বাসাবাড়িতে তীব্র গ্যাস সংকট

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:০১ এএম

ঢাকার মিরপুর-১ নম্বর এলাকার বাসিন্দা চামেলী হক। তার বাসায় আগে মোটামুটি গ্যাস থাকলেও গত দুই মাস ধরে সংকট এতটাই বেড়েছে যে, রান্না করতে গিয়ে রীতিমতো তাকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। তার ভাষায়, ‘ভোরে ঘুম থেকেই উঠেই রান্না শুরু করি। দুই চুলার একটাতে কোনোমতে গ্যাস পাওয়া যায়। কিন্তু চাপ এতটাই কম যে, রান্না করতেই দুপুর গড়ায়। সারা দিন এখন রান্নাঘরেই কাটে। অন্যান্য কাজ ঠিকমতো করা যায় না।’ খানিকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘গ্যাস না পেলেও প্রতি মাসে ঠিকই নির্ধারিত বিল দিতে হচ্ছে। এ অত্যাচার শেষ হবে কবে?’

চামেলী হকের মতো এমন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা গ্যাস সংকট নিয়ে চরম দুর্ভোগে পোহাচ্ছেন। বাসাবাড়ির পাশাপাশি সার-কারখানা এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে। তবে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ অগ্রাধিকার পাওয়ায় গত বছরের তুলনায় এবারের শীতে কল-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে বিকল্প হিসেবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) যারা ব্যবহার করতেন, তাদের সংকটও বেড়েছে। কারণ, বাজারে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার। এতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন বিপাকে পড়েছেন তারা। অনেকেই আবার বিকল্প হিসেবে তিতাসের গ্যাস ও এলপিজির পাশাপাশি বৈদ্যুতিক চুলাও ব্যবহার করছেন। এসব গ্রাহককে প্রতি মাসে অনেক বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে রান্নার জন্য। কেউবা আবার জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে রেস্টুরেন্ট থেকেও বেশি দামে অস্বাস্থ্যকর খাবার কিনছেন।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্যাসের সরবরাহ আগের মতোই আছে। কিন্তু শীতে এমনতিই গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। শীতের পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এই একটি কারণে এত সংকট হওয়ার কথা নয়। মূল কারণ হলো চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কমতে থাকা এবং অনুসন্ধানে অবহেলা। পাশাপাশি শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে গিয়ে বাসাবাড়ি ও অন্যান্য খাতে গ্যাস সংকট বেড়েছে।

কেন এ সংকট : সরকারি হিসাবে দেশে গ্যাসের যে সংযোগ রয়েছে, তাতে প্রতিদিন ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দরকার। কিন্তু বাস্তবে অন্তত ৫০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে ৯০ থেকে ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা মিটছে চড়ামূল্যে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) দিয়ে।

দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস অনুসন্ধান ও সংস্কারে অবহেলার কারণে পুরনো কূপ থেকে প্রতি বছর গড়ে ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন কমছে। আবার নতুন গ্যাসেরও সন্ধান মিলছে না। অন্যদিকে সরকার চাইলেই এলএনজি আমদানি বাড়াতে পারছে না। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিদিন গড়ে ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি এলএনজি আমদানির সুযোগ নেই। তাছাড়া এর দামও অনেক বেশি। ফলে গ্যাস সংকট দিনে দিনে বাড়ছে।

তবে শীত আসায় সেই সংকট আরও বেড়েছে। কারণ, তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় শীতকালে পাইপলাইনে গ্যাসের সঙ্গে কনডেনসেটের (গ্যাসের একটি উপজাত) মতো তরল পদার্থ চলে আসে। এতে পাইপলাইনের ভেতরে প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে গ্যাসের চাপ কমে আসে। এ কারণে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা ব্যাহত হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীতে বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত কিছু গ্যাস অন্য খাতে সরবরাহ করে কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করা হলেও আসন্ন গ্রীষ্মে সেই সংকট আরও বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে চাহিদামতো গ্যাসের জোগান নিশ্চিত করা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রমতে, আপাতত গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর কোনো উপায় তাদের হাতে নেই। বঙ্গোপসাগরে গ্যাস পাওয়ার বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও সেখানে এখনো কোনো অনুসন্ধান কার্যক্রমই শুরু হয়নি। আবার দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন কূপ খনন ও সংস্কারের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তাতে নতুন গ্যাস পেতে অন্তত এক থেকে দেড় বড় সময় লাগবে। নতুন করে এলএনজি আমদানির যে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সেটিও সময়সাপেক্ষ এবং এজন্য বিপুল অর্থেরও প্রয়োজন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই দেশে গ্যাস সংকট চলছে। তবে শীতে বাসাবাড়িতে পানি গরম করাসহ নানান কাজে গ্যাসের চাহিদা কিছুটা বাড়ে। সেজন্যই সংকট আরও বেড়েছে। শীতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে, সেটি পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ, এখনো তাপমাত্রা অত বেশি কমেনি।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলার কারণে দিনে দিনে পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অনুসন্ধানে গতি নেই। এটা খুবই দুঃখজনক। গ্যাস সংকটের পুরনো এ সমস্যা রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য অনুসন্ধান কার্যক্রমে ব্যাপক জোর দিতে হবে।

