জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির অন্যতম নেতা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর শোকে জাতি যখন চরম দুঃখ-ভারাক্রান্ত, ক্ষোভে-বিক্ষোভে উত্তাল সাধারণ মানুষ; ঠিক এমন এক সময়ে দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার।
এদিন রাতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ব্যাপক হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। সবকিছু তছনছ হয়ে যাওয়ায় গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত হয়নি পত্রিকা দুটি। দীর্ঘসময় ধরে বন্ধ হয়ে যায় তাদের অনলাইনের কার্যক্রমও। অসহায় সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে হামলার শিকার হন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউএজ পত্রিকার সম্পাদক বর্ষীয়ান সাংবাদিক নূরুল কবির।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর তোপখানা রোডে অবস্থিত উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে।
প্রথম আলো ডেইলি স্টারে হামলার ঘটনাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার ইতিহাসে বাংলাদেশের জন্য এক কালো দিন আখ্যায়িত করেছেন বিশিষ্টজনরা। তারা বলছেন আসন্ন নির্বাচন বানচাল করতে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি এবং দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক পরিসরে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে।
ন্যক্কারজনক এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন সংগঠন এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি বিবৃতি দিয়ে দোষীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে।
এসব ক্ষেত্রে সরকারের শিথিল মনোভাবের অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘ডেইলি স্টার, প্রথম আলো ও নিউএজের সাংবাদিকদের প্রতি আমরা বলতে চাই আমরা আপনাদের পাশে আছি। সাংবাদিকদের ওপর হামলা মানেই সত্যের ওপর হামলা। আমরা আপনাদের পূর্ণ ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিচ্ছি।’
গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর পল্টনে গুলিবিদ্ধ হন হাদি। গত বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাত পৌনে ১০টার দিকে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। হাদির মৃত্যুর খবর আসার কয়েক ঘণ্টা পরই প্রথমে প্রথম আলো এবং কিছুক্ষণ পরই ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ওই হামলা চালানো হয়। প্রথম আলোর কর্মীরা কোনোভাবে বের হতে পারলেও, ডেইলি স্টারের বেশি কিছু কর্মী দীর্ঘসময় ধরে আটকা পড়েন জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
গতকাল সকালে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সেখানে ছুটে যান।
গতকাল বিকেলের দিকে পত্রিকা দুটির কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা যায়, এক দিন আগেও জমজমাট ভবন দুটিতে সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। পুরো ভবনে আগের রাতের অগ্নিসংযোগ আর ব্যাপক হামলা-ভাঙচুরের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে বাইরে থেকে। মোতায়েন করা হয়েছে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। সাংবাদিকদের পাশাপাশি উৎসুক জনতাও ভিড় জমাচ্ছেন সেখানে।
দুঃসহ কালো রাতে অসহায় সাংবাদিকরা : শুক্রবারের পত্রিকা প্রকাশের ব্যস্ততার মধ্যে বৃহস্পতিবার রাতে অল্প সময়ের ব্যবধানে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে ওই হামলা চালায় একদল উন্মত্ত জনতা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে ১০০ থেকে ২০০ জনের একটি দল ডেইলি স্টার ভবনের প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে আসবাব, গ্যালারি ও কাচের দরজা ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে নিচতলায় থাকা আসবাব ও সংবাদপত্রের স্তূপে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সেই আগুন ভবনের তৃতীয়তলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
আগুন থেকে বাঁচতে সাংবাদিক ও কর্মীরা ছাদে আশ্রয় নেন। ভবনের ভেতরে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় দমবন্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। ডেইলি স্টারের সিনিয়র রিপোর্টার জায়মা ইসলাম রাত ১টার দিকে ছাদ থেকে ফেসবুকে লেখেন, ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না। প্রচুর ধোঁয়া। আমি ভেতরে আটকা পড়েছি। আপনারা আমাকে মেরে ফেলছেন।’
হামলাকারীরা ভবনের প্রথম থেকে ষষ্ঠতলা পর্যন্ত উঠে ভাঙচুর চালায়। এ সময় কম্পিউটার, ক্যামেরাসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম লুট করা হয়। হামলাকারীরা ফায়ার সার্ভিসের গাড়িকে শুরুতে ডেইলি স্টার ভবনের কাছে যেতে বাধা দেয়। এতে উদ্ধারকাজ বিলম্বিত হয়।
বিক্ষোভকারীরা রাত ১২টা থেকে ভোররাত সাড়ে ৪টা পর্যন্ত কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করে। তারা ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোকে হাদি হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী হিসেবে দায়ী করে বিভিন্ন সেøাগান দেয়। পত্রিকা দুটিকে ‘দিল্লির দালাল’ ও ‘শেখ হাসিনার সহযোগী’ বলেও আখ্যায়িত করে তারা, যা ডেইলি স্টার দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
