গত শুক্রবার মক্কার মসজিদে হারামে জুমার খুতবায় শায়েখ ড. বন্দর বিন আবদুল আজিজ বালিলা মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি, গুনাহ করার প্রবণতা এবং মহান আল্লাহর ক্ষমাশীলতার বিষয়ে আলোচনা করেন এবং গুনাহে অভ্যস্ত হওয়াকে আল্লাহ থেকে দূরে সরার ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করেন।
শায়েখ বালিলা বলেন, মহান আল্লাহ মানুষের আত্মাকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, তা স্বভাবতই বিভিন্ন আকাক্সক্ষার প্রতি ঝোঁক রাখে, প্রবৃত্তির চাপের মুখে দুর্বল হয়ে পড়ে, পাপের দিকে ধাবিত হয় এবং ভুল ও গুনাহে লিপ্ত হয়। এই প্রবণতাগুলো আল্লাহর গভীর হেকমত ও রহমতেরই অংশ, যাতে তার মহিমা, ক্ষমা, দয়া ও অনুগ্রহের পূর্ণতা প্রকাশ পায়। হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যার হাতে আমার প্রাণ, তার শপথ, তোমরা যদি কোনো পাপই না করতে, তাহলে মহান আল্লাহ তোমাদের সরিয়ে দিয়ে এমন এক জাতিকে সৃষ্টি করতেন যারা পাপ করবে, তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে আর আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেবেন।
তিনি বলেন, আল্লাহ চান মানুষ গোপনে তাকে ভয় করুক, মানুষ তার নিকটবর্তী হোক তওবা ও ইসতেগফারের মাধ্যমে, যেন মানুষের অন্তরে জাগে আল্লাহর স্মরণ ও সতর্কতার ভাব, ফিরে আসে বিনয়, কান্না ও আত্মসমর্পণের মনোভাব। এগুলো আল্লাহর কাছে সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ইবাদত। মানুষের কামনা-বাসনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ, এগুলো মানুষের জন্য আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উপায়। আর মানুষের স্বভাবগত দুর্বলতার কারণে মহান আল্লাহ এমন সব আমল নির্ধারণ করেছেন, যা মানুষের গুনাহ মুছে দেয়, ভুল-ত্রুটি ঢেকে দেয়।
শায়েখ বালিলা বলেন, এসবের মধ্যে অন্যতম সহজ ও ফলপ্রসূ উপায় হলো, কোনো পাপ হলে তার পরপরই সৎকর্ম করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নামাজ আদায় করো দিনের দুই প্রান্তে এবং রাতের কিছু অংশে। সৎকর্ম নিশ্চয়ই মন্দকর্মকে মুছে দেয়। এটি উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য উপদেশ।’ (সুরা হুদ ১১৪) নেক আমল অসংখ্য, আর প্রত্যেকটিই পাপের পর সৎকর্ম হিসেবে গণ্য হয়। এসব আমলের মধ্যে রয়েছে তাওহিদের কল্যাণকর কাজও।
হজরত আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান, তুমি যদি আমাকে ডাকো এবং আমার প্রতি আশা রাখো, আমি তোমার সব গুনাহ ক্ষমা করে দেব, কারও পরোয়া করব না। হে আদম সন্তান, যদি তোমার গুনাহ আকাশের চূড়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর তুমি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, আমি ক্ষমা করে দেব। হে আদম সন্তান, যদি তুমি পৃথিবী সমান গুনাহ নিয়ে আমার কাছে আসো আর আমার সঙ্গে কাউকে শরিক না করো, আমি তোমাকে পৃথিবী সমান ক্ষমা দান করব।’
শায়েখ বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তারে ফেতনা মানুষের হৃদয়ে বারবার আঘাত হানে। রাত-দিন, প্রকাশ্যে ও গোপনে, নানা সন্দেহ, প্রবৃত্তির টান, অবাধ্যতা ও অশ্লীলতার আহ্বান মানুষের সামনে এসে দাঁড়ায় কোনো অনুমতি ছাড়াই। তা সত্ত্বেও আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। বরং প্রতিটি ভুল যেন নতুন একটি সৎকর্মের অনুপ্রেরণা হয়, যাতে মানুষ সর্বদা আল্লাহর রহমত, ক্ষমা ও দয়ার ছায়ায় থাকতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, পাপে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া, গুনাহকে তুচ্ছ ভাবা, বারবার করতে করতে স্বাভাবিক মনে হওয়া, এগুলো বড় বিপদের লক্ষণ, বঞ্চনার চিহ্ন এবং পরম দয়ালুর নৈকট্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত। আর যার পাপ তাকে ব্যথিত করে, ভুল তাকে দুঃখ দেয়, গুনাহ তার অন্তরে ভার তৈরি করে, এটাই সত্যিকার ইমানের লক্ষণ, আল্লাহর নৈকট্যের নিদর্শন। এমন মানুষ কল্যাণের পথে রয়েছে যতক্ষণ পর্যন্ত এই অনুভূতি বিদ্যমান থাকে। হজরত আবদুল্লাহ ইবন ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যার নেক আমল তাকে আনন্দ দেয় এবং যার মন্দ কাজ তাকে দুঃখ দেয়, সেই ব্যক্তি সত্যিকারের মুমিন। (তিরমিজি)
৫ ডিসেম্বর শুক্রবার, মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সৌদি প্রেস এজেন্সি থেকে অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ আতিকুর রহমান
