রক্তের রঙ কখনো সময়ের সঙ্গে বদলায়? হয়তো না। কারণ খার্তুমের আকাশে যে রক্তের কুয়াশা এখন ভাসছে, তা পনেরো শতাব্দীর মানবসভ্যতার সব মিথ্যাচারকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সুদান এক সময় নীলনদের তীরে সভ্যতার আশ্রয়স্থল ছিল, কিন্তু আজ ধ্বংসের আর্তনাদে কাঁপছে। শহরের ওপরে কালো ধোঁয়া, বাজারের জায়গায় বোমার গর্ত, হাসপাতালের মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা রক্ত এ এমন এক নরক, যেখানে মানবতা কেবল একটি পরিত্যক্ত শব্দ। অনেকদিন আগে (!) যা ব্যবহার করা হতো। ইতিহাসে অজস্র নজির রয়েছে, বিশ্ব মানবতার। বিশেষ করে, শত-হাজার বছর আগের মুসলিম শাসকদের ন্যায়বিচার এবং মানবতা আজ হারিয়ে গেছে। আমরা কেবলই ধ্বংসের দর্শক। কোনো নির্মাণে আমরা সহজে অগ্রসর হতে পারি না। যখনই হতে যাই, তখন গোষ্ঠীবদ্ধ হায়েনার দল আমাদের মধ্যেই সৃষ্টি করে অনৈক্যের বিষবাষ্প। আমরা বিচ্ছিন্ন হই। আর অত্যাচারীর দল, যুগের পর যুগ আমাদের নির্মম শোষণ করে যায়। আমরা যেন নিজের অজান্তেই ভালোবাসি শোষিত হতে। যে ধারা চলছে। কতকাল এমন চলবে, কেউ জানি না।
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ, এখন ইতিহাসের দীর্ঘতম আত্মবিধ্বংসী সংঘাতগুলোর একটি। | Rapid Support Forces (RSF) ও Sudanese Armed Forces (SAF) দুই সামরিক শক্তির ক্ষমতা দখলের নোংরা খেলায় পিষ্ট হচ্ছে একটি জাতির ভাগ্য। কিন্তু এই যুদ্ধ কেবল রাজনীতির জন্য নয়, এটি যেন মানবতার বিরুদ্ধে ঘোষিত এক নগ্ন বিদ্রোহ। জাতিসংঘের মতে, ইতিমধ্যেই এক কোটি মানুষ গৃহহীন। শহরের পর শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। শিশুদের দেহ বালুর নিচে, মায়েদের দৃষ্টি আকাশে স্থির যেন নীলনদও আজ রক্তে লাল। AP News-এর তথ্যে জানা গেছে, উত্তর দারফুরে RSF বাহিনীর হামলায় মাত্র একদিনে ৪০ জন শরণার্থীকে হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। হাসপাতালগুলো আর হাসপাতাল নেই। সেগুলো এখন মৃত্যু গণনার কেন্দ্র। WHO জানিয়েছে, পশ্চিম কুরদোফানে এক হাসপাতালের ওপর বিমান হামলায় পুরো সার্জারি ইউনিট ধ্বংস হয়ে গেছে, ডাক্তাররা নিজেরাই রোগীর পাশে মারা গেছেন।
এই যুদ্ধ শুধু বুলেট বা বোমার নয়, এটি এক পরিকল্পিত দানবীয়তার নাট্যমঞ্চ। RSF-এর সৈন্যরা ধর্ষণ করছে, অপহরণ করছে, শিশুদের ব্যবহার করছে যোদ্ধা হিসেবে। বছরের প্রথম দিকে, The Guardian-এর প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করে দারফুরে RSF গণহত্যা চালিয়েছে, এটি জাতিগত নিধনের আরেক নাম। একই সময়ে Amnesty International লিখেছে, ‘খাদ্য এখন অস্ত্র, ক্ষুধা এক কৌশল।’ মানবিক ত্রাণ আটকানো হচ্ছে, শরণার্থীদের পথে বোমা ফেলা হচ্ছে, মায়ের কোল থেকে শিশু কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এ যেন প্রাগৈতিহাসিক এক পশুত্বের পুনর্জন্ম। তবু আধুনিক (!) পৃথিবী চুপ। নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আলো জ্বলছে, ব্রাসেলসের কূটনৈতিক করিডরে কফির গন্ধ আর দারফুরে মানুষ জ্বলছে, তেলে আর আগুনে। এটাই আমাদের সভ্যতার আধুনিক নীরবতা। এটি এমন এক নীরবতা, যা শব্দের থেকেও বেশি শক্তিশালী। যেখানে প্রতিটি কূটনৈতিক বিবৃতি মৃতদেহের ওপর লেখা হচ্ছে, আর প্রতিটি সম্মেলনের রেজ্যুলেশন শিশুর আর্তনাদকে ঢেকে দিচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষী, দারফুরে ২০০৩ সালে একই রকম গণহত্যা হয়েছিল। তখন বিশ্ব তাকিয়ে ছিল, আজও তাকিয়ে আছে। কিন্তু বিচার হয়নি, দোষীরা বেঁচে গেছে। আর এই অবিচারই জন্ম দিয়েছে নতুন দানব জঝঋ। জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় এখন বলছে, ‘বিচারহীনতা এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।’ অর্থাৎ সুদানে শুধু গুলি নয়, আইনের নীরবতাও অনবরত হত্যা করছে মানুষকে।
এ যুদ্ধের ভেতর লুকিয়ে আছে এক গভীর নৃশংসতা। বাস্তবতা বলছে যখন শিশুদের ক্ষুধা দিয়ে হত্যা করা হয়, তখন পৃথিবীর প্রতিটি রুটি কলঙ্কিত হয়। যখন নারীর শরীরে আগুন লাগানো হয় তখন সব ধর্ম, সব নৈতিকতা ব্যর্থ হয়ে যায়। যখন একটি জাতি সাহায্যের জন্য চিৎকার করে, আর আমরা পর্দার সামনে নীরবে স্ক্রল করে যাই, তখন সেই নীরবতাই হয়ে ওঠে অপরাধের সহযাত্রী। আমাদের নীরবতাই অত্যাচারীর শক্তি। সুদানের এই ধ্বংস একক কোনো সরকারের ব্যর্থতা নয়, এটি সমগ্র মানবজাতির ব্যর্থতা। আমরা উন্নয়নের নামে মহাকাশে মানুষ পাঠাই, কিন্তু খার্তুমে এক শিশুকে বাঁচাতে পারি না। আমরা গণতন্ত্রের নামে যুদ্ধ শুরু করি, কিন্তু মানবতার নামে একটিও যুদ্ধ থামাতে পারি না। আজ নীলনদের তীরে কেবল ধোঁয়া আর ছাই কিন্তু সেই ছাইয়ের মধ্যেও হয়তো কোনো শিশুর চোখে এখনো একটুখানি আলো বেঁচে আছে। সে আলোই হয়তো আমাদের শেষ সুযোগ নিজেকে মানুষ প্রমাণ করার। কারণ, যদি সুদানের রক্তের হিসাব আমরা না দিই, তাহলে ইতিহাস একদিন আমাদের বিচার করবে। মনে রাখা উচিত, সেই বিচারে আমরা কেউই নির্দোষ থাকব না। বিশ্ব তখন একই মতাদর্শে বিশ্বাস রাখবে। বলবে ওরা, নৃশংসভাবে অসংখ্য নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে। তাদের ক্ষমা তো দূরের কথা, বাঁচিয়েও রাখা যাবে না। তখন অবস্থা কেমন হবে!
মনে রাখা দরকার, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কিন্তু আমাদের রেহাই দেবে না। শক্তি এবং অর্থই যদি মানবতার মাপকাঠি হয়, তাহলে বিশ্বাস করতে হবে বিভেদ নয়, ন্যূনতম ছাড় দিয়ে একত্র হতে হবে দানবের বিরুদ্ধে। এ এক পৈশাচিক দলবদ্ধ হায়েনা, যারা কেবলই ধ্বংসের মাধ্যমে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে চায়। ইতিহাসই তাদের এমন পরিচয় চিহ্নিত করেছে নিশ্চিতভাবে। সুদান আজ বিবেকের আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের বিকৃত মুখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। এ যুদ্ধ শেষ না হলে, শুধু সুদান নয়, পৃথিবীও ধ্বংস হয়ে যাবে।
লেখক : কলাম লেখক