প্রায় ৬ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দ্বাদশ সমাবর্তন। এ সমাবর্তন নিয়ে সাবেক শিক্ষার্থীদের নানা আপত্তি থাকলেও তা অপরিবর্তিত রেখেই আগামীকাল বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টির দ্বাদশ সমাবর্তন। এবারের সমাবর্তনে ৬০, ৬১ ও ৬২তম ব্যাচ থেকে মোট ৫ হাজার ৯৬৯ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছেন। সমাবর্তনকে ঘিরে গতকাল বিকেলের ভেতরেই সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
দ্বাদশ সমাবর্তনে সভাপতি হিসেবে থাকবেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার, বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এবং সমাবর্তন বক্তা হিসেবে থাকবেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ।
এর আগে সমাবর্তনের অতিথি পরিবর্তন, রেজিস্ট্রেশনের সময় বৃদ্ধিসহ বেশকিছু দাবি জানিয়েছিলেন সাবেক শিক্ষার্থীদের একাংশ। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেগুলো মেনে না নেওয়া হলে সমাবর্তন বর্জনের ঘোষণা দেন। তবে সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
গত সপ্তাহের শুরু থেকেই সমাবর্তনের ভেন্যু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেডিয়ামের সংস্কার, ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মেরামত, গাছে চুনের প্রলেপ, প্রশাসনিক ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ ভবনের নতুন রঙয়ের কাজ শুরু হয়। এ সব কাজ শেষ হয়েছে গতকালকেই।
শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ, স্টেডিয়ামের সামনের সড়ক, প্রধান ফটক থেকে স্টেডিয়ামসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপরে আঁকা হয়েছে আলপনা। প্রশাসনিক ভবন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, সিনেট ভবন, মিলনায়তন, স্টেডিয়ামসহ এ সংশ্লিষ্ট রাস্তায় লাগানো হয়ে হরেক রঙয়ের রঙিন জোনাকি বাতি। গতকাল থেকে পুরো ক্যাম্পাস জ্বল জ্বল করেছে উৎসবের সাজে। রাস্তার প্রতিটি মোড়ে দেওয়া হয়েছে সড়ক নির্দেশনা। কিছুদুর পরে পরেই লাগানো হয়েছে হরেই রঙয়ের পতাকা। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সড়কে সমাবর্তনকে ঘিরে নানান প্লাকার্ড লাগানোও সম্পন্ন হয়েছে।
এদিকে প্রধান ফটক, বিনোদপুর ফটক, কাজলা ফটকে নতুন তোরন লাগানো হয়েছে। সমাবর্তনের মূল ভেন্যুতে সপ্তাহব্যাপী চলা কাজ শেষ হয়েছে ইতিমধ্যে। ভেন্যুর চারপাশ জুড়েই দেওয়া হয়েছে হরেক রকমের ব্যানার, ফেস্টুন, পতাকা। প্রায় ৭ হাজার শ্রোতার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন বিশাল স্টেজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বসানো হয়ে ফ্যান, কিছু দূর পরে পরেই লাগানো হয়েছে দৈত্যাকার এলইডি স্ক্রিন। ভেন্যু থেকে শুরু করে পুরো ক্যাম্পাস সেজেছে সমাবর্তনের আমেজে।
দ্বাদশ সমাবর্তনের অনুষ্ঠান শুরু হবে সকাল সাড়ে ৮টায়। অতিথি ও গ্রাজুয়েটদের আসন গ্রহণ, শোভাযাত্রা, স্বাগত বক্তব্য, ডিগ্রি উপস্থাপন ও গ্রহণ, শুভেচ্ছা ও সমাবর্তন বক্তব্য শেষে সভাপতির বক্তব্যের মাধ্যমে শেষ হবে এই পর্ব। পরে দুপুর আড়াইটায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হবে দ্বাদশ সমাবর্তনের আনুষ্ঠানিক পর্ব।
সমাবর্তনের বিষয়ে অনুভূতি প্রকাশ করে সাবেক শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম বলেন, সমাবর্তনের মধ্য দিয়ে আমাদের একাডেমিক জীবনের আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠনতান্ত্রিক অভিভাবক আচার্যকেই আমাসের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু, রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার সমাবর্তন উপস্থিত হওয়া সম্ভব না। তাই আমাদের চাওয়া ছিল অন্তত প্রধান উপদেষ্টা। কিন্তু, সেটিও হয়নি একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা উপদেষ্টাকে নিয়ে সমাবর্তন হবে। তারপরেও অংশগ্রহণ করছি, বিশ্ববিদ্যালয়টাকে আরও একবার উপভোগ করতে এবং বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে।
সমাবর্তনের আয়োজন এবং নিরাপত্তার সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, আমাদের সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। কোথাও কিছু কমতি আছে সেসব ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া নিরাপত্তার জন্য পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটা টিম কাজ করবে। আজকে বিজয় দিবস হওয়ায় প্রশাসনিক তৎপরতা জোরদার করা হয়নি। তবে কাল সকাল থেকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ, প্রক্টরিয়াল টিম এবং গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কাজ করবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালে। পরে ১৯৫৯, ১৯৬১, ১৯৬২, ১৯৬৫, ১৯৭০ সালে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। পরে দীর্ঘ ২৮ বছর বিরতির পর ১৯৯৮ সালের ২৯ নভেম্বর অধ্যাপক আব্দুল খালেক ভিসি থাকাকালীন সপ্তম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। পরে ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর ভিসি অধ্যাপক আব্দুস সোবহান অষ্টম সমাবর্তনের আয়োজন করেন। ২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন ভিসি থাকাকালীন নবম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়।
এরপর ২০১৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় দশম সমাবর্তন। সর্বশেষ একাদশ সমাবর্তন ২০১৯ সালের ৩০ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এই সমাবর্তনে অংশগ্রহণের জন্য তিন হাজার ৪৩১ জন স্নাতক নিবন্ধন করে। সর্বশেষ দুই সমাবর্তনের ভিসি ছিলেন অধ্যাপক এম. আব্দুস সোবহান।
