জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যতই কমে আসছে, বিএনপি নির্বাচনী প্রস্তুতি ততই দৃশ্যমান হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় দলটির প্রার্থী চূড়ান্তের কাজও প্রায় শেষদিকে নিয়ে এসেছে। শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে একক প্রার্থী ঘোষণা দেবে দলটি। তবে তার আগেই মনোনয়নপ্রত্যাশীদের নিয়ে কয়েক ধাপে মতবিনিময় শেষ করছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। গত দুদিনে কয়েক ধাপে অন্তত হাজারখানেক প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলেছেন নীতিনির্ধারকরা। আরও কয়েকটি সাংগঠনিক জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তারা।
জানা গেছে, কেন্দ্রের স্পষ্ট বার্তা ‘আসনকেন্দ্রিক একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী থাকলেও দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষেই ভোটের মাঠে প্রত্যেককে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। দল থেকে চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীকে বঞ্চিতদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়তে হবে। বিভেদ ভুলে ধানের শীষ নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে। শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়ালে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে দলের প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ গুছিয়ে আনছে বিএনপি। এ প্রক্রিয়ায় প্রতি আসনে একাধিক প্রার্থী ঠিক করে রাখা হচ্ছে। পুরো বাংলাদেশে আসনভিত্তিক একাধিক যোগ্য প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলছি।’
জানা গেছে, ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এক আসনে একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিল, একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমাও দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ আমলে ওই নির্বাচনে প্রার্থিতা বাতিলের মতো ঘটনা ঘটলে আসন যেন বিএনপিশূন্য না হয়ে পড়ে, সেজন্য ওই কৌশল নেওয়া হয় বলে তখন দলটির নেতারা জানিয়েছিলেন।
এবার আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই শতাধিক আসনে ধানের শীষের প্রার্থী তালিকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির পরবর্তী বৈঠকে চূড়ান্ত হবে। জোটের কারণে কিছু আসন ছাড়তে হবে, তাও বিবেচনা করতে হচ্ছে দলটিকে।
তথ্য বলছে, গত রবিবার পাঁচ সাংগঠনিক বিভাগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। চট্টগ্রাম, রংপুর, কুমিল্লা, ফরিদপুর ও ময়মনসিংহের অন্তত চার শতাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী অংশ নেন। গতকাল সোমবার ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, সিলেট এবং রাজশাহী বিভাগের মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রায় ৫০০ জন অংশ নেন।
দুটি বৈঠকেই হাইকমান্ডের নির্দেশনার পর ঐক্যে গুরুত্ব দিয়ে মাঠে নামার কথা জানিয়েছেন বৈঠকে অংশ নেওয়া মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। তারা বলছেন, ‘কেন্দ্রের নির্দেশনা মেনে সব মনোনয়নপ্রত্যাশী ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে কাজ করবেন। নির্বাচনে জয়লাভের লক্ষ্যে এখানে ব্যক্তির চেয়ে ধানের শীষের প্রার্থীকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।’
গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সভাপতিত্ব করেন। এ ছাড়া বৈঠকে দলের মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কাউকে বক্তব্য দিতে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মনোনয়নপ্রত্যাশীদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন। ভোটের মাঠে একক প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে যারা মনোনয়নবঞ্চিত হবেন, তাদের দল থেকে যথাযথ মূল্যায়নের আশ্বাস দেন।
মনোনয়নপ্রত্যাশীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘এবারের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী প্রেক্ষাপট অতীতের চেয়ে ভিন্ন। সবাইকে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে মাঠে নামতে হবে। প্রত্যেক ভোটারের কাছে ভোট চাইতে হবে। জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। দল মনোনীত প্রার্থীকেও সবার (মনোনয়নপ্রত্যাশী ব্যক্তি ও নেতাকর্মী) সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। কেউ মনোনয়ন পেলে এলাকায় মিষ্টি বিতরণসহ এমন কর্মকাণ্ড করা যাবে না, যাতে অন্যরা (যারা মনোনয়ন পাবেন না) মনে কষ্ট পান। এ ছাড়া যারা দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড ঘটাবেন, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চট্টগ্রাম-১ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী শেখ মো. মহিউদ্দিন, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী নাজমুল মোস্তফা আমিনসহ অন্তত পাঁচ নেতা জানান, তিনি (তারেক) বহিষ্কারেই একমাত্র সমাধান চান না, তারেক রহমান আমাদের বলেছেন, যদি কেউ দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যায়, তবে তিনি সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবেন; কিন্তু তিনি এমনটি করতে চান না এবং পছন্দও করেন না।
ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সভা শেষে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা হাত তুলে দল মনোনীত প্রার্থীদের সমর্থন জানানোর প্রতিশ্রুতি দেন।
এদিকে গতকাল বৈঠক ঘিরে দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে বিভিন্ন সংসদীয় আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের পক্ষে নেতাকর্মীদের গুলশান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে দেখা গেছে। এতে ওই এলাকার সড়কে যান চলাচলে বিঘœ ও জনভোগান্তি তৈরি হতে দেখা গেছে। জানা গেছে, গতকাল কার্যালয়ের বাইরে দুপুরের পর থেকেই বিভিন্ন বিভাগের অন্তত দুই হাজারের মতো নেতাকর্মী অবস্থান করেছেন।