পত্রিকাটির মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান মাহমুদুল হাসান খান বলেন, ‘আগুন নিচতলা থেকে ওপরের দিকে ছড়িয়ে পড়লে আমাদের ২৮ জন সাংবাদিক ও কর্মী ছাদে আশ্রয় নিয়ে লোহার দরজা ভেতর থেকে আটকে দেন। শুক্রবার ভোররাত ৫টার দিকে সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তাদের উদ্ধার করেন। হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হামলাকারীরা নিচতলা থেকে দোতলা পর্যন্ত প্রায় সবকিছু পুড়িয়ে ও ভেঙে দিয়েছে।’
চার ঘণ্টা ধরে চলা এ হামলা ও বিক্ষোভের সময় পুলিশ, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বিক্ষোভকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। হামলার খবর পেয়ে নিউএজ সম্পাদক নূরুল কবির, প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা নাহিদ ইসলাম, নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারী, সামান্তা শারমিন, নাহিদা নিভা, মনিরা শারমিন এবং সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তারা হামলাকারীদের সহিংসতা পরিহার করে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
হামলার খবর পেয়ে ডেইলি স্টার কার্যালয়ের সামনে ছুটে গেলে সেখানে নিউএজ সম্পাদক নূরুল কবিরকে লাঞ্ছিত করা হয়। হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি।
তবুও অটুট মনোবলে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় : স্বাধীন সাংবাদিকতার ইতিহাসে বাংলাদেশের জন্য বৃহস্পতিবার এক কালো দিন ছিল উল্লেখ করে ডেইলি স্টার জানিয়েছে, এদিন দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে। সহকর্মীরা যখন ছাদে আটকা পড়ে নিজেদের জীবন নিয়ে শঙ্কায়, তখন নিচে একদল উন্মত্ত জনতা একের পর এক ফ্লোরে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ধোঁয়ায় দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টায় কেউ হতাহত হননি এবং সবাই নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পেরেছেন।
ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষ বলছে, শাহবাগের ঘটনা এবং কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের অভিমুখে একদল লোক আসার খবর পেয়ে ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষ সরকারের সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে যোগাযোগ করে। তারা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং ঘটনাস্থলে সহায়তা করেন। তবে আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছি, সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হলে ছাদে আটকে পড়া আমাদের সহকর্মীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা চরম অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুভয়ে কাটাতে হতো না।
এ হামলা আসন্ন নির্বাচন বানচাল করতে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির আরেকটি অপচেষ্টা বলে মনে করছে ডেইলি স্টার। পত্রিকাটি বলছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম অগ্রসেনানী শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, একটি বিশেষ মহল এই জনরোষ কাজে লাগিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পক্ষে থাকা দুটি পত্রিকার বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দিয়েছে।
পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে হামলাকারী ও তাদের ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছে পত্রিকাটি। তারা বলছে, হাদির ওপর গুলির ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কহীন প্রতিষ্ঠানের ওপর এমন সহিংসতা কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
ডেইলি স্টারের অনলাইনে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত এক সংবাদে বলা হয়, গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের শিথিল মনোভাব আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। অতীতেও ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো বিভিন্ন মহলের হুমকির মুখে পড়েছে, কিন্তু সেসব ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয়নি। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত চলা এ হামলা শুধু দুটি পত্রিকার ওপর হামলা নয়; এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা, বাকস্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর আঘাত। এ ঘটনাকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
ডেইলি স্টারের পথচলা থামবে না এমন আশ^স্ত করে পত্রিকাটি জানিয়েছে, গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার প্রতি আমাদের অবিচল বিশ্বাস অটুট থাকবে। ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিতে আমাদের অঙ্গীকার অব্যাহত থাকবে। স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রতি আমাদের নিষ্ঠা থাকবে অবিচল।
প্রথম আলোর বক্তব্য : পত্রিকাটির অনলাইনে প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে বলা হয়, প্রথম আলোর অফিস উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সংগঠিত আক্রমণের শিকার হয়েছে। কর্মীরা এ সন্ত্রাসী হামলার মুখে সম্পূর্ণ নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন। আক্রমণকারীরা অফিসের ভবন ব্যাপকভাবে ভাঙচুরের পর তাতে অগ্নিসংযোগ করে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা অগ্নিকা-ের কারণে ভবন পুড়ে যায় এবং তাতে সংরক্ষিত সম্পদ ও মূল্যবান নথিপত্র ভস্মীভূত হয়।
প্রথম আলো অফিস আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা যাওয়ায় এ ব্যাপারে নিরাপত্তা চেয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীসহ নানা মহলের সঙ্গে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা পৌঁছানোর আগেই অফিস আক্রান্ত হয়ে পড়ে। কর্মরত উদ্বিগ্ন সাংবাদিক ও কর্মীরা জীবন বাঁচাতে কার্যালয় ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। আইনশৃঙ্খলা ও দমকল বাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
শরিফ ওসমান হাদির দুঃখজনক হত্যাকা-ের ঘটনা পুঁজি করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে এসব আক্রমণের ঘটনা ঘটিয়েছে। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের জন্য এ ছিল একটি কালো দিন।
এ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ভিন্নমতের প্রকাশের অধিকারের ওপর সরাসরি আক্রমণের একটি সুস্পষ্ট নজির। আমরা এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। পাশাপাশি ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনারও দাবি জানাই। আগামীকাল (আজ) থেকে যথারীতি পত্রিকা প্রকাশিত হবে।
দুই সম্পাদকের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার ফোনালাপ : বৃহস্পতিবার রাতে দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় পত্রিকা দুটির সম্পাদকদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
ফোনালাপে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আপনাদের প্রতিষ্ঠান ও সংবাদকর্মীদের ওপর এ অনাকাক্সিক্ষত ও ন্যক্কারজনক হামলা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। এ দুঃসময়ে সরকার আপনাদের পাশে আছে।
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ওপর এ হামলা স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর হামলার শামিল। এ ঘটনা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে এক বিরাট বাধা সৃষ্টি করেছে।
টেলিফোনে আলাপকালে সম্পাদকদের ও সংবাদমাধ্যমগুলোর পূর্ণ নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহযোগিতার আশ্বাস দেন প্রধান উপদেষ্টা। শিগগিরই এ সম্পাদকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে বলেও জানান প্রধান উপদেষ্টা।
সাংবাদিকদের মানববন্ধন : ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে গতকাল বিকেলে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন পত্রিকাটির কর্মীরা। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরাও এ মানববন্ধনে যোগ দেন।
মানববন্ধনে প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বলেন, এ হামলার ঘটনা দেশের সংবাদমাধ্যম, বাকস্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের জন্য কালো দিন। বাংলাদেশের বাকস্বাধীনতা, ভিন্নমতের প্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর একটি কঠিন আক্রমণ করা হয়েছে। হাদির হত্যাকা-কে পুঁজি করে পরিকল্পিতভাবে একটি স্বার্থান্বেষী মহল এ সংগঠিত আক্রমণটি চালিয়েছে।
হামলাকারীদের বাংলাদেশের আইনের আওতায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক বলেন, ‘আমরা এ ঘটনার প্রতিবাদ জানাই এবং দাবি জানাই, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক। যারা দোষী তাদের খুঁজে বের করা হোক।’
মানববন্ধনে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হকসহ সংবাদপত্রের সব বিভাগের কর্মীরা অংশ নেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য কাজী রওনাক হোসেন, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সহসভাপতি মেহেদী আজাদ মাসুম, যুগ্ম সম্পাদক মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, সাবেক সহসভাপতি গাযী আনোয়ার প্রথম আলোর কর্মীদের এ কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করেন।
বিভিন্ন সংগঠন ও বিশিষ্ট নাগরিকদের বিবৃতি : পত্রিকা অফিসে হামলা, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন- ডিইউজে।
ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এক যুক্ত বিবৃতিতে বলা হয়, এ হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরে কখনো আইনের শাসন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ও সংবাদমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরা হয়েছিল।
এতে আরও বলা হয়, পরিকল্পিতভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে এ ন্যক্কারজনক হামলা চালানো হয়েছে। বিশেষ করে ইংরেজি দৈনিক নিউএজ সম্পাদক সর্বজন শ্রদ্ধেয় নূরুল কবিরের ওপর হামলা একটি বিশেষ মহলের সুপরিকল্পিত এজেন্ডা।
এদিকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ঢাকায় কর্মরত বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের সংগঠন ওভারসিস করসপনডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ওকাব)।
জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম আইকন শরিফ ওসমান বিন হাদির পরিকল্পিত ও নির্মম হত্যাকা-ে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একই সঙ্গে এ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে মুক্ত গণমাধ্যম, ভিন্নমত ও বাকস্বাধীনতার ওপর যে সংগঠিত ও অভূতপূর্ব ধ্বংসাত্মক আক্রমণ সংঘটিত হয়েছে, তা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি, নাগরিক নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার চেতনা এবং জুলাই অভ্যুত্থানের মূল্যবোধের বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত হিসেবে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, টিআইবি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছে, ওসমান হাদির হত্যাকা-ে জড়িত সবাইকে বিচারের জন্য গ্রেপ্তার করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘টার্গেটেড শুটিংয়ে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তারে সরকারের ব্যর্থতা, এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে যেতে সহায়তার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গণরোষের ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি নিরসনে অদূরদর্শিতা ও অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। অন্যদিকে, কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর বিজয়ের দাবিদার শক্তিগুলোর একাংশের আক্রোশপূর্ণ ও প্রতিশোধপ্রবণ আচরণ রাষ্ট্র ও সমাজে নতুন ধরনের দমনমূলক প্রবণতা জন্ম দিচ্ছে। কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে মানবিক মূল্যবোধ ও মৌলিক মানবাধিকার যেভাবে পদদলিত হয়েছিল, আজ সেই একই দমনমূলক বাস্তবতা নতুন রূপে ফিরে আসছে। ওসমান হাদির নির্মম হত্যাকা-কে কেন্দ্র করে সৃষ্ট আবেগাপ্লুত পরিস্থিতিকে পুঁজি করে মুক্ত গণমাধ্যম, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতাবিরোধী স্বার্থান্বেষী মহল পতিত শক্তির ইন্ধনে সহিংসতা উসকে দিয়ে পরিস্থিতিকে পরিকল্পিতভাবে আরও ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
নির্মম হামলায় তরুণ রাজনীতিবিদ শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর সংবাদকে কেন্দ্র করে দেশে যে পরিকল্পিত মব সন্ত্রাস ও সহিংসতার ধারাবাহিকতা দেখা গেছে, তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ বলে উল্লেখ করে ন্যক্কারজনক এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
গতকাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আসক জানায়, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার কার্যালয়ে সংঘটিত পরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন, যা মতপ্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি ও গুরুতর আঘাত। এ সহিংসতার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে নিউএজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবিরের ওপর মব তৈরি করে হেনস্তা করার ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য ভয়ংকর বার্তা বহন করে।
নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেছেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ভাঙচুরের ন্যক্কারজনক ঘটনা আমাদের মুখের ওপর আঘাত করে জানিয়ে দিয়েছে নাগরিক অধিকার সুরক্ষার জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক শর্ত সমাজে উৎপাদনের কথা ছিল, সেখানে আমরা ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছি। কাগজে-কলমে নাগরিক থাকলেও, বাস্তবে নাগরিকতার চর্চা ও প্রতিরোধী নৈতিকতা আমরা গড়ে তুলতে পারিনি।
তোপখানা রোডে উদীচীর কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ : রাজধানীর তোপখানা রোডে অবস্থিত উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল সন্ধ্যায় ৭টার দিকে একদল ব্যক্তি কার্যালয়ে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায় এবং পরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় কার্যালয়ের আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, সন্ধ্যা ৭টা ৪২ মিনিটে অগ্নিকা-ের খবর পাওয়া যায়। এরপর ৭টা ৪৭ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসের প্রথম ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরে আরও তিনটি ইউনিট যুক্ত হয়ে মোট চারটি ইউনিটের চেষ্টায় রাত ৮টা ১৩ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তিনি আরও জানান, অগ্নিকা-ে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।
এ বিষয়ে শাহবাগ থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান জানান, ঘটনাটির কারণ শনাক্তে তদন্ত চলছে। কেউ আগুন দিয়েছে নাকি কোনোভাবে আগুন লেগেছে সেটি এখনো বলা যাচ্ছে না।
