জলবায়ু সংক্রান্ত দুর্যোগ, সংঘাত ও দারিদ্র্যের কারণে গত এক দশকে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ায় বৈশ্বিক মানবিক সংকট গভীরতর হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে ইউএনএইচসিআর দ্রুত ও ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়নের দাবি জানিয়েছে।
এবারের জলবায়ু সম্মেলন কপ ৩০-তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের অনুপস্থিতি, চীনের কৌশলগত সক্রিয়তা, ভারতের কঠোর অবস্থান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ চাপ আলোচনাকে জটিল করেছে। অন্যদিকে, ছোট দ্বীপরাষ্ট্র ও সর্বনিম্ন উন্নত দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি ধাপে ধাপে বন্ধ করা, শক্তিশালী এনডিসি, ঋণমুক্ত জলবায়ু অর্থায়ন এবং “বাকু-টু-বেলেম” রোডম্যাপ বাস্তবায়নের জন্য জোরালো দাবি তুলেছে।
সম্মেলনের প্রথম সপ্তাহের আলোচনায় এসব বিষয় উঠে এসেছে। উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ধনী দেশগুলোর আগ্রহ কমে এসেছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় নৌ-চুক্তি স্থগিত করেছে, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০৪০ সালের জলবায়ু লক্ষ্য শিথিল করেছে। ফলে বহুপাক্ষিক কূটনীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কপ ৩০-এর আলোচনায় উন্নত দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং সহজতর অর্থায়ন প্রক্রিয়া সহ কিছু প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে ফুটে উঠেছে। ইএমডিসি দেশগুলোর জন্য প্রতি বছর ২.৩ থেকে ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যা ২০৩৫ সালে ৩.২ ট্রিলিয়নে পৌঁছাবে। অথচ ২০২৩ সালে মাত্র ১৯৬ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ হয়েছে।
ব্রাজিলের “Tropical Forests Forever Facility (TFFF)”—১২৫ বিলিয়ন ডলারের বন সংরক্ষণ প্রস্তাব—তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, কপ ৩০ কি জীবাশ্ম জ্বালানি রূপান্তরের একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ দিতে পারবে? আয়োজকরা জানাচ্ছেন, এত জটিল নথি তৈরি করার মতো সময় এবার নেই। তবে পরিবেশবাদীরা মনে করেন, কপ ৩০ প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে, যা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শক্তিশালী রূপরেখায় রূপ নেবে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সম্মেলনের শুরু থেকেই জলবায়ু ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ তহবিল এবং বৈশ্বিক দায়িত্বশীলতা নিয়ে তীব্র চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। উন্নত দেশসমূহের সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ছোট দ্বীপরাষ্ট্র এবং অনুন্নত দেশগুলোর মতপার্থক্য স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ঐতিহাসিক রায়—যেখানে তাপমাত্রা ১.৫°C সীমাকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা, জীবাশ্ম জ্বালানি লবিস্টদের নিষিদ্ধ করা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান—জলবায়ু সংকটের বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, কপ ৩০ সম্মেলনে গত ১০ নভেম্বর শুরু হয়েছে। আলোচনায় ধনী দেশগুলোর আগ্রহ কমে আসা, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-চুক্তি স্থগিত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের লক্ষ্য শিথিল হওয়ায় বহুপাক্ষিক কূটনীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উন্নত দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কার ও সহজতর অর্থায়ন প্রক্রিয়া তীব্রভাবে আলোচনায় এসেছে। সব মিলিয়ে জলবায়ু রাজনীতিতে নতুন টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।
দ্বিতীয় দিন থেকেই জলবায়ু অর্থায়ন রোডম্যাপ নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে—আগের ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়া, ২০২৫ সালের পর নতুন দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নির্ধারণ, ঋণের পরিবর্তে গ্র্যান্ট-ভিত্তিক সহায়তার দাবি জোরালোভাবে সামনে এসেছে। এছাড়া লস এন্ড ডেমেজ ফান্ড পরিচালনা, দেশ অনুযায়ী অবদান, সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ নির্ধারণ ইত্যাদি বিষয়ও তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো জরুরি সহায়তা তহবিল দ্রুত অনুমোদনের দাবি জানায়।
বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো উপকূল রক্ষা, পূর্বাভাস ব্যবস্থা, কৃষি সহনশীলতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষ বরাদ্দ দাবি করেছে। গ্লোবাল স্টকটেক বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় স্বচ্ছতা, এসডিসি হালনাগাদ এবং ১.৫°C সীমা ধরে রাখতে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রস্তাবিত হারে কার্বন নিঃসরণ কমানো বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে।
তৃতীয় দিনে আলোচনা হয়েছে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ, গ্লোবাল স্টকটেক অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা। চীনা প্রতিনিধিদল নবায়নযোগ্য শক্তিতে দ্রুত অগ্রগতির বার্তা দিয়েছে এবং নিম্ন-কার্বন শক্তি ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা করেছে। তবে ২০২০-২০২৫ সময়কালের কার্বন ঘনত্ব হ্রাসের লক্ষ্য অর্জিত হয়নি, ফলে ২০৩০ সালের প্রতিশ্রুতি পূরণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
পটসডাম ইনস্টিটিউটের জোহান রকস্ট্রম বলেন, প্রতি বছর ১০ বিলিয়ন টন কার্বন বাতাস থেকে অপসারণ না হলে ১.৭°C সীমা অতিক্রমের ঝুঁকি বাড়বে। এদিন আদিবাসী ও পরিবেশকর্মীরা “আমাদের বন বিক্রি নয়”, “আমাদের ছাড়া সিদ্ধান্ত নয়” স্লোগানে বিক্ষোভ করেছেন।
চতুর্থ দিনে আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে বাস্তবায়ন, তথ্য স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। ১২টি দেশ জলবায়ু তথ্য বিকৃতি রোধে যৌথ ঘোষণা দিয়েছে। তবে স্টকটেক প্রক্রিয়ার মূল্যায়নের পর মাত্র তিন মিনিটে ঘোষণা প্রকাশ করা হয়েছে। আইইএ এবং অন্যান্য বিশ্লেষক নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার ইতিবাচক হলেও কয়লা-তেল-গ্যাস থেকে নিঃসরণ বাড়তে থাকায় ২.৬°C উষ্ণায়নের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে “Article 6: Pathways to Emission Reduction” শীর্ষক সেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে স্বচ্ছ কার্বন বাজার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
পঞ্চম দিনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। তারা পদক্ষেপের আহ্বান জানালেও ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নীতিতে শিথিলতা এনেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি এবং জলবায়ুবিরোধী নীতি উদ্বেগ বাড়িয়েছে। জেন্ডার ও স্বাস্থ্য-কেন্দ্রিক পদক্ষেপেও মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নের পার্শ্বইভেন্টে সুন্দরবন ও হাকালুকি হাওরের উদাহরণ দিয়ে স্থানীয় সম্প্রদায়নির্ভর প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ষষ্ঠ দিনে জলবায়ু অর্থায়ন সংকট আরও স্পষ্ট হয়েছে। ২০২০ সালের ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো গ্র্যান্ট খুব কম পেয়েছে। ব্রাজিলের মুন্ডুরুকু আদিবাসীরা কপ-৩০ ভেন্যুর মূল প্রবেশদ্বার কয়েক ঘণ্টা অবরোধ করে সরাসরি আলোচনার দাবি জানিয়েছে।
সপ্তম দিনে মিথেন নিঃসরণ কমানো, ক্ষতি-ক্ষতির তহবিল এবং আন্তর্জাতিক বন ও গ্রিনল্যান্ড আইসশিটের টিপিং পয়েন্ট নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ১.৫°C সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আদিবাসী, যুব ও পরিবেশকর্মীরা বেলেমে মিছিল করেছে, জীবাশ্ম জ্বালানি বন্ধ, খনন কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং আদিবাসী ভূমির স্বীকৃতি দাবি করেছে। বাংলাদেশি যুব প্রতিনিধিরা ক্ষতি-ক্ষতির তহবিল নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছে।
মোরসালিনের গোলে ২২ বছর পর ভারতকে হারালো বাংলাদেশ
উপদেষ্টা মাহফুজের সঙ্গে পাকিস্তান হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