ভয়াবহ গ্যাস সংকটের চিত্র তুলে ধরে রাজধানীর দনিয়া এলাকার বাসিন্দা দিলরুবা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমনিতেই সারা বছর গ্যাস থাকে খুবই কম। শীত এলে থাকে না বললেই চলে। এখন এমনও দিন আছে কোনো গ্যাসই থাকে না। গভীর রাতে কিছুটা গ্যাস পাওয়া যায় কিন্তু তখন ঘুমাব, না রান্না করব?’ তিনি বলেন, ‘শীতে গরম খাওয়া তো দূরের কথা, ঠিকমতো রান্না করার মুশকিল হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলার পাশাপাশি ওভেনও ব্যবহার করতে হয়। গ্যাস না পেয়েও প্রতি মাসে গ্যাসের বিল দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুতেরও বাড়তি বিল দিতে হচ্ছে। এ ভোগান্তি যে কবে শেষ হবে।’

রাজধানীর ধানমন্ডি, কলাবাগান, বনশ্রী, ভাসানটেক, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাসাবো ও আজিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি ঢাকার আশপাশ এলাকায় চলছে গ্যাসের এ সংকট। বাধ্য হয়ে অনেকে বিকল্প উপায় হিসেবে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করছেন। এতে পাইপলাইনের মাসিক বিলের পাশি চড়ামূল্যে সিলিন্ডার গ্যাসও কিনতে হচ্ছে। যাদের বাড়তি ব্যয় করার সামর্থ্য নেই তারা পড়েছেন চরম বিপাকে।

সার-কারখানা ও সিএনজি স্টেশনে সংকট : নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের আশ্বাসে সার-কারখানায় গ্যাসে দাম প্রতি ঘনমিটারে ১৬ থেকে বাড়িয়ে ২৯ টাকা ২৫ পয়সা করা হলেও বাস্তবে তা মিলছে না। তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে সার শিল্প নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে আসন্ন বোরো মৌসুমে সারের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

দেশের ইউরিয়া কারখানাগুলোর তত্ত্বাবধানে রয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, আসন্ন বোরো মৌসুমের আগে পাঁচটি সার-কারখানার মধ্যে অন্তত চারটি কারখানা চালু রাখতে প্রতিদিন কমপক্ষে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দরকার। পূর্ণ সক্ষমতায় কারখানা চালানোর মতো পর্যাপ্ত গ্যাস তারা পাচ্ছে না।

চাহিদামতো গ্যাস না পেলে ইউরিয়া উৎপাদন ব্যাহত হবে বলে সতর্ক করেছে বিসিআইসি। সে ক্ষেত্রে সরকারকে আমদানি বাড়াতে হবে, ফলে কৃষি খাতে ভর্তুকির চাপ আরও বাড়বে। বোরো মৌসুমে দেশে ইউরিয়ার চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ টন। কিন্তু বর্তমান গ্যাস বরাদ্দ অনুযায়ী বছরে উৎপাদন সম্ভব হবে মাত্র ৯.২৪-১১ লাখ টন, যা লক্ষ্যমাত্রার অনেক কম।

তবে জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিসিআইসির চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। কারণ দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে। আবার বছরে ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানি করার সক্ষমতা রয়েছে, যেখানে ইতিমধ্যে ১০৯ কার্গো আমদানি করা হয়েছে। ফলে চাহিদা থাকলেও আমদানি বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

বিসিআইসির কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছর ইউরিয়ার জাতীয় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১৮ লাখ টন হলেও বর্তমান গ্যাস বরাদ্দে ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজারসহ মাত্র দুটি কারখানা চালু রাখা সম্ভব হবে, যাতে বছর জুড়ে প্রায় ১১ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদন করা যাবে।

তারা আরও জানান, বছরের অর্ধেকের বেশি সময় কারখানা বন্ধ থাকায় মূল্যবান যন্ত্রপাতির অবক্ষয় ঘটেছে। পাঁচটি কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা একসময় ছিল ৩১ লাখ টন, গ্যাস সংকটে বেশি সময় কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় তা কমে দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ টনে। প্রকৃত উৎপাদন নেমে এসেছে বছরে ৮-১১ লাখ টনে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বোরো মৌসুমে মোট ইউরিয়ার চাহিদা ১৪.৫-১৫ লাখ টন। এর মধ্যে ডিসেম্বরে ৩.১৮, জানুয়ারিতে ৪.২৩, ফেব্রুয়ারিতে ৪.৪৩ এবং মার্চে ২.৪৭ লাখ টন সার প্রয়োজন হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারের উৎপাদন ব্যাহত হলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে। চাহিদা মেটাতে আমদানি করতে গেলে ব্যয় বাড়বে। কৃষক সময়মতো সার ও বিদ্যুৎ না পেলে খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়বে।

গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজিচালিত যানবাহনের মালিক ও চালকরাও চরম বিপাকে পড়েছেন। গ্যাসের জন্য দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়াতে হয়। দীর্ঘসময় অপেক্ষার পরও বেশিরভাগ সময় নির্ধারিত চাপে গ্যাস পাওয়া যায় না।

সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্যাস সংকট আগের মতোই রয়েছে। কোনো উন্নতি হয়নি।

কিছুটা স্বস্তি শিল্পে : বাসাবাড়ির চেয়ে তুলনামূলক বেশি স্বস্তিতে এবার শীতকাল পার করছেন গ্যাসের শিল্প সংযোগের গ্রাহকরা। গ্যাস নিয়ে শিল্প মালিকদের কাছ থেকে এবার তেমন কোনো অভিযোগ না পাওয়ার কথা বলছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই শিল্প কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আবার ব্যয় বাড়ছে। তবে এবার শিল্পে সরকার গুরুত্ব দেওয়ায় আগের চেয়ে সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়। তবে একজন শিল্প মালিক জানান, সাম্প্রতিককালে নানা কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাসের চাহিদা কমে গেছে। কিন্তু বন্ধ কারখানা চালু হলে এবং গ্রীষ্মে আবার গ্যাসের সংকট বাড়তে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত