প্রার্থী-নেতাদের নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশে দুশ্চিন্তা

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:০৫ এএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে উদ্বেগ ও উত্তেজনা। নির্বাচনকালের পরিস্থিতিকে শান্ত ও স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চট্টগ্রামে বিএনপির ঘোষিত প্রার্থীর ওপর হামলা ও গুলির ঘটনায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে। পুলিশের একটি সংস্থার গোপন প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, প্রার্থীরা ও নেতারা ঝুঁকিতে আছেন; এদের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। প্রতিবেদনে বিশেষ অঞ্চলভিত্তিক প্রার্থী এবং নেতাদের নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্র বলেছে, নিরাপত্তার সার্বিক বিষয়ে তথ্য পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের শীর্ষ কর্তারা অনির্ধারিত বৈঠক করেছেন। বৈঠক থেকে পুলিশের সব রেঞ্জের ডিআইজি, ইউনিটপ্রধান, জেলার পুলিশ সুপার ও থানার ওসিদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সব রাজনৈতিক (আওয়ামী লীগ বাদে) দলের সম্ভাব্য প্রার্থী ও অন্য নেতাদের নিরাপত্তা দিতে হবে। কোনো নেতা বা প্রার্থী আগাম নিরাপত্তা চাইলে তাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার উদ্যোগ নিতে হবে। এসব কাজে ব্যত্যয় ঘটলে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

সূত্র জানায়, আসন্ন নির্বাচন ঘিরে নতুন নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও প্রার্থীসহ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতার নিরাপত্তা বাড়াতে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরকে। সব গোয়েন্দা সংস্থা ঝুঁকির তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ে তৎপরতা শুরু করেছে। নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সম্ভাব্য নাশকতা বা সহিংসতা এড়ানো এখন প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নির্দেশনা পেয়ে পুলিশও নড়চড়ে বসেছে। তারা নিরাপত্তা বিধানের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে বেশি মনোযোগী হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করার পর প্রার্থীরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় ঘরোয়া বৈঠকের পাশাপাশি পথসভা ও নির্বাচনী গণসংযোগ শুরু করেছেন।

গত বুধবার চট্টগ্রামে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ সন্ত্রাসীদের হামলায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মাঠ পুলিশকে প্রার্থীদের গণসংযোগ কর্মসূচির নিরাপত্তার দিকে নজর রাখতে নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। যেকোনো ধর নের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তাৎক্ষণিকভাবে যেন পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে, সেজন্য বেশ কিছু কৌশল নিয়েছে পুলিশ। পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এ কথা বলেছেন। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা কাজ করছি। পুলিশের সব ইউনিটকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে আমরা কাজ করছি। অরাজকতা সৃষ্টির তৎপরতা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে একটি গোয়েন্দা সংস্থা গোপন প্রতিবেদন দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী ও নেতাদের ওপর অতর্কিত হামলার শঙ্কা আছে। বিশেষ করে খুলনা, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঝিনাইদহ, যশোর, চট্টগ্রামসহ কয়েকটি জেলায় দুর্বৃত্তরা হামলা চালাতে পারে। পেছনে আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ইন্ধন থাকারও চেষ্টা থাকবে বলে তথ্য রয়েছে। এসব জেনে পুলিশের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। অরাজকতা সৃষ্টির জন্য দেশি-বিদেশি চক্র বা চরমপন্থি গোষ্ঠী সক্রিয় আছে। প্রার্থী ও নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দেহরক্ষী বা সশস্ত্র পুলিশ কাজ করবে। পুলিশকে প্রার্থীদের জনসভা বা প্রচারণার স্থানে আগে থেকেই রুটিন তল্লাশি ও নজরদারির ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় এবং জেলাপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়গুলোতে নিরাপত্তা বাড়াতে বলা হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষপ্রবণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ ও অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে।’

কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাচ্ছি না। প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। নাশকতার খবর পেলে তাৎক্ষণিক ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে থানার ওসিদের বলা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে উসকানিমূলক পোস্ট, হুমকি বা নাশকতামূলক কার্যকলাপের ইঙ্গিত পাওয়া গেলে সাইবার নজরদারি বাড়ানো হবে। বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তালিকাভুক্ত অপরাধী, সন্ত্রাসী ও জামিনপ্রাপ্ত আসামিদের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’ তারা বলেন, ‘সীমান্ত এলাকা এবং চরমপন্থি গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে, এমন জেলাগুলোয় তথ্য সংগ্রহে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংগৃহীত তথ্য নিয়মিত পুলিশ সদর দপ্তরকে দেওয়া হচ্ছে।’

জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-৮ আসনে দলটির মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ গত বুধবার বিকেলে গণসংযোগকালে সন্ত্রাসীদের হামলায় গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনার পর বৃহস্পতি ও শনিবার পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা কয়েক দফা বিশেষ বৈঠক করেছেন। বিভিন্ন দলের মনোনীত প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে যেসব ব্যক্তি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তাদের নিরাপত্তায় কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে বিষয়ে কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে ওইসব বৈঠকে। কিছুদিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন বিশেষ দিকনির্দেশনা দেবে বলেও জানানো হয়েছে।

বৈঠকে উপস্থিত পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনকালে শান্তিপূর্ণ ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে দেড় লাখ পুলিশ সদস্য নির্বাচনী প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। বিভিন্ন দলের নেতা ও প্রার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি আলোচনা হয়েছে বৈঠকে। আসনভিত্তিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরির বিষয়ে সবাই একমত পোষণ করেছেন। প্রতিটি আসনের ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র নিয়েও আলোচনা হয়েছে। অতীতে যেসব আসনে বেশি নির্বাচনী সহিংসতা হয়েছে, কিংবা যেসব আসনে সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে, ওইসব আসনে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত