সত্য মানুষের চরিত্রকে আলোকিত করে। মনের গভীরে আল্লাহভীতি দৃঢ় হলে কথাতেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। যে সত্য বলে, তার কথায় প্রশান্তির ছাপ থাকে। আর যে মিথ্যা বলে, তার অন্তর অস্থিরতায় ভরে যায়। মানবসম্পর্ক, সমাজজীবন ও নৈতিকতার ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে এই সত্যনিষ্ঠতার ওপর। এ কারণেই পবিত্র কোরআন বারবার সত্যের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা দিয়েছে এবং মিথ্যাকে ঘোষণা করেছে ধ্বংসের কারণ।
মানুষ যখন সত্যকে ছাড়ে, তখন মনের ভেতর অন্ধকার ঘনীভূত হয়। অন্যায়কে ঢাকতে গিয়ে মিথ্যা একের পর এক জন্ম নেয়। ব্যবসায়ে, কথাবার্তায়, রাজনীতিতে মানুষ কখনো কখনো মিথ্যার আশ্রয় নেয়। কিন্তু ইসলাম মিথ্যাকে যেকোনো প্রেক্ষাপটে হীন ও বিধ্বংসী বলে আখ্যায়িত করেছে।
মুমিনের অন্যতম পরিচয় হলো মহান আল্লাহকে ভয় করে সদা সত্য কথা বলা। সত্যের সঙ্গে থাকা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তার বান্দাদের পরিপূর্ণ তাকওয়া অবলম্বনের পাশাপাশি সত্যবাদীদের সঙ্গী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তাকওয়া অবলম্বনকারীদের সঙ্গে থাক।’ (সুরা তওবা ১১৯)
যার অন্তরে আল্লাহভীতি থাকবে সে সত্যবাদী হবে। আর যে মিথ্যুক হবে, তার অন্তর আল্লাহভীতি থেকে খালি হওয়া বাধ্যতামূলক। এ জন্যই মহানবী (সা.) মিথ্যাকে মুনাফিকের স্বভাব বলে আখ্যা দিয়েছেন।
জিহ্বা দ্বারা সম্পাদিত সবচেয়ে ভয়ংকর পাপের একটি হলো মিথ্যা বলা। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বহু জায়গায় এর ভয়াবহতা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘মিথ্যাচারীরা ধ্বংস হোক।’ (সুরা জারিয়াত ১০)
মিথ্যার অনেক স্তর রয়েছে। তবে তার মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য স্তর হলো, আল্লাহ ও তার রাসুলের ওপর মিথ্যা রটানো। সাধারণত এ ধরনের মিথ্যার দ্বারা মানুষ ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ইসলামের বিভিন্ন বিধান নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ায়। এ ধরনের মিথ্যুকদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং তার চেয়ে অধিক জালেম কে, যে না জেনে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য আল্লাহর ওপর মিথ্যা অপবাদ দেয়? নিশ্চয় আল্লাহ জালেম কওমকে হেদায়াত করেন না।’ (সুরা আনআম ১৪৪)
জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার প্রতি মিথ্যারোপ করল, সে যেন তার বাসস্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করল। (ইবনে মাজাহ)
অনেকে আবার নিজেকে আধ্যাত্মিক শক্তিধর হিসেবে চিত্রিত করার জন্য মিথ্যা স্বপ্ন দেখার দাবি করে। বাস্তবে যে স্বপ্ন সে দেখেইনি। এ ধরনের মিথ্যাকে আমরা হালকা ভাবলেও প্রকৃতপক্ষে ইসলামের দৃষ্টিতে এসব মিথ্যাও জঘন্য অপরাধ।
বিপুল সংখ্যক মানুষ মিথ্যা বলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনে। পণ্য বেচাকেনার প্রয়োজনে মিথ্যা বলা, মিথ্যা কসম খাওয়াকেও মানুষ স্বাভাবিকভাবে নেয়। অনেকে তো ব্যবসায়িক কৌশলের বৈধ অংশ মনে করে। অথচ পণ্যের দোষ গোপন করে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বেচাকেনাও জঘন্য অপরাধ।
হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিন ব্যক্তির সঙ্গে মহান আল্লাহ কেয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদের পবিত্রতা প্রত্যায়ন করবেন না। তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। (তারা হলো) যারা দান করে খোটা দেয়, পায়ের গিরার নিচে কাপড় পরে এবং মিথ্যা কসম খেয়ে পণ্য বিক্রি করে। (নাসায়ি)
লেখক : আলেম ও ধর্মীয় নিবন্ধকার
