গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৬টা। শীতে জবুথবু দেশের বুকে নেমে এলো এক বিষাদময় ক্ষণ, এক নীবর-নিস্তব্ধ প্রহর। অনন্তকালের জন্য অস্ত গেল বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বিএনপি চেয়ারপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, কোটি মানুষের হৃদয়ের রানি বেগম খালেদা জিয়া। ৮০ বছরের এক দীর্ঘ পথপরিক্রমার পর তিনি পাড়ি জমালেন পরপারে (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
সাবেক তিনবারের এই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে আজ সাধারণ ছুটিসহ ঘোষণা করা হয়েছে এবং তিন দিনের জাতীয় শোক। বেগম জিয়াকে যথাযোগ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করতে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার জানাজা আজ জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজাসংলগ্ন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে দুপুর ২টায় অনুষ্ঠিত হবে। দুপুর সাড়ে ৩টায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হবে চন্দ্রিমা উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে।
বাংলাদেশ তার জন্মের পর বহু শাসক দেখেছে, কিন্তু খুব কম নেতাই ছিলেন, যারা খালেদা জিয়ার মতো রাষ্ট্রের সঙ্গে এত গভীরভাবে একাকার হয়ে গেছেন। খালেদা জিয়ার জীবন ও নেতৃত্ব আরাম-আয়েশ বা ঐকমত্যের মধ্য দিয়ে নয়, গড়ে উঠেছে সংঘাত, সহনশীলতা, পরিপক্বতা ও পরিণতির ভেতর দিয়ে। স্বামী বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অকালমৃত্যুর পর তিনি হয়ে ওঠেন চাপের মুখে পড়া নতুন একটি দলের প্রাণ, কোটি কর্মী-সমর্থকের আপনজন। তিনি ছিলেন এক লৌহমানবী, যার হাসির নিচে লুকিয়ে থাকত অসম্ভব এক দৃঢ়তা আর চোখের জলে ভেসে যেত এক জাতির বেদনা। তার জীবন ছিল লড়াইয়ের প্রতীক। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, কারাবরণ, নিষেধাজ্ঞা কোনো কিছুই তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি সব ঝড়ঝাপটা মোকাবিলা করে এগিয়ে গেছেন বলিষ্ঠ পদক্ষেপে। তার নেতৃত্বে বিএনপি বারবার ক্ষমতায় এসেছে, আবার বিরোধী দল হিসেবেও রেখেছে গণতন্ত্রের সংগ্রামের প্রতীক হয়ে।
সেই লৌহমানবীর শেষ মুহূর্তটা ছিল পরিবারের আলিঙ্গনে ঢাকা। জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানের হাত ধরেই যেন চলে গেলেন তিনি।
গতকাল শেষ হলো বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও প্রভাবশালী অধ্যায়। তার যাওয়ায় যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা শুধু একটি দলের নয়, পুরো জাতির। একজন নেত্রীর শারীরিক অস্তিত্ব না থাকলেও, তিনি যে আদর্শ ও স্মৃতি রেখে গেছেন, তা কোটি মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। বিতর্ক থাক, প্রশংসা থাক বাংলাদেশের ইতিহাসে খালেদা জিয়ার নাম এক গৌরবময় অধ্যায় হয়েই থাকবে। সব আলো নিভে যায় না, সব নক্ষত্রের পতন হয় না। কিছু আলো নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে অনন্তকাল জুড়ে।
বেগম জিয়ার এই মৃত্যুর খবর ভোরের কনকনে শীত আর কুয়াশা ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ে বিদ্যুতের গতিতে। মানুষ যে যেখানে ছিল, সেখানেই যেন দাঁড়িয়ে পড়ে, থেমে যায় সব কোলাহল। হাসপাতালের ভেতরে-বাইরে উঠে কান্নার রোল। শোকে মূক হয়ে ওঠে পুরো বাংলাদেশ।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘আপসহীন নেত্রী’ অভিধায় ভূষিত খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন ৪১ বছর। তিনি পাঁচবারের সংসদ সদস্য, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী আর বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন দুবার। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে নাম লেখানো খালেদা জিয়ার চার দশকের রাজনৈতিক জীবনের বড় সময় কেটেছে রাজপথের আন্দোলনে। তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন, জেল খেটেছেন; তবে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাননি। সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে কখনো তিনি হারেননি।
লিভার-সংক্রান্ত জটিলতা, কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস ও ইনফেকশনজনিত সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিল এবং দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন খালেদা জিয়া। গত ২৩ নভেম্বর থেকে তিনি বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে তার বড় ছেলে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং পরিবারের সদস্যরা গত সোমবার গভীর রাতে হাসপাতালে ছুটে যান। রাত ২টার পর এজেডএম জাহিদ হোসেন হাসপাতালের সামনে এসে সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়া ‘অত্যন্ত সংকটাপন্ন’ সময় অতিক্রম করছেন। তার পরিবারের পক্ষ থেকে তার সুস্থতার জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে দেশবাসীকে দোয়া করার আহ্বান জানাচ্ছি। এর কয়েক ঘণ্টা পর হাসপাতালের চিকিৎসকরা বিএনপি চেয়ারপারসনকে মৃত ঘোষণা করেন।
খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান, তারেকের স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার প্রয়াত ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শার্মিলা রহমান, তাদের দুই মেয়ে জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার, তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা, প্রয়াত সাইদ এস্কান্দারের স্ত্রী নাসরিন এস্কান্দার, খালেদা জিয়ার মেজ বোন সেলিনা ইসলামসহ পরিবারের সদস্যরা এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ সময় হাসপাতালে ছিলেন।
বেগম জিয়ার মৃত্যুর খবরে তাৎক্ষণিকভাবে শোকের ছায়া নেমে আসে। হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্সদের অনেককে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। এই শোক সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। অনেকেই শোক প্রকাশ করে পোস্ট দেন। বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকরা জড়ো হতে থাকেন এভারকেয়ার হাসপাতালের বাইরে। পরে সকাল ৯টায় খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদার সাংবাদিকদের সামনে এসে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘১ মাস ১০ দিন বিভিন্ন চিকিৎসা করে তাকে সুস্থ করার জন্য আমাদের আপ্রাণ চেষ্টা ছিল, কিন্তু আমি মেডিকেল বোর্ডের পক্ষ থেকে আজ (গতকাল) ভোর ৬টায় তাকে ক্লিনিক্যালি ডেড ঘোষণা করেছিলাম। আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে তার জন্য দোয়া চাই। আপনারা দোয়া করবেন, তিনি যেন বেহেশতবাসী হন।’
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ সময় বলেন, ‘এই সংবাদটি নিয়ে আপনাদের সামনে দাঁড়াতে হবে, এটা আমরা কখনো ভাবিনি। এই শোক, এই ক্ষতি, এটা অস্বাভাবিক, অপূরণীয়। এই জাতি কোনো দিন পূরণ করতে পারবে না।’
মির্জা ফখরুল বলেন, তাদের নেত্রীর মৃত্যুর খবর পেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ফোন করেছিলেন।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিএনপি সাত দিনের শোক ঘোষণা করেছে জানিয়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের সব কার্যালয়ে সাত দিন কালো পতাকা উত্তোলন থাকবে। দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা এই সাত দিনব্যাপী কালো ব্যাজ ধারণ করবেন। প্রতিটি দলীয় কার্যালয়ে দেশনেত্রীর জন্য সাত দিনব্যাপী কোরআন খতম ও দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ও গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয় কেন্দ্রীয়ভাবে এবং জেলাপর্যায়ে দলীয় কার্যালয়ে শোকবই খোলা হবে।’
স্থায়ী কমিটির বৈঠক : চেয়ারপারসনের মৃত্যুর পর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জরুরি বৈঠকে বসে বিএনপির স্থায়ী কমিটি। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এই বৈঠক চলে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ছাড়াও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, এজেডএম জাহিদ হোসেন ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ অংশ নেন।
বৈঠক শেষে বেলা পৌনে ৩টার দিকে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব জানান, খালেদা জিয়ার জানাজা আজ বেলা ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তার স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে দাফন করা হবে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার জানাজা পড়াবেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব। পুরো জানাজা কার্যক্রমের সঞ্চালনা করবেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। সবাই অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে জানাজায় অংশগ্রহণ করবেন এবং তার দাফনে অংশ নেবেন।
৫ বছরে ৪৮৪ দিন হাসপাতালে : দলীয় ও পারিবারিক সূত্র জানায়, গত পাঁচ বছরে দেশে বাংলাদেশে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) এবং এভারকেয়ার হাসপাতালে তাকে কমপক্ষে আটবার ভর্তি হতে হয়েছে। এ ছাড়া উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে লন্ডনেও চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং খালেদা জিয়ার দেশ-বিদেশে চিকিৎসা কার্যক্রমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত চিকিৎসক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন জানান, গত পাঁচ বছরে খালেদা জিয়া ৪৮৪ দিন হাসপাতালের বিছানায় কাটিয়েছেন।
বিএনপির কর্মসূচি : খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সাত দিনব্যাপী বিএনপি শোক পালন করবে। কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের সব দলীয় কার্যালয়ে এ সময় কালো পতাকা উত্তোলন এবং দলীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করবেন। প্রতিটি দলীয় কার্যালয়ে কোরআন খতম ও দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে গুলশানের বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ও নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এবং জেলাপর্যায়ে দলীয় কার্যালয়ে শোকবই খোলা হবে।
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক : বেগম জিয়ার মৃত্যুর পর দুপুরে উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি সভা হয়। বৈঠকে বিশেষ আমন্ত্রণে অংশ নেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৈঠক শুরু হয় এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে। সভায় প্রধান উপদেষ্টা বেগম জিয়ার স্মৃতিচারণ করেন। এতে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজাসংলগ্ন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে খালেদা জিয়ার জানাজার সিদ্ধান্ত হয়।
সভা শেষে ব্রিফিংয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, পুরো জাতির মতো সরকারে যারা আছেন, তারাও শোকাহত। উপদেষ্টা পরিষদের সভায় খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আজ বুধবার থেকে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোকপ্রস্তাব গৃহীত হয়েছে এবং থাকবে সাধারণ ছুটি। তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে বেগম জিয়ার অবদান অবিনশ্বর হয়ে থাকবে। এমন একজন নেত্রীর চলে যাওয়াটা একটি বিশেষ মুহূর্ত। সবাই শোকাহত। সবার উচিত জানাজা ও দাফনে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখা। উপদেষ্টা পরিষদের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশ্বে বাংলাদেশের যত দূতাবাস ও হাইকমিশন আছে, সেগুলোতে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকবই খোলা হবে।
কান্নার রোল নয়াপল্টনে : খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জড়ো হন নেতাকর্মীরা। প্রিয় নেত্রীর মৃত্যুতে কান্নার রোল পড়ে যায় তাদের মধ্যে। অনেককেই হাউমাউ করে কাঁদতে দেখা গেছে। অনেক নেতাকর্মী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর জন্য শেখ হাসিনাকে দায়ী করে তার ফাঁসি দাবি করেন। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদের পর থেকেই নয়াপল্টনে কোরআন খতম শুরু হয়। সকাল ১০টা থেকে দলীয় কার্যালয়ের নিচতলায় ওলামা দল কোরআন খতম শুরু করে। আজ বুধবার জানাজার আগ পর্যন্ত কোরআন খতম চলবে। দলীয় কার্যালয়ে উত্তোলন করা হয়েছে কালো পতাকা।
শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চায় বিএনপি : খালেদা জিয়ার মৃত্যুর শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চায় দলটি; ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে যার নেতৃত্বের ভার পড়েছে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর বড় ছেলে তারেক রহমানের ওপর। গতকাল দুপুরে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তারা খালেদা জিয়ার নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে দেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চান।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠা বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, ‘দেশনেত্রীর ইন্তেকালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অপূরণীয় ক্ষতি হল এবং এই ক্ষতিপূরণ সহজে সম্ভব নয়। আজকে এমন একটা সময়ে তিনি চলে গেলেন, যখন তাকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। যখন গণতন্ত্রের উত্তরণের জন্য একটা নির্বাচনের দিকে জাতি যাচ্ছে, যখন সব জাতি তৈরি হয়েছে নির্বাচন করে একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করবে। সে সময় তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এই শোক, এই বেদনা আমাদের পক্ষে ধারণ করা খুব কঠিন। তারপরও আমরা এই শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে চাই। আমরা দেশনেত্রীর নির্দেশিত যে পথ, সেই পথকে অনুসরণ করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আমরা একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাই এবং সেই পথকে লক্ষ করে একটা সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আসুন আমরা আজকে সবাই শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে একটা অপ্রতিরোধ্য দল হিসেবে গড়ে তুলি। বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থেই একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আমরা প্রতিষ্ঠিত করি।’
ব্যক্তিগত চিকিৎসক যা বললেন : খালেদা জিয়ার ‘মাতৃস্নেহ’র কথা স্মরণ করলেন অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন। গতকাল দুপুরে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এভাবে স্মরণ করলেন বিএনপি চেয়ারপারসনকে। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া এমন একজন মানুষ ছিলেন, আমরা যারা তার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সুযোগ পেয়েছি। আমরা দেখেছি, তিনি একদিকে যেমন সত্যি সত্যি অভিভাবক, আরেক দিকে মাতৃস্নেহে তিনি আমাদের দেখতেন। কোনো দিন বাসায় যাওয়ার পরে কোনো কিছু না খেয়ে বাসা থেকে কেউ যেতে পারতেন না।’
জাহিদ বলেন, ‘ডাক্তারদের কী খাইয়েছেন? এগুলো সবসময় তার যারা কাজের সহকর্মী ছিলেন, সহায়তা করতেন, তাদের জিজ্ঞাসা করতেন। তিনি বলে দিতেন আজকে এটা দেবে।’ তিনি বলেন, ‘কোনো দিন (চিকিৎসক) যেতে একটু দেরি হলে জিজ্ঞাসা করতেন, এত দেরি কেন হলো? আমি তো বসে আছি। অর্থাৎ চিকিৎসকরা কখন যাবেন। তিনি যখন বাসায় থাকতেন, তখন প্রত্যেক দিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তার বাসায় যেতেন। তিনি সবার সঙ্গে কথা বলতেন। কাজেই আমি আজকের এই দিনে বলব, চলুন, আমরা সবাই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে দোয়া করি, তাকে যেন আল্লাহ বেহেশত নসিব করেন।’
আপনার সঙ্গে কবে শেষ কথা হয়েছিল? জানতে চাইলে অধ্যাপক জাহিদ বলেন, ‘১ ডিসেম্বরে তার ডায়ালাইসিস স্টার্ট করা হয়েছে। তার পরিবর্তে ইলেকটিভ ভেন্টিলেশনে নেওয়া হয়েছে। তারপরও তার সঙ্গে আমাদের (চিকিৎসকদের) কথা হয়েছে। আমরা যখন তাকে দেখেছি, তিনি আমাদের কথার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং রেসপন্স দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কাজেই রোগী হিসেবে তিনি যেহেতু অসুস্থ...। আমরা সবসময় তার সঙ্গে কথা বলা ঠিক না, শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে, কোনো অবস্থাতেই তার রোগ বেড়ে যাক এ ধরনের কোনো আচরণ কোনো চিকিৎসক করেননি। তাই, কবে কথা হয়েছে, সুনির্দিষ্টভাবে এখন বলার মতো আমার মানসিক অবস্থায় এই মুহূর্তে নেই।’ তিনি বলেন, ‘তিনি সবসময় আমরা যখন দেখতে যেতাম, তিনি রেসপন্স করতেন। তাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হতো বা কথা বলার জন্য বলা হতো অথবা তাকে প্রশ্ন করা হতো প্রত্যেকটিরই তিনি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতেন।’
শোকবইয়ে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের স্বাক্ষর : খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা। শোক জানানোর পাশাপাশি তারা কূটনৈতিক শোকবইয়ে স্বাক্ষরও করে যাচ্ছেন। গতকাল গুলশানের বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা আসেন এবং শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেছেন।
মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির বলেন, ‘বেলা ২টা ৫৫ মিনিটে শোকবইয়ে প্রথম স্বাক্ষর করেন চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।’
জানা গেছে, এরপর পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার, ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা, নেদারল্যান্ডসের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত জোরিস ফ্রানসিসকাস জেরারডুস ভ্যান বোমেল এবং ওমানের রাষ্ট্রদূত জামিল হাজি ইসমাইল আল বালুশি ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, ইরান, জাপান, সৌদি আরব, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ফিলিস্তিনসহ ২৮টির অধিক দেশের প্রতিনিধি খালেদা জিয়ার শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেছেন।
শায়রুল কবির জানান, ৩০ ডিসেম্বর বেলা ৩টা থেকে শুরু হয়েছে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং আজ ৩১ ডিসেম্বর বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা ও ১ জানুয়ারি সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত স্বাক্ষর চলবে।
জানাজায় মেট্রোরেলের বিশেষ সার্ভিস : খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশগ্রহণের সুবিধার্থে আজ বুধবার মেট্রোরেল বিশেষ সার্ভিস দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, যাত্রীসাধারণের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশগ্রহণের সুবিধার্থে আজ ডিএমটিসিএল নিয়মিত সময়সূচির অতিরিক্ত বিশেষ মেট্রোরেল সার্ভিস পরিচালনা করবে।
