনটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তারা জানতে পেরেছে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর আরোপিত ৫০ শতাংশ ট্যারিফ অচিরেই ১৫ বা ১৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারে। এ সূত্রগুলো আরও জানায়, আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে, যা এ মাসের শেষে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে, সেখানে ট্রাম্প ও মোদির উপস্থিতিতে এই বাণিজ্য চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হতে পারে। তবে ট্রাম্পের সম্মেলনে যোগদান প্রায় নিশ্চিত হলেও মোদি সশরীরে উপস্থিত থাকবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ধারণা করা হচ্ছে, চুক্তির বিষয়ে ঐকমত্য হলে মোদি মালয়েশিয়ায় যেতে পারেন।

ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা হোয়াইট হাউজ এখনো ‘দ্য মিন্ট’-এর এই প্রতিবেদনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ট্যারিফ হ্রাস ও বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা ভারতের শেয়ার বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। গত বৃহস্পতিবার সকালে মুম্বাই শেয়ার বাজারের সূচক প্রায় ৮০০ পয়েন্ট বেড়ে সর্বকালীন রেকর্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ট্যারিফ হ্রাস ও বাণিজ্য চুক্তির শর্ত যুক্তরাষ্ট্র যদি ভারতের ওপর আরোপিত ট্যারিফ কমাতে রাজি হয় এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদিত হয়, তবে তা কোন শর্তে হতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করতে হবে।

রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমানো ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের রপ্তানি পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করেছে, যার অর্ধেকই রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার জন্য ‘জরিমানা’ হিসেবে বিবেচিত। বাকি ২৫ শতাংশ হলো পাল্টা ট্যারিফ, যা মার্কিন পণ্যের ওপর ভারতের আরোপিত শুল্কের প্রতিক্রিয়া। এই ট্যারিফ ১৫ বা ১৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে হলে রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য আরোপিত ২৫ শতাংশ জরিমানা পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে এবং পাল্টা ট্যারিফও উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করা বা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর মাধ্যমেই ভারত এ সুবিধা পেতে পারে। মার্কিন প্রশাসনের সূত্রগুলো বিবিসিকে জানিয়েছে, রাশিয়ার তেলের প্রবাহ ‘পুনর্নির্দেশন’ (রিডায়রেক্টিং ফ্লো) করে এ সমস্যার সমাধান খোঁজা হচ্ছে। সহজ কথায়, ভারত রাশিয়া থেকে কম তেল কিনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি তেল কিনবে।

দিওয়ালির অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত মিলেছে যে, তিনি ভারতকে কিছুটা ছাড় দিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘আমি এইমাত্র প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে কথা বলেছি। আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো। তিনি রাশিয়া থেকে আর বেশি তেল কিনবেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘মোদিও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে এবং এজন্য তিনি রাশিয়ার তেল কেনা কমাবেন। ট্রাম্পের এ বক্তব্য তার পূর্বের কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা নরম হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। ভারতের অফিশিয়াল অবস্থান হলো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা বিশ্ব বাজার থেকে সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য উৎস থেকে তেল কিনবে। তবে বর্তমানে রাশিয়ার তেল আর আগের মতো সাশ্রয়ী নয়।

ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রাশিয়ার তেলের দাম বেঞ্চমার্ক ক্রুডের তুলনায় ব্যারেলপ্রতি ২৩ ডলার কম ছিল, যা এখন মাত্র ২ থেকে ২.৫ ডলারে নেমে এসেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের তেল এখন প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে।

বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্য শর্ত ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে চলছে, তবে এখনো বেশ কিছু জটিলতা রয়ে গেছে। চুক্তির পথে প্রধান বাধা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে কৃষিজাত, ডেইরি ও জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (জিএম) পণ্যের জন্য বেশি প্রবেশাধিকার। ভারত মনে করে, এই দাবি মানলে তাদের কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মোদিও একাধিকবার বলেছেন, কৃষকদের স্বার্থের সঙ্গে আপস করে কোনো চুক্তি হবে না। তবে এখন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে নন-জিএম ভুট্টা ও সয়ামিল আমদানি বাড়াতে রাজি। বর্তমানে ভারত বছরে মাত্র পাঁচ লাখ টন নন-জিএম ভুট্টা আমদানি করে, যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হতে পারে। এ সিদ্ধান্তে চীনের পরোক্ষ ভূমিকাও রয়েছে, কারণ চীন আমেরিকা থেকে ভুট্টা আমদানি অনেক কমিয়ে দিয়েছে। ২০২২ সালে চীন ৫২০ কোটি ডলারের আমেরিকান ভুট্টা আমদানি করলেও ২০২৪ সালে তা কমে ৩৩ কোটি ডলারে নেমেছে। ফলে আমেরিকা নতুন বাজার খুঁজছে এবং ভারত সেই সুযোগ নিতে পারে।

ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে পোলট্রি ফিড, ডেইরি ইনপুট ও ইথানলের চাহিদা বাড়ছে, যা আমেরিকান ভুট্টা আমদানির যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এ ছাড়া, নন-জিএম সয়ামিল আমদানির অনুমোদনেও ভারত প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি দাবি উচ্চমানের চিজসহ ডেইরি পণ্যের শুল্ক কমানো নিয়ে ভারতের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।

চীনের পরোক্ষ ভূমিকা দিল্লি ও ওয়াশিংটনের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, বাণিজ্য চুক্তির একটি মোটামুটি রূপরেখা প্রায় প্রস্তুত। তবে জ্বালানি ও কৃষি খাতের কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ে রাজনৈতিক ছাড়পত্র পাওয়া গেলে চুক্তির ঘোষণা সম্ভব হবে। গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা অজয় কুমার শ্রীবাস্তব মনে করেন, এই চুক্তিতে চীনের পরোক্ষ ভূমিকা থাকবে। তিনি বলেন, ‘চীন তাদের রেয়ার আর্থ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে এবং আমেরিকা-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ তীব্র হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আমেরিকা নতুন সাপ্লাই চেইন তৈরি ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার খুঁজছে। এটি ভারতের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি।’

তিনি আরও বলেন, দর-কষাকষির শেষে আমেরিকা ভারতের জন্য ট্যারিফ ১৬-১৮ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের ১৫ শতাংশের চেয়ে বেশি, তবে ভিয়েতনামের ২০ শতাংশের চেয়ে কম। উপসংহার ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি দুই দেশের সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমানো, আমেরিকান কৃষিপণ্যের জন্য বাজার উন্মুক্ত করা এবং ট্যারিফ হ্রাসের মাধ্যমে এ চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তা উভয় দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে কৃষি ও জ্বালানি খাতের স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক ঐকমত্য এখনো গুরুত্বপূর্ণ। এ চুক্তি সম্পাদিত হলে তা শুধু দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও নতুন গতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত