চট্টগ্রামে নগর ও জেলার পাঁচ থানার অন্তত ছয় লাখ মানুষ বিদেশে পলাতক শীর্ষ ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ বাহিনীর অব্যাহত খুন, চাঁদাবাজির কারণে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তার বাহিনীর দেশে সক্রিয় ২০/২৫জন সদস্যের অপরাধ কর্মকা-ের লাগাম টানতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। দুর্ধর্ষ এই সন্ত্রাসীর বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ বলেন, ‘বিদেশে বসে কলকাঠি নাড়ছেন বড় সাজ্জাদ। তার বাহিনীর সদস্যরা নগরে অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। এই সাজ্জাদকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা রয়েছে।’ তাকে (সাজ্জাদ) ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে বলে গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন নগর পুলিশের মুখপাত্র সহকারী কমিশনার আমিনুর রশিদ।
পুলিশ জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জোড়া খুনসহ অন্তত এক ডজন হত্যাকা-ে বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। তারা কখনো আধিপত্য বজায় রাখতে নিজেদের প্রতিপক্ষকে খুন করছেন, আবার কখনো ভাড়াটে খুনি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছেন। চাঁদা না পেলেই গুলি ছোড়েন তার (বড় সাজ্জাদ) অনুসারীরা। নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী ও পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ পাঁচ থানার মানুষ সাজ্জাদ বাহিনীর কারণে আতঙ্কে থাকতে হয়। সবশেষ গত শুক্রবার সকালে চাঁদা না পেয়ে চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরা এলাকায় শীর্ষ ব্যবসায়ী ও স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসভবন লক্ষ্য করে ২০/২২টি গুলি ছোড়েছে সাজ্জাদ বাহিনীর ৮ মুখোশপরা সদস্য। গোলাগুলির সময় ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যরা বাসায় ছিলেন। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
পুলিশ এ ঘটনার তদন্ত করছে বলে জানিয়ে নগর পুলিশের মুখপাত্র সহকারী কমিশনার আমিনুর রশিদ বলেন, ‘এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী সংশ্লিষ্ট থানায় এখনো মামলা, অভিযোগ বা জিডি কেনোটাই দেননি। তিনি মামলা করলে তা রেকর্ড করার নির্দেশনা দেওয়া আছে।’ ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমানের পারিবারিক সূত্র জানায়, গত নভেম্বরের শেষ দিকে দুবাইয়ের বিভিন্ন নম্বর থেকে ‘সাজ্জাদ’ পরিচয় দিয়ে মুজিবের কাছে ফোন করে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। ডিসেম্বরের শুরুতে অপর একটি বিদেশি নম্বর থেকে এসএমএস দেওয়া হয় মুজিবকে। ওই এসএমএসে ‘বড় সাজ্জাদ’ হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আপনাকে বারবার বলার পরও টাকা দিচ্ছেন না। আপনি কী মরতে চান?’
গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর নগরের পাঁচলাইশ হামজারবাগ এলাকায় মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়কের পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনে হামলা করে সন্ত্রাসীরা। এর আগে ভবনমালিকের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। এ ঘটনায়ও বড় সাজ্জাদের সহযোগীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে আসে। এর আগে একই বছরের ১ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে চান্দগাঁও মোহরা এলাকায় মোহাম্মদ ইউনুস নামে এক ব্যবসায়ীর বাসায় গুলিবর্ষণ করে সাজ্জাদের অনুসারীরা। পুলিশ জানায়, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে থাকা ২০/২৫ জন সন্ত্রাসী চট্টগ্রামে সক্রিয়। এক সময় এই বাহিনীর মূল নেতৃত্বে ছিল ১৭ মামলার আসামি সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি গত বছর ১৫ মার্চ কারাগারে যাওয়ার পর তার হয়ে বর্তমানে বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৮খুনসহ ১৫ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান। বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের মধ্যে রায়হানসহ আলোচিত পাঁচজন। তারা হলেন, মোবারক হোসেন ইমন, খোরশেদ, বোরহান ও হাসান। এর মধ্যে গতবছরের ৩০ মার্চ নগরের চন্দনপুরা এলাকায় সংঘটিত জোড়া খুনের মামলায় ‘সন্ত্রাসী’ হাসান এখন কারাবন্দি। তবে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানসহ বাকি চারজন অধরা। দেশে বড় সাজ্জাদের দলের নেতৃত্বে থাকা ছোট সাজ্জাদ কারাগারে থাকলেও বেশির ভাগ সদস্য এখনো ধরা পড়েননি। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর বেপরোয়া হয়ে ওঠেন তার প্রধান দুই সহযোগী মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ইমন।
পুলিশ বলছে, চট্টগ্রামের আলোচ্য পাঁচ থানায় নির্মাণাধীন ভবনের মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি, চাঁদা না পেয়ে গুলি, প্রকাশ্যে হত্যাকা-সহ নানা ঘটনায় বিদায়ী বছর জুড়েই আলোচনায় ছিলেন ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ। এদিকে বিদেশে বসে খুনের নির্দেশ, চাঁদাবাজির বিষয়ে ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ আলী গত শুক্রবার মোবাইল ফোনে একটি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘বিদেশে ব্যবসা, দেশে ভাড়া ঘর থেকে অনেক টাকা পাই। আমাদের পরিবার বিত্তশালী। আমি কেন বাহিনী তৈরি করে চাঁদাবাজি, খুন করব। উল্টো আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল সন্ত্রাসীরা।’ ছোট সাজ্জাদ, রায়হানের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও দাবি করেন সাজ্জাদ আলী। তিনি আরও বলেন, ‘সাজ্জাদ, রায়হানের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। তবে সরোয়ার সন্ত্রাসী, সেটি জানি। পুলিশ বের করুক তাকে কারা মেরেছে।’
