আসামি ৭ বছরের শিশু জিআরও-পেশকারের দায়!

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:২৬ এএম

চট্টগ্রামে সাত বছরের এক শিশুর বিরুদ্ধে চার বছরের আরেক শিশুকে অপহরণের অভিযোগে থানা-পুলিশ মামলা নেওয়ার ঘটনায় আদালত পাড়ায় তোলপাড় চলছে। গত শুক্রবার আদালতের নির্দেশে শিশুটিকে গাজীপুরের টঙ্গীতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (বালক) পাঠায় পুলিশ। পরে রবিবার ফের আদালতের নির্দেশে শিশুটিকে সেখান থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। সোমবার রাতে তাকে নেওয়া হয় চট্টগ্রামের হাটহাজারীর সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে। শিশুটির বাবা মাছ ধরতে সাগরে আর মা কারাগারে থাকায় এমন সিদ্ধান্ত দেয় চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ মো. হাসানুল ইসলামের আদালত।

এদিকে, শিশু আইন অনুযায়ী, ৯ বছরের কম বয়সী কোনো শিশু আসামি হওয়ার কোনো সুযোগ না থাকায় ঘটনাটি নিয়ে আদালতপাড়া ও নগর পুলিশে আলোচিত হয়ে ওঠে। নগর পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে মামলার বিষয়ে পুলিশের এক তদন্তের ভিত্তিতে বদলি করা হয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী (পেশকার) মনির হোসেন সরকার ও নারী ও শিশু আদালতের জিআরও মো. শহীদকে।

চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি মফিজুল হক ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাত বছরের শিশুকে ও চার বছরের আরেক শিশুকে অপহরণের অভিযোগে করা মামলায় আইনের সংস্পর্শে আনার বিষয়টি জানার পর রাষ্ট্রপক্ষ থেকে রবিবার আদালতে শিশুটির জামিনের আবেদন করা হয়। আদালত তা মঞ্জুর করে।’

জানা গেছে, চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল নগরের ষোলোশহর এলাকায় বসবাসরত আনোয়ারা বেগম তার বড় সন্তানকে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সঙ্গে নিয়ে যান চার বছরের ছোট সন্তান মো. রামিমকেও। একপর্যায়ে রামিম সেখান থেকে  হারিয়ে যায়। এই ঘটনায় নগরের পাঁচলাইশ থানায় জিডি করা হয়। অনেক খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে ঘটনার ৭ মাস পর গত শুক্রবার পাঁচলাইশ থানায় অপহরণ মামলা করেন তার মা আনোয়ারা বেগম। মামলায় আসামি করা হয় ৭ বছরের ওই শিশু ও তার ৩০ বছর বয়সী মাকে। ওই দিনই পাঁচলাইশ থানার এসআই এনামুল হক ষোলোশহর এলাকা থেকে সাত বছরের শিশু ও তার মাকে গ্রেপ্তার করে। শুক্রবারই তাদের হাজির করা হলে শিশুটিকে গাজীপুরের টঙ্গীতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (বালক) এবং তার মাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয় আদালত।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ৭ এর পিপি শফিউল মোরশেদ বলেন, ‘শিশু আইন ও দণ্ডবিধিতে ৯ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুর বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া, গ্রেপ্তার কিংবা আটকের সুযোগ নেই। আদালতের আদেশের নথি, মামলা এজাহারে বাদী শিশুটির বয়স সাত উল্লেখ করেছেন।’

সাত বছরের শিশুর বিরুদ্ধে থানায় মামলা গ্রহণ ও আইনের সংস্পর্শে নেওয়ার বিষয়ে পাঁচলাইশ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) অমিতাভ দত্তকে প্রশ্ন করা হলেও তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রবেশন কর্মকর্তা মনজুর মোরশেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আদালতের নির্দেশে শিশুটিকে গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তাকে চট্টগ্রামে নিয়ে আসা হচ্ছে। রাতে পৌঁছানোর পর হাটহাজারীর সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখা হবে। শিশুটির বাবা মাছ ধরতে সাগরে আর মা কারাগারে আছেন। বাবা আসার পর শিশুটিকে তার জিম্মায় দেওয়া হবে।

নগর পুলিশের উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) জিয়া উদ্দিন বলেন, সাত বছরের শিশুর বিরুদ্ধে মামলা হওয়া ও তাকে আদালতে আনার বিষয়ে তদন্ত করে পুলিশ কমিশনারের কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এ ঘটনায় ত্রুটি পাওয়া গেছে।

এই প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাত বছরের শিশুকে অপহরণ আসামি করার বিষয়টি যাচাই-বাছাই হচ্ছে। এরপর এখানে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন বিএইচআরএফের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, ‘ইতিপূর্বেও সাত বছরের এক শিশুর বিরুদ্ধে ধর্ষণে মামলা হয়। এখনকার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট যাদের গাফিলতি রয়েছে, সবার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। এটি ভুলে নয়, কাজে অবহেলার কারণে হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত