ফেনী জেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় ৫ বছর হলো। দুই বছরের জন্য গঠিত কমিটি পার করেছে প্রায় ৭ বছর। বয়সের ভারে কুঁজো হয়ে পড়েছে সংগঠনটি। গত ২০১৮ সালের ২২ অক্টোবর ছাত্রদলের ৩৯৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এতে সভাপতি হিসেবে মো. সালা উদ্দিন মামুন এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মোরশেদ আলম মিলন দায়িত্ব পেয়েছিলেন। বর্তমানে ৩৯৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির অধিকাংশ নিয়মিত শিক্ষার্থী নন। কেউ প্রবাসী, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার। এই কমিটিতে থাকা প্রায় শতভাগ নেতাই পড়াশোনায় অনিয়মিত। আবার কমিটির অধিকাংশই বিবাহিত হয়ে কয়েক সন্তানের জনক। বয়সও সবার ত্রিশোর্ধ্ব। যা ছাত্রদলের গঠনতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে কমিটির সভাপতি, সালাহ্ উদ্দিন মামুন (এস এস সি ২০০২) ফেনী কলেজে ভর্তি হন ২০০৩-০৭ শিক্ষাবর্ষে। বিবাহিত ও দুই সন্তানের জনক। বর্তমানে ছাত্রত্ব নাই। সাধারণ সম্পাদক, মোরশেদ আলম মিলন এস এস সি ২০০১, বিবাহিত ও এক কন্যার জনক, বর্তমান ছাত্রত্ব নাই। জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ফরহাদ উদ্দিন চৌধুরী মিল্লাত, এস এস সি ২০০১, বিবাহিত ও দুই সন্তানের জনক, বর্তমান ছাত্রত্ব নাই। কাজী নজরুল ইসলাম দুলাল, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক , এস এস সি ২০০৬, বর্তমান অনিয়মিত ছাত্র-ফেনী ল কলেজ। সাংগঠনিক সম্পাদক ,জাকের হোসেন রিয়াদ এস এস সি ২০০৫, বিবাহিত ও দুই সন্তানের জনক। বর্তমান ছাত্রত্ব নাই। প্রচার সম্পাদক করিমুল হক সুমন, এস এস সি ২০০৩ প্রবাসী, বর্তমান গ্রিস থাকেন। আরিফুল ইসলাম সুমন, এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল ২০১১ সালে, বিবাহিত ও এক সন্তানের জনক।
অর্থাৎ ১২ থেকে ১৫ বছর আগে তারা এসএসসি পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। সাধারণ হিসাব ধরলেও তাদের বয়স অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ বছর হতে পারে। কলেজের নিয়মিত কোর্সের শিক্ষার্থী হিসেবে এক বা দুই বছর বিরতি দেওয়ার পরও সর্বোচ্চ পাঁচ বছরে স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষ করা যায়। সেই সময়সীমা ধরলেও ৪ থেকে ৫ বছর আগে তাদের নিয়মিত ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার কথা। কমিটিতে পদ পাওয়া অন্যদের অবস্থাও এই সাত জ্যেষ্ঠ নেতার মতোই।
জেলা ছাত্রদলের কাজকে গতিশীল করতে নিয়মিত সভার আয়োজন করতে হয়। এতে করে সংগঠনের কাজকে গতিশীল হওয়ার পাশাপাশি সাংগঠনিক কার্যক্রমও বৃদ্ধি পায়। তবে দীর্ঘদিন ফেনী জেলা শাখার কোনো কর্মী সভার আয়োজন করতে পারেননি সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের এক নেতা বলেন, এখনও কর্মী সভা হয়নি। আমাদেরও ইচ্ছে একটি কর্মী সভা আয়োজন করা হবে এবং এতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমরা সাক্ষাৎ করবো। কিন্তু এই কমিটি কর্মী সভার আয়োজন করতে পারেনি। তাছাড়া কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সঙ্গেও কোনো সভার আয়োজন করা হয়নি।
১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মূল দলের ছাত্রসংগঠন হিসেবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল গঠন করেন। সংগঠনটির বয়স এখন ৪৬।
দীর্ঘ এই পথ চলায় কখনোই গঠনতান্ত্রিকভাবে সময়মতো কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করতে পারেনি ছাত্রদল। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান কমিটির মেয়াদ ৭ বছর পূর্ণ হলেও করতে পারেনি পূর্ণাঙ্গ কমিটি। তবে এই পূর্ণাঙ্গ কমিটি না দেওয়ার জন্য নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুকে দায়ী করছেন কমিটির সভাপতি ও সম্পাদক।
