বরকতময় দেশ ফিলিস্তিন। এর প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে আসমানী বার্তার সৌরভ। পৃথিবীর বুকে এমন কয়টি দেশ আছে, যেখানে একই সঙ্গে এত নবী-রাসুলের আগমন, এত এলাহি নিদর্শন এবং ঐশী বরকতের সমাহার ঘটেছে? বাইতুল মুকাদ্দাসকে কেন্দ্র করেই সর্বাধিক নবী-রাসুলের আগমন ঘটেছে। তাই এই ভূমি যুগ যুগ ধরে মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। অসংখ্য নবী-রাসুলের স্মৃতিধন্য পবিত্র এই ভূমি এখন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্ব কি যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছে? না করলে পরকালে তাদের পরিণতি কী হবে?
গত দুই বছরের অধিক সময় ধরে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর নারকীয় তা-ব ও গণহত্যায় গাজার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া হাজারো প্রাণ, শিশুর ছিন্নভিন্ন দেহ, মায়ের বুকফাঁটা কান্না এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘশ্বাস বিশ্ববিবেকের সামনে এক ভয়াবহ প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। এই নির্মম পরিস্থিতির জন্য দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী যেমন প্রত্যক্ষভাবে দায়ী, তেমনি মুসলিম বিশ্বের নীরবতাও এই অপরাধের দায় এড়াতে পারে না। বিশেষ করে আরব দেশগুলোর নিছক বিবৃতিসর্বস্ব ভূমিকা এবং কার্যকর কোনো প্রতিরোধ গড়ে না তোলার বিষয়টি ইতিহাসের পাতায় এক লজ্জাজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। শুধুই কি ইতিহাসের পাতায় থাকবে? কক্ষনো না, কিরামান কাতিবিনের পাতায়ও থাকবে। আর আমাদের বিবেকের কাছেও প্রশ্ন, গাজাবাসীদের জন্য আমরাই বা কি করতে পেরেছি, শুক্রাবারে জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ ছাড়া?
গাজার রক্তস্নাত প্রান্তরে দাঁড়িয়ে গত বছর এক অসহায় নারী যে আর্তনাদ করেছিলেন, তা ছিল আরব দেশগুলোর জন্য এক চপেটাঘাত। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সেই নারী উচ্চৈঃস্বরে কেঁদে কেঁদে বলেছিলেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! লা তাশফা লিল-আরবি।’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আরবদের জন্য (পরকালে জান্নাতের) সুপারিশ করবেন না।’ রাসুল (সা.)-এর সুপারিশ থেকে বঞ্চিত হওয়া মানে জাহান্নামের অগ্নিগর্ভে নিক্ষিপ্ত হওয়া।
মজলুমের বদদোয়া অত্যন্ত শক্তিশালী। রাসুল (সা.) স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘মজলুমের বদদোয়াকে ভয় করো। কেননা তার বদদোয়া এবং আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।’ (সহিহ বুখারি) যখন কোনো মজলুম আল্লাহর দরবারে হাত তোলে, তখন আল্লাহ সেই ফরিয়াদ ফিরিয়ে দেন না। গাজার সেই নারীর কান্না যদি আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়, তবে আরব বিশ্ব এবং ক্ষমতাবান মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের জন্য এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কিছু হতে পারে না। দুনিয়ার স্বার্থরক্ষা, গদি টিকিয়ে রাখা কিংবা রাজনৈতিক সমীকরণের দোহাই দিয়ে তারা যে নিষ্ক্রিয়তার কৌশল অবলম্বন করেছেন, তা পরকালে তাদের জন্য নবীজির শাফায়াত লাভের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
রাসুল (সা.) মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ককে একটি দেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে মুমিনরা একটি দেহের মতো। যখন দেহের কোনো একটি অঙ্গ অসুস্থ হয়, তখন পুরো শরীর জ¦র ও অনিদ্রায় আক্রান্ত হয়।’ (সহিহ মুসলিম) অথচ গাজা যখন ক্ষতবিক্ষত, তখন মুসলিম বিশ্বের শরীর কি আদৌ ব্যথাতুর হয়েছে? তারা তো বিভিন্ন কৌশলে সচেতনভোবে নিজেদের দায়িত্ব ভুলে থাকার উদ্যোগ নিয়েছে।
