২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সরকার পতন আন্দোলনের চূড়ান্ত ও পরবর্তীপর্যায়ে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটকে ‘গণঅভ্যুত্থান’সংশ্লিষ্ট ঘটনা আখ্যায়িত করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে সাধারণ বীমা করপোরেশন। ফলে শিল্প কারখানার ক্ষতিকে ‘গণঅভ্যুত্থানে’র ক্ষতি বিবেচনা না করে প্রতিটি বীমাদাবির বিপরীতে বীমা আইন ও বিধি মোতাবেক সার্ভেয়ার নিয়োগের মাধ্যমে দাবি পরিশোধের জন্য সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। গত ৪ জানুয়ারি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এ সংক্রান্ত সভার সিদ্ধান্তের নোটিস জারি করেছে।
আইডিআরএরের এ সিদ্ধান্তে বিটিএমএ, বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ’র সদস্যগণ এবং দেশের অন্য সব ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান ‘জুলাই-আগস্ট’ গণঅভ্যুত্থানের সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানের বীমাদাবি দ্রুত নিষ্পত্তি ও ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন, খাতসংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ১৭ ডিসেম্বর আইডিআরএ’র চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে অংশীজনদের সঙ্গে একই বছরের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত ‘পপুলার রাইজিং বা গণঅভ্যুত্থান’ সংক্রান্ত বীমা বা পুনঃবীমা দাবি নাকচ করার সিদ্ধান্ত বিষয়ে সভা হয়।
সভার সিদ্ধান্তের মধ্যে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেবে এবং সব নন-লাইফ বীমা প্রতিষ্ঠান সব বীমাদাবি ‘পপুলার রাইজিং’ হিসেবে বিবেচনা না করে প্রতিটি বীমাদাবির বিপরীতে বীমা আইন ও বিধি মোতাবেক সার্ভেয়ার নিয়োগ দেবে এবং সার্ভে রিপোর্টের ভিত্তিতে পরের কার্যক্রম গ্রহণ করবে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালে সরকার পতন আন্দোলনের চূড়ান্ত ও পরবর্তীপর্যায়ে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্যিক অঞ্চলে বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। খাতসংশ্লিষ্টরা এসব ঘটনায় কিছু দুষ্কৃতকারী ও উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিকদের দায়ী করে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং উদ্যোক্তাগণ বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এই রকম অপ্রত্যাশিত ক্ষতি মোকাবিলার জন্য প্রায় প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানই যথাযথ প্রিমিয়াম পরিশোধের মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে অগ্নি এবং সংশ্লিষ্ট ঝুঁকির বিপরীতে বীমা পলিসি গ্রহণ করেছিল। বীমা কোম্পানিগুলো নানা ধরনের পদ্ধতিগত জটিলতা উপস্থাপন করে দাবি পরিশোধে বিলম্ব করে। এর পেছনে সরকারের সাধারণ বীমা করপোরেশনের সিদ্ধান্তকে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিল শিল্প উদ্যোক্তারা।
সাধারণ বীমা করপোরেশনের এমন সিদ্ধান্তকে ত্রুটিপূর্ণ এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করছে বিটিএমএ। তারা সাধারণ বীমার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছিল। পাশাপাশি বীমা আইন ২০১০ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছেন।
একইভাবে বীমা কোম্পানি আইনে ‘দাঙ্গা-হাঙ্গামা’সংক্রান্ত ধারাকে বীমা দাবি প্রত্যাখ্যানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার থেকে বিরত রাখতে আইডিআরএকে এই ধারার একটি যৌক্তিক এবং স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রদানের দাবি জানিয়েছিল বিটিএমএ। দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা শেষে শিল্প মালিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ বীমা করপোরেশনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এসেছে।
বিটিএমএ জানিয়েছে, সরকার পতন আন্দোলনের চূড়ান্ত ও পরবর্তীপর্যায়ে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্যিক অঞ্চলে কিছু দুষ্কৃতকারী ও উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিক মিলে বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ চালায়, যাতে দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো একটি বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়। অথচ ওই সব শিল্পকারখানা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহ আন্দোলনকারী জনতার আক্রোশের শিকার বা আন্দোনের লক্ষ্যবস্তু ছিল না বা হতে পারে না। সংগঠনটি মনে করে, এটা একেবারেই স্পষ্ট যে, কিছু দুষ্কৃতকারী অস্থির রাজনৈতিক অবস্থার সুযোগে ওই সব শিল্পকারখানা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহে লুটতরাজের হীন উদ্দেশ্যে নাশকতামূলক কর্মকান্ড চালায়।
জানা গেছে, চলতি বছর ৩ মার্চ রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমাকারী প্রতিষ্ঠান, সাধারণ বীমা করপোরেশনে দেশের সব বীমাকারী প্রতিষ্ঠানের মুখ্য নির্বাহী বা প্রতিনিধি ও জরিপকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকারখানা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উত্থাপিত বীমা দাবি বিষয়ে একটি সভা করে। সভায় শিল্পকারখানার উত্থাপিত বীমা দাবির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। তবে সভায় সাধারণ বীমা করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিদেশি পুনঃবীমাকারীদের বিষয়ে উল্লেখ করে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহের উত্থাপিত বীমা দাবিকে পপুলার রাইজিং বা গণঅভ্যুত্থান এবং সিভিল কমিশন বা নাগরিক বিশৃঙ্খলা এবং সন্ত্রাসজনিত ক্ষতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, উক্ত ক্ষতিকে অগ্নিবীমা এবং শিল্পকারখানার সব ঝুঁকি পলিসিকে অবারিত তথা আওতাভুক্ত নয় বলে অভিমত প্রদান করে।
