নীতি সুদহার কমানোর যৌক্তিকতা এবং বাস্তবতা

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৩৮ এএম

দেশে দীর্ঘ সময় ধরে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অবস্থান করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই নীতি সুদহার কিছুটা কমানো যায় কিনা? ইতিমধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা, পরিকল্পনা উপদেষ্টা এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা বিদ্যমান নীতি সুদহার কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মত দিয়েছেন, নীতি সুদহার কমানোর সময় আসেনি। এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, নীতি সুদহার কখন এবং কত সময়ে সর্বনিম্ন করা সম্ভব হবে? কারণ এই নীতি সুদহারের সঙ্গে সম্পৃক্ত মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ব্যাংকের তারল্য সংকট। একটু বিচার-বিশ্লেষণ করা যাক নীতি সুদহার নিয়ে। নীতি সুদহার হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে হারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে স্বল্প মেয়াদে ঋণ দেয়, সেটা হচ্ছে নীতি সুদহার। ইংরেজিতে একে বলে রেপো রেট। এটা বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য মুদ্রানীতির অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যে হারে বিনিয়োগ করে, তা সাধারণত এই নীতি সুদহারের চেয়ে ৩ থেকে ৫ শতাংশ বেশি হয়। 

প্রতিটি যুদ্ধ বা বিপ্লবের পরে এবং অভ্যুত্থানের পরে দেশের মুদ্রাস্ফীতি কয়েকগুণ থেকে কয়েক হাজার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে ১৯২৩ সালে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ২৯ হাজার ৫০০ শতাংশ। অর্থাৎ দৈনিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ২০ দশমিক ৯ শতাংশ। এ ধরনের প্রলয়ঙ্করী মূল্যস্ফীতির ফলেই জার্মানিতে হিটলারের নাৎসি সরকার ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৯০ সালে পেরুতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭ হাজার ৪৮৫ শতাংশ। আর ফরাসি বিপ্লবে বাস্তিল দুর্গ আঘাতের মাধ্যমে যে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, তার পেছনেও ছিল ব্যাপক মূল্যস্ফীতি। আমাদের দেশে এমতাবস্থায় মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি না পেয়ে নিয়ন্ত্রণ চলে এসেছে বলা যায়। গত সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও, অক্টোবরে তা কমে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। তিন বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। অথচ গত ডিসেম্বরে যেখানে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৯২ শতাংশ। সুতরাং মূল্যস্ফীতি কিছুটা স্থির এমন কথা বলা যায়।

বিনিয়োগ বহুলাংশে হ্রাস পাওয়ার ফলে কর্মসংস্থানের ব্যাপক অভাব দেখা যাবে। এ কারণেই কোনো দেশ খুব সহজে মুদ্রা সংকোচন নীতি গ্রহণ করে না। যদি কোনো রাষ্ট্র মুদ্রা সংকোচন নীতি গ্রহণ করে, তাহলে ওই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উপাদানগুলোর অবস্থানের একটু তারতম ঘটে এবং কিছু উপাদান এলোমেলো হয়ে যায়। একটু সহজভাবে উদাহরণ দিয়ে বললে বিষয়টা সহজেই সবার বোধগম্য হবে। অর্থনীতির মন্দা ও পুনরুদ্ধার নিয়ে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ মিলটন ফ্রিডম্যানের একটি তত্ত্ব আছে ‘গিটার স্ট্রিং থিওরি অব রিসেশনস’ যা গিটারের তার টান দিলে নিচের দিকে যায় এবং হাত ছেড়ে দিলে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। অর্থাৎ যখন কোনো মন্দা আসে, অর্থনীতিকে নিচের দিকে টেনে ধরে। তখন উৎপাদন কমে, আয় কমে, কর্মসংস্থানও কমে। কিন্তু যখন মন্দার কারণগুলো চলে যায় তখন চাহিদা বাড়ে, সুদহার কমে, নীতি সহায়তা দেওয়া হয়। অর্থনীতি তখন দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসে। এখানে লক্ষণীয় হলো, অর্থনীতির উপাদানগুলো বড়ই বেসামাল। আরও একটি উদাহরণ হলো ১৯৭৪ সালে একই সঙ্গে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান গুনার মিরদাল ও ফ্রেডরিক অগুস্ত ফন হায়েক। হায়েক ছিলেন মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবক্তা। মিরদাল নিয়ন্ত্রিত ও নির্দেশ অর্থনীতির সমর্থক। এদের একজনের পরামর্শ সঠিক হলে অন্যজনের বক্তব্য ভুল। তবুও তারা দুজনে একই সঙ্গে একই বছরে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।

মূল্যস্ফীতিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে, নীতি সুদহার বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে হয়েছে ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সরকার ঘাটতি বাজেট প্রণয়নের ফলে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে এবং বিল বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের জন্য মুখিয়ে থাকে। যা দেশের অর্থনীতির জন্য বা অর্থনীতির উপাদানের জন্য এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। নীতি সুদহারের ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ করে তা ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিনিয়োগ না করে, তারল্য সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোকে অর্থ ধার দেয় এবং ট্রেজারির মাধ্যমে সরকারি  বিল বন্ড ক্রয় করে। এতে করে যা হয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের কাক্সিক্ষত মুনাফা ঠিকই অর্জন করে। কিন্তু দেশের অর্থনীতি পিছিয়ে পড়ে। তাই নীতি সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা প্রয়োজন। এমনিতেই দেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে বিনিয়োগ হুমকির মুখে সেখানে ব্যাংক থেকে সাহায্য না পেলে দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সামান্য কমানোর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এবারের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। সংশোধিত বাজেটে তা ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হচ্ছে। অপরদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এটি বাড়িয়ে করা হচ্ছে ৭ শতাংশ। তবে এগুলো চূড়ান্ত হবে ২০২৬ সালের মার্চে। সরকার যেহেতু জাতীয় বাজেট এবং মূল্যস্ফীতি পণ্য মূল্যায়ন করেছে সুতরাং নীতি সুদহারও দেশের স্বার্থে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে নিয়ে আসবে। তবে অবশ্যই মূল্যস্ফীতিকেও প্রাধান্য দিতে হবে। যেন ক্রয়ক্ষমতা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত