ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো

১৫ দিন বন্ধ ঘোষণা ঢাবি হল ছাড়ার নির্দেশ

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২৫, ০৬:৫৬ এএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ১০৪ বছরেও শিক্ষার্থীদের মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত হয়নি। হলগুলোর পুরনো জীর্ণ ভবন, দেয়ালে লোনা ধরা ফাটল, পলেস্তারা খসে পড়া ছাদ আর সেখান থেকে বেরিয়ে থাকা রড। কিছু কিছু হলের কোনো কোনো অংশের অবস্থা এমন যে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও নতুন কেউ গেলে ভয়ে থাকেন ‘কখন মাথায় ধসে পড়ে!’ এমন পরিস্থিতিতে গত শুক্রবার দেশে ৫.৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প হলগুলোর করুণ দশা আবার সামনে এনেছে। সেদিন ভূমিকম্পের পর আতঙ্কিত হয়ে ছাদ থেকে লাফিয়ে ও সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে আহত হয়েছেন বিভিন্ন হলের অন্তত ১৯ শিক্ষার্থী। হলগুলোর কয়েকটি ভবনে দেখা দিয়েছে ফাটল, খসে পড়েছে পলেস্তারা। শুক্রবারের ভূমিকম্পে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, জহুরুল হক হল, শেখ মুজিবুর রহমান হলের নবনির্মিত ভবন ও পুরাতন ভবন, শামসুননাহার হল ও মোকাররম ভবনে বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া জিয়াউর রহমান, এফ রহমান হলসহ বিভিন্ন হলে পলেস্তারা খসে পড়েছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীদের মনে। গতকাল শনিবার কয়েক দফার ভূমিকম্পে আতঙ্ক বেড়েছে কয়েকগুণ। সন্ধ্যার ভূমিকম্পে আবারও লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছেন ছয়জন।

এমন পরিস্থিতিতে ১৫ দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আজ রবিবার বিকেল ৫টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশনা দিয়েছে প্রশাসন। গতকাল রাতে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

গতকাল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসসমূহ যথারীতি খোলা থাকবে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের এক জরুরি সভা আজ শনিবার (গতকাল) উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানের সভাপতিত্বে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সাম্প্রতিক ভূমিকম্প ও তৎপরবর্তী ঝাঁকুনির কারণে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক আঘাতের বিষয়টি বিবেচনা করা হয় এবং তাদের সার্বিক নিরাপত্তার দিক সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সভায় বুয়েটের বিশেষজ্ঞ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের পরিচালক এবং প্রধান প্রকৌশলীর মতামত বিশ্লেষণ করা হয়। তাদের মতামত হলো ভূমিকম্প-পরবর্তী আবাসিক হলগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সামগ্রিক ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার দরকার। এ ঝুঁকি নিরূপণ ও সম্ভাব্য সংস্কারের স্বার্থে আবাসিক হলগুলো খালি করা প্রয়োজন। এ কারণে সভায় আগামী ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখা এবং আবাসিক হলগুলো খালি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগামীকাল (আজ) রবিবার বিকেল ৫টার মধ্যে আবাসিক হলসমূহ খালি করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সভায় প্রাধ্যক্ষদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।

গতকাল সভায় সিন্ডিকেট সদস্যরা সংযুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া চিকিৎসা অনুষদের ডিন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক, ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী অংশ নেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ৩৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকার বাজেট পাস হয়েছে। এত বিশাল বাজেট হলেও হল সংস্কারে দেওয়া হচ্ছে সামান্য পরিমাণ অর্থ।

১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের করিডর, পুরনো ব্লক ও একাধিক কক্ষে বড় ফাটল দেখা গেছে, ছাদের পলেস্তারা খসে লোহার রড বের হয়ে আছে। ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত জহুরুল হক হলের করিডর ও বর্ধিত ভবনের ছাদের নানা অংশ ধসে পড়েছে। ১৯৬৭ সালে নির্মিত মুহসীন হলের রিডিংরুম ও ইনডোর গেমস রুমের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। প্লাস্টার খসে রড বেরিয়ে আছে। সূর্য সেন হলের অডিটরিয়াম ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বন্ধ রয়েছে। জিয়া হলের ওপরের তলা নাজুক ছাদের ফাটল ও রড বেরিয়ে আছে। জগন্নাথ হলের পুরনো জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ভবনের তৃতীয়তলার সিঁড়ির ওপর বড় ফাটল এবং খসে পড়া প্লাস্টারে রড বেরিয়ে আছে।

কুয়েত মৈত্রী হলের মনোয়ারা ভবনকে ২০০৬ সালে প্রকৌশল শাখা ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। পরে গত বছর এই ভবন থেকে কিছু শিক্ষার্থীকে সরিয়ে নেওয়া হয়। রোকেয়া হলের বর্ধিত ভবনের ছাদের প্লাস্টারও নিয়মিত খসে পড়ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের এক্সটেনশন ভবনে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়া, দেয়ালে লম্বা ফাটল রয়েছে। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কবি জসীমউদদীন হল সম্প্রতি আলোচনায় আসে ৩২৪ নম্বর কক্ষে প্লাস্টার খসে পড়ে এক শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনায়। ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত ফজলুল হক মুসলিম হলে ছাদের অংশ ভেঙে পড়া, ওয়াশরুমের দেয়াল খসে পড়া এবং পুরনো বৈদ্যুতিক লাইনের শর্টসার্কিটের ভয় নিয়ে থাকতে হয়।

শিক্ষার্থীরা জানান, নামে দেশসেরা হলেও মানে সর্বনিম্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে শিক্ষার্থীরা মৃত্যুঝুঁকিতে থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা থাকেন সুউচ্চ অট্টালিকায়। প্রশাসন আসে-যায়, শিক্ষার্থীদের ভাগ্যের চাকা ঘোরে না। বিভিন্ন আশ্বাস দিয়ে বছরের পর বছর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়।

সার্বিক বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেন, হলগুলো সংস্কারে ১৪৯ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ নিয়েছি। আগামী সপ্তাহে ইউজিসির সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে আমরা কাজ শুরু করতে পারব বলে আশাবাদী।

আজ জগন্নাথেও ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ : অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার ভূমিকম্পের ঘটনায় আতঙ্কের পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও আজ রবিবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও সব ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির অফিশিয়াল কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলবে। কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিও চলবে।

ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রাখার ব্যাপারে একটি বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত