জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামে শহীদ ওয়াসিম আকরাম ও ফয়সাল আহমদ শান্তর পরিবার। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সোমবার (১৭ নভেম্বর) রায় ঘোষণার পর সাংবাদিকদের কাছে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ওয়াসিম আকরামের বাবা শফিউল আলম দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে দ্রুত বাংলাদেশে এনে রায় কার্যকর করার দাবি জানান। ‘আমার বুকটা ঠান্ডা হয়েছে। তবে মনে প্রশান্তি আসবে সেদিন যেদিন হাসিনাকে ভারত থেকে এনে রায় কার্যকর করা হবে’ বলেন শফিউল আলম।
ছেলে হারানোর বেদনায় এখনো কাতর ফয়সাল আহমদ শান্তর মা কহিনুর আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার নাঁড়ি ছেঁড়া ধনকে হারানোর বেদনা হয়তো কোনো দিন ভুলতে পারব না। জুলাই আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট হাসিনার নির্দেশে দেশে হাজারের বেশি ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড হাসিনার প্রাপ্য। তবে আমি সেদিন হবো শান্ত যেদিন তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর হবে।’
সোমবার (১৭ নভেম্বর) বিকেলে রায়ের খবর প্রকাশের পর শহীদ ওয়াসিম ও ফয়সাল আহমদ শান্তর পরিবারে স্বস্তি এসেছে। হাসিনার মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় দুই পরিবারই মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেছে। এক প্রশ্নের উত্তরে শহীদ ফয়সাল আহমদ শান্তর মা কহিনুর আক্তার বলেন, ‘সোমবার সকাল থেকে টেলিভিশনে শেখ হাসিনা ও তার দোসর আসাদুজ্জামান খান কামালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম সরাসরি দেখানো হচ্ছিল। রায় ঘোষণা পর্যন্ত টেলিভিশনের সামনেই বসা ছিলাম। রায় শুনে অঝোর কেঁদেছি। আমার ছেলের রক্ত বৃথা যায়নি।’
শহীদ ফয়সাল আহমদ শান্ত ইসলামী ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম দক্ষিণ শাখার ‘সাথী ছিলেন। সেদিন (২০২৪ সালের ১৬ জুলাই) বিকেলে সংগঠনের নির্দেশে মুরাদপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। নগরের ষোলশহর ২ নম্বর গেটের দিক থেকে অতর্কিতভাবে গুলিবর্ষণ করে ছাত্রলীগ-যুবলীগের ক্যাডাররা। একটিমাত্র গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন শান্ত। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
জুলাই আন্দোলনে চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরাম। কক্সবাজারের পেকুয়ার বাঘগুজারা বাজারপাড়ায় তার বাড়ি। জানা গেছে, রায়ের খবর প্রচারের পর শহীদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করেন তার বাবা শফিউল আলম। সোমবার বিকেলে মোবাইল ফোনে কল করলে শফিউল আলম বলেন, ‘শুধু শেখ হাসিনা নয়, যারা সেদিন গুলিতে আমার ছেলের বুক ঝাঁঝরা করেছিল তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হোক। তাদেরও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলনের মিছিলে অংশ নেন ওয়াসিম। সেদিন তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। চট্টগ্রাম কলেজের স্নাতক (সম্মান) চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। পাশাপাশি চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদল ও পেকুয়া উপজেলা ছাত্রদলের রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ওয়াসিম ছিলেন তৃতীয়। ‘ওয়াসিমকে হারিয়েছি। তার দেহটা কবরে শায়িত হলেও মনে হয়- সে যেন আমার সঙ্গেই আছে। সবকিছুতেই তার স্মৃতি। তাকে ভুলতে পারিনা। আমার সন্তানের মতো ফ্যাসিস্ট হাসিনার নির্দেশে পুলিশ, ছাত্রলীগ-যুবলীগের গুলিতে যেসব তরতাজা প্রাণ ঝরেছে তাদের প্রত্যেকের রক্ত যেন বৃথা না যায়’ বলেন শফিউল আলম।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায়ের খবর শুনে চট্টগ্রাম নগরের লালখানবাজার এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে। দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানিয়ে শান্তর প্রতিবেশি আমজাদ হোসেন বলেন, ‘শেখ হাসিনা ১৭ বছর অসংখ্য মানুষকে গুম, খুন করেছেন। কোটা আন্দোলনে তারই নির্দেশে মানুষকে খুন করা হয়েছে। আয়নাঘরে বন্দী করেছেন অনেককে। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামের মুরাদপুরে নিরস্ত্র ফয়সাল আহমদ শান্তকে গুলি করে হত্যা করেছিল যুবলীগের সন্ত্রাসীরা। ১ হাজার ৪০০ ছাত্র-জনতাকে হত্যার দায়ে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তাকে ভারত থেকে দেশে এনে দ্রুত রায় কার্যকর চাই।’
প্রসঙ্গত, বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সোমবার শেখ হাসিনার মামলার রায় ঘোষণা করেন। ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায়ে ছয়টি অংশ রয়েছে। রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির অপরাধ প্রমাণিত। দুটি অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একটি অভিযোগে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে একই দণ্ড দেওয়া হয়েছে। রাজসাক্ষী হওয়ায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