অপরদিকে হতাশায় নিমজ্জিত পদপ্রত্যাশীরা নতুন কমিটি না দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সম্পাদককেই দায়ী করছেন। তাদের বক্তব্য, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়েও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড থেমে থাকেনি। ছাত্রদলের জেলা কমিটির মেয়াদ ৭ বছর পেরিয়ে গেলেও সম্মেলন হয়নি। দুই বছরের কমিটি দীর্ঘদিন থাকায় অনেক নেতাই হয়ে উঠেছেন বেপরোয়া। মানছেন না কেউ কাউকে। এমনকি দলীয় অনেক কর্মসূচি পালন করছেন পৃথকভাবে। দলের একাধিক নেতা জানান, ঘুণে ধরা ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা এখন আর কেউ ছাত্র নেই। তাদের কেউ ঠিকাদার, কেউ ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও কেউ আইনজীবী হয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৭ বছর ধরে একই কমিটি থাকায় জেলা ছাত্রদলের অধিকাংশ নেতা ঠিকাদারিতে জড়িয়ে পড়েছেন। কেউ আইনজীবী কিংবা ব্যবসায়ী হয়েছেন। যে কারণে জেলা ছাত্রদল অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। যদিও সংগঠনটিকে গোছাতে কেন্দ্রীয় নেতার নেতৃত্বে একটি টিম গঠন করা হয়েছে। কিন্তু এক বছরেও নেই কোনো অগ্রগতি। তাই সেই টিমের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ছাত্রদলের মাঠপর্যায়ের নেতারা। অনেক নেতাকে বিগত সময়ে দলীয় কার্যক্রমে না দেখা গেলেও, এখন ৫ আগস্টের পর তারা সক্রিয় হয়ে সুবিধা নিতে ব্যস্ত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রদল নেতা বলেন, নতুন কমিটি হয়নি বহু বছর। দলের জন্য সময় দেওয়ার সময় নেই শীর্ষ নেতাদের। কারণ তারা ঠিকাদারিসহ অন্যান্য কাজে ব্যস্ত।
জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম দুলাল বলেন, ‘দীর্ঘদিন এক কমিটি এবং একই লোক থাকায় বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। আমরা যারা কমিটি চাই তারা আলাদা কর্মসূচি পালন করি। সংগঠনে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন নেতৃত্ব দরকার। নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে দল আরও গতিশীল হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা চাই সবাইকে সমন্বয়ের মাধ্যমে, যারা ত্যাগী এবং যোগ্য তাদের মধ্য থেকে ছাত্রদলের নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া হয়।
ছাত্রদল ত্রান ও দুর্যোগ সম্পাদক আবদুর রহীম বলেন, ‘আমরাও নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশী। ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর যে কমিটি হয়েছিল, সেই কমিটি এখনো থাকায় এখন আর কেউ কাউকে মানছেন না। নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। নতুন নেতৃত্বে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
জানতে চাইলে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সালাউদ্দিন মামুন বলেন, আমরা বর্তমানে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে কঠিন প্ররিস্থিতিতে ছাত্রদল সবসময় দলীয় কর্মসূচী পালনের মাধ্যমে দলকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন কমিটি হবে বলে জানান ছাত্রদলের এই নেতা।
আগামী জেলা কমিটিতে পদ প্রত্যাশী ফেনী সদর উপজেলা শাখার আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমান কমিটি ৭ বছর পার হলেও কোনো সাধারণ সভা করেননি। আমরা এ কমিটি ভেঙে দিয়ে সংগঠনকে গতিশীল করতে যোগ্যতার ভিত্তিতে নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলে আমরা তারেক রহমান এর ৩১ দফা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করবো।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব জানান, আমরা আশা করছি যে ফেনীসহ বেশ কয়েকটি জেলা রয়েছে, যেখানে বিগত সাড়ে ১৫ বছর তারা ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে তাদেরকে দিয়ে কমিটি দেয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে। বিষয়টি হচ্ছে যারা প্রার্থী আছেন তারা অনেকগুলো মামলার আসামি, নির্যাতিত হয়েছে, এবং সে সংখ্যাটা বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী রয়েছে, আমরা তাদের মধ্য থেকে বাচাই করার চেষ্টা করছি। ফেনীতেও বেশ কয়েকটি কমিটি আমাদের হয়েছে। জেলা কমিটিটাও অচিরেই ঘোষনা করবো ইনশাআল্লাহ।
টিভিতে আজ যা যা দেখবেন
৩ দিন পরই বাতিল হবে অতিরিক্ত সিম
পটিয়ায় ডাকাত দলের ২ সদস্য গ্রেপ্তার
মেট্রোরেল দুর্ঘটনা: নিহত কালামের দাফন সম্পন্ন