ফিলিস্তিন অঞ্চলে একশ্রেণির মুসলিম সত্যের ওপর কেয়ামত পর্যন্ত অটল থাকবে। তাদের ব্যাপারে নবীজি (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার উম্মতের একটি দল সত্যের ওপর বিজয়ী থাকবে। শত্রুদের আতঙ্ক থাকবে। দুর্ভিক্ষ ছাড়া কোনো বিরোধী দল তাদের কিছু করতে পারবে না (মানে তাদের দমন করতে পারবে না)। আল্লাহ হুকুমে কেয়ামত পর্যন্ত তারা এমনই থাকবে। সাহাবায়ে কেরাম তখন জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসুল, তারা কোথায় থাকবে? রাসুল (সা.) বলেন, তারা বায়তুল মুকাদ্দাস এবং এর আশপাশে থাকবে। (মুসনাদে আহমদ)
আরব দেশগুলো কি বোঝে না, ফিলিস্তিনের বর্তমান ইস্যু তাদের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে কঠিন এক পরীক্ষা? আল্লাহ দেখতে চান, তারা ফিলিস্তিনবাসীর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ায় কিনা। কিন্তু তারা তো এই পরীক্ষায় জঘন্যভাবে অকৃতকার্য হচ্ছে। তারা কি নবীজি (সা.)-এর এই হাদিস পড়েনি? এমন সুস্পষ্ট বার্তাও তাদের কোনো নাড়া দেয় না? তাদের নাড়া দেবে সেদিন (হাশরের ময়দানে), যেদিন আফসোস ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।
অবৈধ দখলদার বাহিনী প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি দখল করছে। ভাবা যায়, সেখানে শুয়ে আছেন হজরত ইব্রাহিম (আ.), হজরত ইসহাক (আ.), হজরত ইয়াকুব (আ.), হজরত ইউসুফ (আ.), হজরত মুসা (আ.), হজরত দাউদ (আ.), হজরত সুলায়মান (আ.)-সহ অনেক পুণ্যবান পুরুষ। সেই ভূমিতে কদম পড়েছে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-সহ অসংখ্য নবী-রাসুলের। হজরত সুলায়মান (আ.) বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মাণের সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, যে ব্যক্তি নামাজের উদ্দেশে তাতে প্রবেশ করবে, সে যেন ওই দিনের মতো পবিত্র হয়ে যায়, যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিল। (সুনানে নাসায়ি)
বাইতুল মুকাদ্দাসের এক ইঞ্চি মাটির মূল্য সমগ্র পৃথিবীর চেয়ে বেশি। আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত। নবীজি (সা.) বলেন, অচিরেই এমন সময় আসবে, কোনো ব্যক্তি যদি ঘোড়ার রশি পরিমাণ জায়গাও পেয়ে যায়, যেখান থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস দেখা যায়, তাহলে এটা তার জন্য সমগ্র দুনিয়া থেকে বেশি উত্তম হবে। (মুসতাদরাকে হাকেম) পবিত্র এই ভূমিতে মৃত্যু হওয়াটাও সৌভাগ্যের বিষয়। এখানে হজরত মুসা (আ.)-এর মৃত্যুর ইচ্ছা পূর্ণ করা হয়েছে।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মালাকুল মাওতকে মুসা (আ.)-এর কাছে পাঠানো হলো। তিনি তার কাছে এলে মুসা (আ.) তাকে চপেটাঘাত করলেন। (এতে তার চোখ বেরিয়ে গেল।) তখন মালাকুল মাওত তার প্রতিপালকের দরবারে ফিরে গিয়ে বললেন, আমাকে এমন এক বান্দার কাছে পাঠিয়েছেন যে মরতে চায় না। তখন আল্লাহ তার চোখ ফিরিয়ে দিয়ে হুকুম করলেন, আবার গিয়ে তাকে বলো, তিনি একটি ষাঁড়ের পিঠে তার হাত রাখবেন, তখন তার হাত যতটুকু আবৃত করবে, তার সম্পূর্ণ অংশের প্রতিটি পশমের বিনিময়ে তাকে এক বছর করে আয়ু দান করা হবে। মুসা (আ.) এটা শুনে বললেন, হে আমার রব! তারপর কী হবে? আল্লাহ বললেন, তারপর মৃত্যু। মুসা (আ.) বললেন, তাহলে এখনই আমি প্রস্তুত। তখন তিনি একটি পাথর নিক্ষেপ করলে যতদূর যায় বাইতুল মুকাদ্দাসের ততটুকু নিকটবর্তী স্থানে তাকে পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে আরজ করলেন। নবীজি (সা.) বলেছেন, এখন আমি সেখানে থাকলে অবশ্যই পাথরের পাশে লাল বালুর টিলার নিকটে তার কবর তোমাদের দেখিয়ে দিতাম। (সহিহ বুখারি)
নবীজি (সা.) কখনো জালেম বা জালেমের সহায়তাকারীকে পছন্দ করেননি। যারা নিজের ভাইয়ের রক্ত ঝরতে দেখেও সচেতনভাবে নিষ্ক্রিয় থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, তারা পরোক্ষভাবে জালেমের হাতকেই শক্তিশালী করে। সময় ফুরিয়ে যায়নি, এখনো যদি মুসলিম বিশ্ব জেগে না ওঠে, যদি তারা এই গণহত্যার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে না তোলে, তবে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পাশাপাশি পরকালেও অপেক্ষা করছে ভয়াবহ পরিণতি।
লেখক : আলেম ও প্রবন্ধকার
