বাংলাপ্রেমিক চিরভাস্বর চলচ্চিত্র বিপ্লবী

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০২ এএম

বাংলা চলচ্চিত্রে ভিজ্যুয়াল গল্প বলা, স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্যপূর্ণ চলচ্চিত্র জাদুকর ঋত্বিক ঘটক (০৪ নভেম্বর ১৯২৫-০৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬)। চলচ্চিত্রে অনবদ্য সৃষ্টি  রেখে অমর হয়ে রয়েছেন। ক্যামেরার ফ্রেম দিয়ে গল্প বলার ক্ষেত্রে ঋত্বিক ঘটকের অভিনব মুন্সিয়ানার কাছে শুধু বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা ভারতবর্ষের শিল্পী সমাজ ও বৃহদার্থে সর্বস্তরের মানুষ ভীষণভাবে ঋণী। কেননা, বিশ্বদরবারে ক্ষুধা-দারিদ্র্য-মঙ্গাপীড়িত ভারতীয়দের অসহায়-করুণ কীটতুল্য মামুলি জাতিগত পরিচয়কে গলা টিপে হত্যা করার জন্য, একজন ঋত্বিক ঘটকই যথেষ্ট।

চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, বিত্তবৈভব ও চাকচিক্য লাভের জন্য কখনো আপস করেননি। প্রবলভাবে নিঃশঙ্ক চিত্তের ছিলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় ও পূজনীয় সিনেমার বিপ্লবী নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক। তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন অতিকায় তুচ্ছ বৈষয়িক লোভ-লালসা-প্রেমমুক্ত এক প্রগাঢ় শৃঙ্খলমুক্ত বিশুদ্ধ শিল্পস্রষ্টা। জীবদ্দশায় প্রাপ্তি ও স্বীকৃতি যতটা নগণ্য ছিল, সৃষ্টির উন্মাদনা-তাড়না ছিল ততটাই মহান ও বিস্তৃত। এক সাক্ষাৎকারে তিনি অকপটে বলেছিলেন, ‘আমৃত্যু আমার জীবনে কম্প্রোমাইজ করা সম্ভব নয়। সম্ভব হলে তা অনেক আগেই করতাম এবং ভালো ছেলের মতো বেশ গুছিয়ে বসতাম। কিন্তু তা হয়ে উঠল না, সম্ভবত হবেও না। তাতে বাঁচতে হয় বাঁচব, না হলে বাঁচব না। তবে এভাবে শিল্পকে কোলবালিশ করে বাঁচতে চাই না।’ প্রখ্যাত নন্দনতত্ত্বের স্রষ্টা ও বিশারদ চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ (১৯৫৫) বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও সমালোচকদের কাছে বিস্ময় সৃষ্টির তিন বছর আগে ১৯৫২ সালে ঋত্বিক ঘটক নির্মাণ করেছিলেন ‘নাগরিক’। কিন্তু তৎকালীন ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ‘নাগরিক’ সিনেমাকে নিষিদ্ধ করে প্রদর্শনের পথরুদ্ধ করে দেয়। ঋত্বিক ঘটকের মৃত্যুর পরের বছর ১৯৭৭ সালে ‘নাগরিক’ ছবির একটি প্রিন্ট উদ্ধার করা হয় এবং পরে ভারতের বিভিন্ন শহরে প্রদর্শন করা হয়। ঋত্বিক ঘটকের শিল্পসাধনা এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের চর্চা ও বিকাশকে ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছিল ‘নাগরিক’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনে আইনি বাধা সৃষ্টি করে। সেদিনের রক্ষণশীলদের পশ্চাৎমুখী জরাজীর্ণ রুগ্ণ সিদ্ধান্তও ঋত্বিক ঘটককে শৃঙ্খলবন্দি করতে পারেনি। বরং ঋত্বিক ঘটক আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন চলচ্চিত্রের একনিষ্ঠ বিপ্লবী নির্মাতা হিসেবে।

সৃষ্টির প্রশ্নে শতভাগ শৃঙ্খলমুক্ত ঋত্বিক ঘটক জীবদ্দশায় ক্ষমতাসীনদের রোষানল থেকে রেহাই পাননি কখনো। তাই শুধু ‘নাগরিক’ নয়, বরং পরবর্তী সৃষ্টিগুলো প্রদর্শনেও সেন্সর সনদ প্রদানে বিলম্ব, বারবার কাটা-ছেঁড়া, এমনকি সেন্সর সনদপ্রাপ্তির পরও প্রদর্শন করতে না পারার মতো ঘটনা লেগেই ছিল। সৃষ্টির উন্মাদনায় ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত থেকে ঋত্বিক ঘটক সৃষ্টি করেছেন ‘অযান্ত্রিক’ (১৯৫৮), ‘বাড়ী থেকে পালিয়ে’ (১৯৫৮), ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১), ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬২), ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৭৩) ও ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ (১৯৭৭) নামের মহামূল্যবান হিসেবে বিবেচিত চলচ্চিত্রগুলো। ঋত্বিক ঘটকের প্রতিটি সৃষ্টি  এমন অনিন্দ্য-অনবদ্য যে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কারপ্রাপ্ত অনেক চলচ্চিত্র তার সৃষ্টির আলোর পাশে, ভীষণভাবে  ম্লান ও আবেদনহীন হয়ে যায়। ঋত্বিক ঘটকের কালোত্তীর্ণ সৃষ্টিগুলোকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র তথা প্রাচ্যের মহান শিল্পবোধ ও সমৃদ্ধ সৃষ্টি প্রতিভার বিতর্কহীন গ্রহণযোগ্য প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব এবং বাংলা চলচ্চিত্রের উৎকর্ষের সন্দেহাতীতভাবে অনিবার্য পথও এটি।

শত-সহস্র বাধা-বিপত্তি ও বঞ্চনা উপেক্ষা করে মহান চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক সারা জীবন শুধু দিয়েই গেছেন। নেওয়ার জন্য ঋত্বিক ঘটকরা জন্মান না। অর্থবিত্ত ও চাকচিক্যময় জীবন তাকে টানেনি, সস্তা জনপ্রিয়তার পেছনেও কখনো দৌড়াননি। বরং সৃষ্টি লক্ষ্যে অবিচল থাকতে গিয়ে জীবনভর অসীম বঞ্চনা ও সীমাহীন মানসিক হয়রানি-নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। কখনো কখনো এসব নির্যাতন ঋত্বিক ঘটকের সহ্যসীমা অতিক্রমও করেছে। তবু তিনি পথ পরিবর্তন করেননি, চলচ্চিত্র বাজার নিয়ন্ত্রণকারীদের ফাঁদে শৃঙ্খলিত হয়ে পড়েননি। অসুস্থ পন্থা ও চিন্তাধারাকে পদদলিত করার অসীম সাহসই হয়তো চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটককে অমরত্ব এনে দিয়েছে। ঋত্বিক ঘটক ক্যামেরার ফ্রেম দিয়ে বাঙালির জনজীবনকে অত্যন্ত নিখুঁঁত ও জীবন্তভাবে চিত্রায়িত করেছেন। তার এই চলচ্চিত্রবোধ, প্রজ্ঞা ও নির্মাণে মুন্সিয়ানা বর্তমান বাংলাদেশের ক্ষয়িষ্ণু চলচ্চিত্র অঙ্গনে একেবারেই অনুপস্থিত। আজকের ক্ষয়িষ্ণু চলচ্চিত্র জগতে ঋত্বিক ঘটকের মতো মহান চলচ্চিত্র নির্মাতার কালোত্তীর্ণ সৃষ্টিগুলো সময়ের অপরিহার্য পাথেয়। বর্তমান সময়ের ফোর কে রেজ্যুলেশন ও সিপি-থ্রি লেন্স দিয়ে ডিজিটাল ক্যামেরার মনোমুগ্ধকর চিত্র, তার সঙ্গে ভিএফএক্স, অ্যানিমেশন ও কালার গ্রেডিং স্ক্রিনের চাকচিক্য ও শোভা বর্ধন করেছে বহুগুণ। তবু এখনকার চলচ্চিত্রে নেই সেই প্রাণ, নেই আবেদন। কারণ আমাদের চলচ্চিত্রে অমূল্য-অসাধারণ জীবনবোধ সম্পন্ন একজন ঋত্বিক ঘটকের বড়ই অভাব।

আমাদের দৈনন্দিন জনজীবনে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। বৈষয়িক চিন্তায় আচ্ছন্ন মানুষ হারিয়ে ফেলেছেন হিতাহিত জ্ঞান। বর্তমানে এমনই একটা অদ্ভুত অসুস্থ জীবনধারা মানব সমাজ ও সভ্যতাকে আঘাত করে চলেছে প্রতিনিয়ত। প্রাপ্তির প্রাচুর্যে সমাজ ও সভ্যতা ছন্দ হারিয়ে পথচ্যুত হয়ে চেতনা ও মূল্যবোধ ধ্বংসের পথে ধাবিত হচ্ছে ক্রমশ। এমন অসুস্থ সভ্যতার ভয়াবহতার বিরূপ প্রভাব মানব জীবনকে ভীষণভাবে বিপন্ন করে তুলবে এটাই স্বাভাবিক। যার প্রাথমিক বহিঃপ্রকাশ ইতিমধ্যে বহুভাবে আলোচনায় এসেছেও। সাম্প্রতিক সময়ে মানুষ বিপদে পড়লে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন না কেউ। মানুষ কখন বিপদে পড়েন এ জন্য কিছু মানুষের অধীর অপেক্ষা চলে। এদের অনেকেই দূর থেকে দাঁড়িয়ে আইফোন বা স্মার্টফোন দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ করে ডলার উপার্জন বৃদ্ধির জন্য। এমন ভীষণ স্বার্থান্ধ সমাজকে আরও একবার আলোকিত করতে, দানবীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের আবারও ফিরে যেতে হবে ১৯৫০, ৬০ ও ৭০ দশকে, আমৃত্যু সিনেমা বিপ্লবী ঋত্বিক ঘটকের মহামূল্যবান অমর সৃষ্টিগুলোর দিকে। জয়তু শৃঙ্খলমুক্ত অমর শিল্পস্রষ্টা ঋত্বিক ঘটক। বাংলা চলচ্চিত্রের গর্ব, পরম শ্রদ্ধেয় গুণীজন ও মহান চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের জন্মশতবর্ষে স্মরণ করছি শ্রদ্ধার সঙ্গে।

লেখক: ব্র্যান্ড কনসালট্যান্ট ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত