বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত ভারতের ‘আদানি গ্রুপ’কে সিঙ্গাপুরে সালিশি কার্যক্রম না চালাতে নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ। এ-সংক্রান্ত একটি আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল বুধবার বিচারপতি মো. বজলুর রহমান ও বিচারপতি ঊর্মি রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার এম আব্দুল কাইয়ুম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খান জিয়াউর রহমান।
আইনজীবী আব্দুল কাইয়ুম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আদানির সঙ্গে অসম, অন্যায্য, একপেশে চুক্তি নিয়ে গত বছর হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। ওই বছরের নভেম্বরে হাইকোর্ট এ চুক্তির বৈধতা প্রশ্নে রুল দেয়। পাশাপাশি চুক্তির বিষয়ে সরকারিভাবে একটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে তদন্ত ও পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। তবে, এখন পর্যন্ত সরকারি কমিটির কোনো
প্রতিবেদন আসেনি। ইতিমধ্যে জানতে পেরেছি এই চুক্তি নিয়ে আদানি সিঙ্গাপুরে সালিশ কার্যক্রমের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। রিটকারী আইনজীবী বলেন, পিডিবির চেয়ারম্যান ও জ¦ালানি সচিবকে আদানি গ্রুপের সঙ্গে করা একতরফা বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনা বা বাতিল করতে তিন দিনের সময় দিয়ে গত ৬ নভেম্বর আইনি নোটিস পাঠানো হয়। নোটিসের জবাব না পাওয়ায় হাইকোর্টে এ দরখাস্তটি করা হয়।
আইনজীবী আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘চুক্তির বৈধতা অবৈধতা নিয়ে এখনো কোনো মীমাংসা হয়নি। এ বিষয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের প্রক্রিয়া চলমান অবস্থায় আদানি যদি এ সালিশি কার্যক্রম শুরু করে তাহলে তদন্তের তো কোনো গুরুত্ব থাকছে না। এজন্য সালিশি কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছিল। আদালত দরখাস্ত মঞ্জুর করেছে।’
বিদ্যুৎ নিয়ে আদানির সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় করা চুক্তিতে এনবিআরকে (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) অবহিত না করে শুল্ক ও কর অব্যাহতির মাধ্যমে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ফাঁকির অভিযোগ ওঠার পর এ নিয়ে তদন্তে নামে দুদক। এ চুক্তির জন্য সাবেক মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস (চুক্তির সময় তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সচিব ছিলেন) ও তার নেতৃত্বাধীন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধেও তদন্ত হচ্ছে।
সচল হয়েছে আদানির দ্বিতীয় ইউনিট : যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ হওয়া আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটটি গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে ফের সচল হয়েছে। এখন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চাহিদা অনুযায়ী পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে প্রস্তুত ভারতের ঝাড়খন্ডে আদানি গ্রুপের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার গোড্ডা পাওয়ার প্ল্যান্টের দুটি ইউনিট।
গতকাল আদানির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিটে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। আদানির দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মীদের প্রচেষ্টায় দ্রুততার সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা হয় দ্বিতীয় ইউনিটটি। ফলে এখন দুটি ইউনিট থেকেই পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং তা সরবরাহের সুযোগ রয়েছে।
গতকাল সন্ধা ৬টায় সর্বোচ্চ ৭৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে বাংলাদেশে। এটি প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত সরবরাহ বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে আদানির। অবশ্য এখন শীতকাল হওয়ায় বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা কমে গেছে।
আদানির বিবৃতি : এদিকে হাইকোর্টের এ আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিবৃতি দিয়েছে আদানি গ্রুপ। গতকাল এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, বাংলাদেশের মহামান্য হাইকোর্টের আদেশটি পর্যালোচনা করার সুযোগ না পাওয়ায় এ বিষয়ে উপযুক্ত মন্তব্য করার সুযোগ তাদের নেই। তারা উল্লেখ করেছে যে, আদানি পাওয়ার ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে সম্পাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আদানি পাওয়ার বাংলাদেশ হাইকোর্টের এখতিয়ারভুক্ত নয়। এ ছাড়া, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুসারে দুপক্ষের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে তা সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে, যা বাংলাদেশের কোনো আদালতের এখতিয়ারাধীন নয়।
