সত্তর বছরের বৃদ্ধ জাবেরুন নেছা রাজমিস্ত্রির জোগালির (মিস্ত্রির সহকারী) কাজ করে সারা জীবনের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করে নিজের নামে এক কাঠা ও ছেলের নামে দুই কাঠা জমি কিনেছিলেন। ১৭ বছর আগে কেনা এই জমি একটি ভূমিদস্যু চক্র দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। শুধু জাবেরুন নেছা নন, ‘ইউনিভার্সাল প্রোপার্টিজ’ নামে সাইনবোর্ড দিয়ে মসজিদের মোয়াজ্জিন আজিজুর রহমান, বাসাবাড়িতে কাজ করা লাইলী বেগম, শ্রমিক রশিদ শেখ, শাহানারা বেগম, আব্দুল আজিজ গাজীসহ ৩২টি দরিদ্র পরিবারকে মাথা গোঁজার সামান্য বসতভিটা ছাড়া করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, খুলনা নগরের উপকণ্ঠে মাথাভাঙ্গা মৌজায় প্রায় ৩ একর জমির মধ্য থেকে ২ কাঠা, ৩ কাঠা ও ৫ কাঠা করে জমি কিনেছেন ৩২ জন। তাদের মধ্যে কেউ ৫০ বছর আগে, কেউ ১৭ বছর আগে জমি কিনে বাড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস করছেন। তাদের নামে মিউটেশন ও খাজনার দাখিলা রয়েছে। তবে সম্প্রতি হঠাৎ একদল ভূমিদস্যুর সেখানে চোখ পড়েছে। ‘ইউনিভার্সাল প্রোপার্টিজ’ নামের একাধিক সাইনবোর্ড দিয়ে আল মামুনসহ একদল ভূমিদস্যু সব জমি কিনে নিয়েছে দাবি করে বাসিন্দাদের চলে যেতে বলছে। প্রতিনিয়ত হুমকি-ধামকি দেওয়াসহ একজনের বাড়ি ভেঙে দিয়েছে। জমিতে সার্বক্ষণিক সন্ত্রাসীদের বসিয়ে রাখা হয়েছে।
ভূমিদস্যুদের এমন কর্মকাণ্ডে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বাসিন্দারা। এ ব্যাপারে তারা লবণচরা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো থানায় গিয়েও সহযোগিতা পাচ্ছেন না।
এছাড়া গত মঙ্গলবার ওই জমির সামনে ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান জমির মালিকরা। তারা জানান, তারা প্রায় সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ। আমাদের অধিকাংশ অন্য জায়গার জমিজমা এবং অন্য সম্পদ বিক্রি করে এখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছেন।
মালিকরা আরও জানান, তাদের কাছে থাকা জমির কাগজপত্র অনুযায়ী ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ১৬৫ খতিয়ানের ২.৯৮ একর জমির মালিক ছিলেন রামচরণ মণ্ডল। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দেশত্যাগের পর তিনি বা তার ওয়ারিশরা ফিরে না আসায় জমি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত হয়। ১৯৭২ সালে নাজির আহম্মেদ মোল্লা নামের এক ব্যক্তি বন্দোবস্ত নেন। তারপর কয়েকবার হাত বদলের পর তারা কিনেছেন। তবে মাঝখানে ১৯৯১ সালে মর্জিনা সিদ্দিকী আদালতে মামলা করে একতরফা আদেশ নিয়ে মালিক হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হয়নি। কারণ সেই আদেশের ওপর হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ এবং স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। এছাড়া আর কোনো ঝামেলা হয়নি। এখন মামুন নামের একজন ভূমিদস্যু দখলের পাঁয়তারা করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আল মামুন খুলনা মহানগরীর গল্লামারী এলাকার বাসিন্দা। তিনি আওয়ামী সরকারের আমলে যুবলীগ পরিচয়ে যুবলীগ নেতা ভূমিদস্যু হাফিজুরের সহযোগী ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর হাফিজুরের অনুপস্থিতিতে মামুন এখন রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে নিজেকে যুবদলের নেতা পরিচয় দিয়ে জমি দখলের কাজে নেমে পড়েছেন।
বাসাবাড়িতে কাজ করে ১০ কাঠা জমি কিনেছিলেন লাইলী বেগম। তিনি বলেন, ‘আমি এখন বিধবা। সন্ত্রাসীরা হুমকি দিয়ে জমি দখল নিতে চায়। জোর করে উঠিয়ে দিলে এই বয়সে কোথায় যাব?’
তবে জমি জোর করে দখলের চেষ্টার বিষয়টি অস্বীকার করে ‘ইউনিভার্সাল প্রোপার্টিজ’-এর প্রোপ্রাইটর মো. আল মামুন বলেন, ‘জমি কেনা মানুষগুলো প্রতারণার শিকার হয়েছে। জমির প্রকৃত মালিক আমি। তাদের যদি আসল দলিল থাকে, তবে তাদের ক্ষতিপূরণসহ জমি ছেড়ে দেব। তারা থানায় অভিযোগ দিয়েছে, এ ব্যাপারে আগামীতে হয়তো তাদের সঙ্গে বসা হবে।’
লবণচরা থানার ওসি মো. তুহিনুজ্জামান বলেন, ‘৩২ জনের পক্ষে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর সেটি আদালতে পাঠিয়েছি। সেখান থেকে নির্দেশনা পেলে তদন্ত করা হবে।’
