আজ ১১ ডিসেম্বর, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের আজকের এই দিনে পাক হানাদার বাহিনীর হাত থেকে শত্রু মুক্ত হয় রাজধানীর কাছের জেলা মুন্সীগঞ্জ। এদিন কাকডাকা ভোরে জেলা শহরের সরকারি হরগঙ্গা কলেজের ছাত্রাবাসের ক্যাম্প থেকে পাক বাহিনীর পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে মুক্ত হয় মুন্সীগঞ্জ।
সেই থেকে প্রতি বছর এই দিনে মুন্সীগঞ্জ হানাদার মুক্ত দিবস পালিত হয়ে আসছে। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ আলোচনা সভাসহ দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করেছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ মুছাব্বেরুল ইসলাম জানান, সকাল ৯টার দিকে শহরে পুরাতন কাচারী এলাকার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নাম সম্বলিত স্মৃতি ফলকে পুষ্প স্তবক অর্পণ ও শিল্পকলায় আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। দুপুরে মসজিদসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দোয়া-প্রার্থনা করা হবে।
এদিকে, মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই পাক হানাদার বাহিনীর সতর্ক দৃষ্টি ছিল মুন্সীগঞ্জের দিকে। ওদের কাছে মুন্সীগঞ্জের গুরত্ব ছিল দুটি কারণে। প্রথমত, মুন্সীগঞ্জ ঢাকা থেকে মাত্র ১৭ মাইল দুরে। দ্বিতীয়ত, মাঝপথে ধলেশ্বরী নদী ওদের নিরাপদ চলাচলের জন্য জরুরি। তাছাড়া কুখ্যাত দালাল পাকিস্তান নেজামে ইসলামের সহ-সভাপতি মৌলানা আল মাদানীর পলায়নরত অবস্থায় মুন্সীগঞ্জের মানুষের হাতে নিহত হওয়ায় ঘটনা পাক হানাদারদের আগে থেকেই ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল। তাই ওরা মুন্সীগঞ্জে হানা দেওয়ার শুরুতেই ব্যাপক হত্যা ও অগ্নিসংযোগ ঘটাতে থাকে।
২৫ মার্চ কালো রাতে ইয়াহিয়া খানের র্ববর বাহিনীর আক্রমণের খবর পাওয়ার পরক্ষণেই প্রতিরোধ সংগ্রামে নেমে পড়ে মুন্সীগঞ্জবাসী। ২৯ মার্চ হরগঙ্গা কলেজের তৎকালীন শহীদ মিনারে মুক্তিপাগল ছাত্র-জনতা বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। একই দিন ছাত্র-জনতা মুন্সীগঞ্জ অস্ত্রাগার লুট করে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়ে।
২০ এপ্রিল পাকবাহিনীর সঙ্গে মুন্সীগঞ্জের মুক্তিপাগল জনতার যুদ্ধ হয়। এরপর অনেক প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে ৯ মে পাক বাহিনী ঢুকে পড়ে মুন্সীগঞ্জে। তারা জেলার গজারিয়ায় হানা দিয়ে ফুলদী নদীর তীরে ৩৬০ জেলে ও কৃষককে ব্রাশফায়ার করে হত্যার মধ্য দিয়ে মুন্সীগঞ্জে প্রবেশ করে। এরপর তারা জেলার বিভিন্ন স্থানে হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ অব্যাহত রাখে।
এছাড়া জেলার বিভিন্ন স্থানে পাক সেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের একাধিক যুদ্ধ হয়। সর্বশেষ ৪ ডিসেম্বর চুড়ান্ত যুদ্ধ হয় শহর সংলগ্ন রতনরপুর এলাকায়। এ যুদ্ধে বিভিন্ন এলাকা থেকে সহস্রাধিক মুক্তিযোদ্ধা পাক সেনাদের ৩টি বড় দলের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। পাকসেনারা ধলেশ্বরী নদীতে থাকা গানবোট থেকে মর্টার সেল নিক্ষেপ করছিল।
এ সময় মিত্র বাহিনীর বিমান বহন এসে পড়লে পাকসেনারা পিছু হটে। পরে মিত্র বাহিনীর আক্রমণে পাকসেনাদের গানবোট বিধধস্ত হয়। এ যুদ্ধে ৩ পাকসেনার লাশ পাওয়া যায়। তাছাড়া স্থানীয় ১৪ থেকে ১৫ জনের মতো নিরীহ মানুষ মারা যায়। এরপর ১০ ডিসেম্বর গভীর রাতে হানাদার বাহিনী মুন্সীগঞ্জে তাদের সুরক্ষিত দূর্গ হরগঙ্গা কলেজ থেকে পালিয়ে যায়। মুক্তি সেনারা তা টের পায় ১১ ডিসেম্বর ভোরে। এরপরই বিজয় মিছিলে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে মুন্সীগঞ্জবাসী।
