কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ডাকা ১৩ নভেম্বর ঢাকায় ‘লকডাউন’ কর্মসূচি ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। লকডাউনের কর্মসূচিতে কেউ মাঠে নামলে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তারের নির্দেশনা দেওয়া হয় বৈঠকে। পাশাপাশি আগামী কয়েক দিন ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল রবিবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা থেকে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আইন শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভাটি হওয়ার কথা ছিল আগামীকাল মঙ্গলবার। হঠাৎ করে এ বৈঠক ডাকা হয় মূলত আওয়ামী লীগের কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনা করতে। বৈঠকে পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম, ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলীসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিদেশে বসে আওয়ামী লীগের মধ্যমসারির একাধিক নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৩ নভেম্বরের কর্মসূচি নিয়ে যে প্রচার চালাচ্ছে, তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। এমনকি আওয়ামী লীগের এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বরগুনা, বরিশাল, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও গাজীপুর থেকে বেশ কিছু নেতাকর্মী ঢাকায় এসেছেন বলে বৈঠকে আলোচনা হয়।
বৈঠকে ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসানোর প্রস্তাব দেন একটি বাহিনীর প্রতিনিধি। পরে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। বৈঠকে আওয়ামী লীগের বরিশাল অঞ্চলের দুই নেতার নাম উল্লেখ করে তাদের অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়। এই দুই নেতা বিদেশে বসে আবারও অতীতের মতো কোনো কর্মকাণ্ড ঘটাতে পারেন বলে আভাস দেওয়া হয়।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা এক কর্মকর্তা বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। আপাতত সেনাবাহিনীর সদস্যদের মাঠ থেকে না সরিয়ে আরও কিছুদিন রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
এর আগে গত মঙ্গলবার আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৫০ শতাংশ সদস্যকে মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে উপস্থিত এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কারণ মূলত আওয়ামী লীগের কর্মসূচিকে মাথায় রেখে।
এদিকে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ১৩ নভেম্বর ঢাকা লকডাউন নিয়ে কোনো ধরনের শঙ্কা নেই, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ।
মোতায়েন করা সেনাবাহিনীর ৫০ শতাংশ সদস্য সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, সেনাবাহিনী আগের মতোই মাঠে থাকবে। মাঠ থেকে সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রত্যাহার করা হবে না।
১৩ নভেম্বর ঘিরে শঙ্কা নেই : কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মসূচি ঘিরে কোনো শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। গতকাল রবিবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে এমনটা জানান তিনি।
১৩ নভেম্বর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, তারা লকডাউন বা শাটডাউনের যে কর্মসূচি রেখেছে, সে বিষয়ে সরকার শঙ্কিত নয়।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সেনাবাহিনীর ৫০ শতাংশ সদস্যকে মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে না; এ-সংক্রান্ত যা ছড়িয়েছে, সেটি গুজব, এ রকম কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
১৩ নভেম্বর নিয়ে নিরাপত্তা শঙ্কা দেখছে না প্রসিকিউশন : আগামী ১৩ নভেম্বর জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার মামলার রায়ের তারিখ ধার্য করার দিন ধার্য আছে। আর একে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কোনো অনিরাপত্তাবোধ করছে না বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। গতকাল রবিবার তিনি ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রায়ের তারিখ নির্ধারণ হবে ১৩ নভেম্বর। তার জন্য প্রসিকিউশনের প্রস্তুতির কিছু নেই। প্রসিকিউশন অনিরাপত্তাবোধও করছে না।’
তিনি বলেন, ‘প্রসিকিউশনের দায়িত্ব হলো তদন্ত সংস্থা থেকে যে অভিযোগগুলো আনা হয় সেগুলো ট্রাইব্যুনালে প্রমাণ করার জন্য চেষ্টা করা। সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্ক তুলে ধরা। ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব হলো যুক্তিতর্ক ও সাক্ষ্য বিবেচনায় রায় প্রদান করা। এর বাইরে প্রসিকিউশনের কোনো দায়িত্ব নেই এবং প্রসিকিউশন অন্য কোনো বিষয়ে খেয়ালও করছে না।’
সেনা কর্মকর্তাদের আইনজীবী হিসেবে নাম প্রত্যাহার করলেন আইনজীবী সরোয়ার : আওয়ামী লীগের সময় জোরপূর্বক অপহরণ ও গুমের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাগারে থাকা ১৫ উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তার আইনজীবী হিসেবে নিজের নাম ফিরিয়ে নিয়েছেন আইনজীবী এম সরোয়ার হোসেন। গতকাল তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ বিষয়ে আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করে। এর আগে গত ২২ অক্টোবর ব্যারিস্টার সরোয়ার হোসেনসহ পাঁচ আইনজীবী ১৫ সেনা কর্মকর্তার পক্ষে ওকালতনামা জমা দিয়েছিলেন। পরদিন সরোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, সেনাবাহিনীর ১৫ আসামির মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের অভিযোগ দিয়েছিলেন। যে কারণে তাদের কারও পক্ষে শুনানি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
