বিশ্বকাপ মানেই অনিশ্চয়তা, অপ্রত্যাশিত গল্প আর ইতিহাস বদলে দেওয়ার মঞ্চ। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ ব্রাজিলের জন্য এক ভিন্ন বাস্তবতা নিয়ে হাজির হতে যাচ্ছে। অনেকের মতে, এটি হবে তাদের ইতিহাসের বাঁক বদলের আসর। ‘ডন’ কার্লো আনচেলত্তির অধিনে সেলেসাওরা হয় বহু প্রতীক্ষিত হেক্সা মিশন সফল করবে, নয়তো গড়বে নিজেদের ইতিহাসের দীর্ঘতম বিশ্বকাপ শিরোপা না জেতার রেকর্ড।
২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া–জাপান বিশ্বকাপে শেষবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ব্রাজিল। এরপর কেটে গেছে ২৪ বছর। ঠিক একই ব্যবধান ছিল ১৯৭০ সালের শিরোপা আর ১৯৯৪ সালের শিরোপ জয়ের মধ্যে। কিন্তু সংখ্যার মিল থাকলেও দুই সময়ের বাস্তবতার পার্থক্য আকাশ–পাতাল। পেলে, জাইরজিনহো, গেরসন, রিভেলিনো, তোস্তাওদের হাত ধরে ১৯৭০ সালে ব্রাজিল কেবল একটি বিশ্বকাপ জেতেনি, তারা ফুটবলের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিল। জোগো বোনিতো, হলুদ জার্সি, নান্দনিক পাসিং ও ড্রিবলিং—সব মিলিয়ে ব্রাজিল হয়ে উঠেছিল ফুটবলের সমার্থক।
এরপর ১৯৭৪ থেকে ১৯৯০—এই সময়েও শিরোপা না এলেও ব্রাজিল হারায়নি তার আত্মপরিচয়। ১৯৮২ সালের ব্রাজিল দলটি আজও ইতিহাসের অন্যতম সেরা ‘শিরোপাহীন’ দল হিসেবে স্মরণীয়। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার কাছে পরাজয় ছিল বেদনাদায়ক, কিন্তু লজ্জার নয়। আর ১৯৯৪ সালে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে যুক্তরাষ্ট্রের রোজ বোলে রবার্তো বাজ্জোর সেই ঐতিহাসিক পেনাল্টি মিসের মাধ্যমে।
২০০২ বিশ্বকাপের পরের সময়টা ব্রাজিলের জন্য শুধু ট্রফিহীন নয়, আত্মপরিচয় হারানোর গল্পও। ইউরোপমুখী স্রোতের ফলে ব্রাজিলের ঘরোয়া ফুটবল ও জাতীয় দলের মাঝে দূরত্ব বেড়ে যায়। যদিও ব্রাজিলিয়ান লিগের মান বেড়েছে, কিন্তু জাতীয় দলের ‘আত্মা’ যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপের দলটি কাগজে-কলমে ছিল স্বপ্নের মতো। রোনালদিনহো, রোনালদো, কাকা, আদ্রিয়ানো, কাফু, রবের্তো কার্লোসের মতো বিশ্বখ্যাত সব তারকায় সাজানো ছিল ব্রাজিল দলটি।
কিন্তু মাঠের খেলা সেই ব্রাজিলই পরিণত হয় আনন্দহীন, দিশাহীন এক দলে! ওয়েগিসে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের ‘পার্টি সংস্কৃতি’ হয়ে ওঠে তাদের পতনের প্রতীক। কোয়ার্টার ফাইনালে জিদানের ফ্রান্সের কাছে পরাজয় শুধু ফলাফলের ব্যর্থতা নয়, ছিল ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের মানসিক ধসের সূচনা। ২০০৬-এর পর ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) বেছে নেয় শৃঙ্খলার পথ। কোচ হন দুঙ্গা। তার অধীনে কোপা আমেরিকা ও কনফেডারেশনস কাপের শিরোপা ঘরে তুললেও ব্রাজিল ফুটবল হারিয়ে ফেলে তাদের ঐতিহ্য, ফুটবল শিল্প।
একসময় রোনালদো বিদায় নেন, রোনালদিনহো এবং আদ্রিয়ানো বাদ পড়েন। এমনকি ২০১০ বিশ্বকাপে ছিলেন না নেইমার ও গ্যানসোর মতো প্রতিভাও। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২০১০ কোয়ার্টার ফাইনালে প্রথমার্ধে দুর্দান্ত খেলেও শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে ব্রাজিল। বোঝা যায়—শুধু শৃঙ্খলা দিয়ে ব্রাজিলের আত্মপরিচয় ফেরানো যাবে না। তারপর থেকে শুধু পিছিয়েই যাচ্ছে ব্রাজিলের ফুটবল। গত বছর তো জিততেই ভুলে গিয়েছিল সেলেসাওরা। কার্লো আনচেলত্তি দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।
এখন প্রশ্ন একটাই—ব্রাজিল কি আবার নিজেদেরে খুঁজে পাবে? নেইমারের পর কে নেবে নেতৃত্ব? বিশ্বখ্যাত ইতালিয়ান কোচ আনচেলত্তির অভিজ্ঞতা কি ফিরিয়ে আনতে পারবে হারানো পরিচয়? ২০২৬ বিশ্বকাপ তাই ব্রাজিলের জন্য শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি ইতিহাস, অহংকার আর আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের লড়াই। ষষ্ঠ শিরোপা না এলে, এই প্রতীক্ষা শুধু দীর্ঘই হবে না; সেটা হয়ে উঠবে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে ভারী বোঝা।
- গোল ডটকম অবলম্বনে
দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে ব্র্যাডম্যানকে ছাড়িয়ে স্টিভেন স্মিথের রেকর্ড
'ভারতে বিশ্বকাপ খেলতেই হবে' এমন আল্টিমেটামের খবরকে অসত্য দাবি বিসিবির