চার ম্যাচ জিতলে ফিফা বিশ্বকাপে বাংলাদেশ

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:০১ এএম

বাংলাদেশে ফুটবল নিয়ে যে কোনো মিডিয়া সাক্ষাৎকারে একটি উত্তর প্রায় অপরিবর্তিত খেলোয়াড়ের স্বপ্ন জাতীয় দলে খেলা ও ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া, আর বাফুফের কোনো নির্বাচিত কর্মকর্তার স্বপ্ন বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে নেওয়া। বছরের পর বছর এই কথাগুলো ক্যামেরার সামনে উচ্চারিত হলেও বাস্তবতার নিরিখে খুব কম মানুষই তা গুরুত্ব দিয়ে শুনেছেন। কারণ সবারই জানা, বাংলাদেশের ফুটবলে সেই মাত্রার বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা কখনোই ছিল না, যা বিশ্বকাপের মঞ্চে পৌঁছানোর পথ তৈরি করে। তাই স্বপ্ন ছিল, কিন্তু বিশ্বাস ছিল না।
তবে সেই চিরচেনা বাস্তবতার মধ্যেই এবার এক ব্যতিক্রমী অধ্যায় লিখতে চলেছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ এখন ফিফা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সম্ভাবনার একেবারে কাছাকাছি অবস্থানে। আরও স্পষ্ট করে বললে, ৫৪ বছরের বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে কখনোই বিশ্বকাপ এত কাছে আসেনি।

ফিফা নারী বিশ্বকাপ ব্রাজিল ২০২৭ এর জন্য স্লট ও বাছাইপর্বের অনুমোদনের পর এশিয়ান ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এএফসি (অঋঈ) পেয়েছে ছয়টি সরাসরি ও দুটি ইনডাইরেক্ট স্লট। মোট ৪৭টি সদস্য দেশের মধ্যে এই ছয়টি সরাসরি স্লটের লড়াইয়ে এখন টিকে আছে মাত্র ১২টি দল যাদের একটি বাংলাদেশ।

২০২৫ সালের এএফসি নারী এশিয়ান কাপ বাছাইপর্ব দিয়ে শুরু হয় বাংলাদেশের যাত্রা। পট-৩ থেকে প্রতিযোগিতায় নামা বাংলাদেশ (ফিফা র‍্যাংকিং ১২৮) গ্রুপে পায় শক্তিশালী মিয়ানমার (৫৫), বাহরাইন (৯২) ও তুর্কমেনিস্তানকে (১৪১)। স্বাগতিক মিয়ানমারের প্রতিকূল পরিবেশে খেলেও বাংলাদেশ অবিশ্বাস্য নৈপুণ্যে সব ম্যাচ জিতে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় ৯ পয়েন্টের সঙ্গে গোল ব্যবধান ১৫। এই সাফল্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সরাসরি জায়গা করে নেয় ২০২৬ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য এএফসি নারী এশিয়ান কাপের মূলপর্বে। স্বাধীনতার পর পুরুষ ও নারী ফুটবল মিলিয়ে গত ৫৪ বছরে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সাফল্য।

এখন এএফসি নারী এশিয়ান কাপের গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের সামনে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ। বর্তমান ফিফা র‍্যাংকিং ১১২ নিয়ে বাংলাদেশ পড়েছে এমন এক গ্রুপে, যেখানে প্রতিপক্ষ উত্তর কোরিয়া (৯), চীন (১৭) ও উজবেকিস্তান (৪৯)। তিনটি গ্রুপে চারটি করে দল নিয়ে অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ও রানারআপ সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে উঠবে। এছাড়া তিন গ্রুপের সেরা দুটি তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলও শেষ আটে জায়গা পাবে। কোয়ার্টার ফাইনালই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই পর্যায়ে জয়ী চার দল সরাসরি ফিফা নারী বিশ্বকাপ ব্রাজিল ২০২৭-এর টিকিট নিশ্চিত করবে। পরাজিত চার দল খেলবে প্লে-ইন ম্যাচ, যেখানে আরও দুটি দল বিশ্বকাপের টিকিট পাবে। বাকি দুটি দল যাবে আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে।

গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিপক্ষ উত্তর কোরিয়া ও চীন যারা এশীয় ফুটবলের পরাশক্তি হিসেবে পরিচিত। উত্তর কোরিয়া এই প্রতিযোগিতায় তিনবার শিরোপা জিতেছে, আর চীন সর্বোচ্চ ৯ বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ড গড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এই দুই দলের বিপক্ষে জয় পাওয়া বাংলাদেশের জন্য কঠিন সমীকরণ।

তবে আশার জায়গা রয়েছে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে। শক্তির বিচারে এই ম্যাচে বাংলাদেশের বাস্তবসম্মত জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন বা রানার্সআপ হতে না পারলেও, সেরা দুই তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলের একটি হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার সুযোগ রয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনাল নকআউট পর্ব হওয়ায় সেখানে হিসাব-নিকাশের সুযোগ নেই একটি ম্যাচেই ভাগ্য নির্ধারিত হবে। সেই ম্যাচে জয় পেলে বাংলাদেশের সামনে খুলে যেতে পারে ইতিহাস গড়ার দরজা, সরাসরি ফিফা বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে। কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে গেলেও বাংলাদেশের সামনে সুযোগ শেষ হয়ে যাবে না। সে ক্ষেত্রে আরেকটি কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বাদ পড়া দলের সঙ্গে প্লে-ইন ম্যাচ খেলতে হবে। সেই ম্যাচে জয় পেলে বাংলাদেশ ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে।
অর্থাৎ, বাংলাদেশ এখন বিশ্বকাপ থেকে মাত্র চার ম্যাচ দূরে।

শারীরিক সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও র‍্যাংকিং সব দিক থেকেই বাংলাদেশের প্রতিপক্ষরা নিঃসন্দেহে এগিয়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ নারী দল বারবার প্রমাণ করেছে, তারা কাগজে-কলমের হিসাব মানতে বাধ্য নয়। প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পারফরম্যান্স করাই যেন এই দলের নতুন পরিচয়।

হয়তো একদিন ফিফা বা এএফসি কেস স্টাডি করবে কীভাবে এত কম বিনিয়োগ ও সীমিত অবকাঠামোর মধ্যেও বাংলাদেশ এশিয়ার সেরা মঞ্চে পৌঁছে গেল। বছরের পর বছর হতাশা আর অভিযোগের পর আজ বাস্তবতা বলছে, বাংলাদেশ নারী ফুটবল আর শুধু স্বপ্ন দেখছে না স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখার সুযোগও তৈরি করেছে। ফুটবলের ৯০ মিনিট চরম অনিশ্চয়তার খেলা। তাই এখনই বাংলাদেশকে হিসাবের বাইরে ফেলে দেওয়া যায় না। কারণ আশা কেবল কল্পনা নয় আশাই বিশ্বাস তৈরি করে, আর বিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় ইতিহাস।
লেখক : ফুটবল প্রশাসক ও বিশ্লেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত