বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দুই বছর কারাভোগ করতে হয়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া হেঁটে কারাগারে যান। এরপর ২০২০ সালের মার্চ মাসে সরকারের নির্বাহী আদেশে যখন মুক্তি পান তখন হুইল চেয়ারে করে বের হন। অভিযোগ রয়েছে, ২০০ বছরের পরিত্যক্ত কারাগারের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে রাখা হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। সেখানে তাকে যথাসময়ে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। এ কারণে তার অসুস্থতা বেড়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য যেতে দেওয়া হয়নি বিদেশেও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারাগারে যথাযথ চিকিৎসা না দেওয়ার কারণে খালেদা জিয়াকে আমৃত্যু ভুগতে হয়েছে। শেষ ৫ বছরে ৪৮৪ দিন হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসনকে। তাদের ভাষ্য, মূলত কারাগারেই জীবনীশক্তি কমে আসে খালেদা জিয়ার।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজার আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম নামাজে জানাজার আগে খালেদা জিয়াকে নিয়ে সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনের মৃত্যুর দায় থেকে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা কখনো মুক্তি পাবেন না।’
অন্যদিকে গত মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘ওনাকে (খালেদা জিয়া) জেলখানায় বিভিন্ন সময় যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল, ওনাকে আমরা হয়তো এত তাড়াতাড়ি হারাতাম না। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, খালেদা জিয়ার এই মৃত্যুর পেছনে ফ্যাসিস্ট যে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা এবং ওনার যে সরকার ছিল, অবশ্যই তার দায় রয়েছে।’
খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করে বলেন, ‘কারাগারে থাকাবস্থায় গুরুতর অসুস্থ খালেদা জিয়াকে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। আমরা কয়েক দফায় সরকারকে চিঠি দিয়েছি উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সরকারের দিক থেকে সাড়া মেলেনি।’
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদরোগ ও চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন খালেদা জিয়া। গত পাঁচ বছরে একাধিকবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। এই সময়ে মোট ৪৮৪ দিন হাসপাতালের শয্যায় কাটিয়েছেন তিনি।’
এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের একাধিক নেতা অভিযোগ করে বলেছেন, দুই বছরের বেশি সময়ে তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাকে চিকিৎসা গ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। উপরন্তু খালেদা জিয়াকে কারাগারে থাকাবস্থায় স্লো পয়জনিং করা হয়েছিল।
২০০ বছরের পুরনো নাজিমুদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগার ভবন ২০১৬ সালের জুলাইয়ে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। বন্দিদের নেওয়া হয় কেরানীগঞ্জের নতুন ভবনে। তবে খালেদা জিয়াকে পরিত্যক্ত ভবনেই রাখা হয় ২৫ মাস। বিএনপি নেতারা তখন থেকেই বলে আসছিলেন, পরিত্যক্ত ভবনের স্যাঁতসে্যঁতে পরিবেশে খালেদা জিয়া শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন, যা তার ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত করে। গত মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তার চিকিৎসক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ‘ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে তার শ্বাস নিতে তীব্র কষ্ট হচ্ছিল। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ওষুধে সাড়া মিলছিল না।’
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজার আগে নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারপারসনের মৃত্যুর দায় থেকে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা কখনো মুক্তি পাবেন না।’ তিনি বলেছেন, ‘খালেদা জিয়া দেশ-বিদেশের কোনো অপশক্তির সামনে কখনো মাথা নত করেননি। যারা তাকে (খালেদা জিয়া) জেলে পাঠিয়েছে, যারা তাকে গৃহহীন করেছে, তারা রান্না করা খাবার খেতে পারেনি, পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।’
নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী হাসিনার ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার হয়ে মিথ্যা মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দুই বছরের বেশি সময় অন্ধকার কারাগারে আবদ্ধ থাকার সময় উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে দেশনেত্রী দারুণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পুরো দেশবাসী সাক্ষী, পায়ে হেঁটে তিনি কারাগারে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু নির্জন কারাগার থেকে তিনি বের হলেন চরম অসুস্থতা নিয়ে। দেশ-বিদেশের চিকিৎসকদের মতে, পরবর্তী সময়ে গৃহবন্দি অবস্থায় চার বছর তাকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ না দেওয়ার কারণেই তার অসুস্থতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো এই অপরাজেয় নেত্রীর। তাই এই মৃত্যুর দায় থেকে ফ্যাসিবাদ হাসিনা কখনো মুক্তি পাবে না।’
জেলখানায় নির্যাতনের অভিযোগ আইন উপদেষ্টার : বিএনপি চেয়ারপারসনের মৃত্যুর পর গত মঙ্গলবার দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে একটা প্রহসনমূলক রায়ে জেলখানায় পাঠিয়ে অকথ্য নির্যাতন করা হয়। জেলখানায় বিভিন্ন সময় যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল, ওনাকে আমরা হয়তো এত তাড়াতাড়ি হারাতাম না। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, খালেদা জিয়ার এই মৃত্যুর পেছনে ফ্যাসিস্ট যে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা এবং ওনার যে সরকার ছিল, অবশ্যই তার দায় রয়েছে।
সেøা পয়জনিং-এর অভিযোগ বিএনপি নেতাদের : জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবিতে যুবদলের উদ্যোগে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বয়স ৭৫ বছরের বেশি। তাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দিতে ওয়ান-ইলেভেনের সময় যে চক্রান্ত শুরু হয়েছিল, সেই চক্রান্তের অংশ হিসেবে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারে দুই বছরের বেশি সময় আটকে রাখা হয়েছিল। স্যাঁতসেঁতে কারাগারের কক্ষে ইঁদুর ঘোরাঘুরি করত। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, সেখানে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। এখন অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, সেই সময়ে খালেদা জিয়াকে কোনো সেøা পয়জনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল কি না, আমরা পরিষ্কার করে জানতে চাই। তাদের পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়। ডাক্তাররা বলছেন আমাদের সব বিদ্যা, জ্ঞান শেষ; আমরা এখানে আর কিছু করতে পারব না।’ দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বিভিন্ন সময়ে একই অভিযোগ করেছেন।
সর্বশেষ গত ২৩ নভেম্বর তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ২৭ নভেম্বর নেওয়া হয় সিসিইউতে, পরে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া মারা যান।
