বিশ্ব যখন প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য পূরণে আরও তৎপর হয়ে উঠছে, তখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বৈশ্বিক আলোচনায় বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সৌর ও বায়ুর মতো নবায়নযোগ্য শক্তির পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তি আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে ফিরে এসেছে একটি স্থিতিশীল, টেকসই ও কম-কার্বন ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি হিসেবে।
বাংলাদেশেও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির নানান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাবনার রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে। রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় এ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট মিলে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রসাটম। এ বছর প্রথম ইউনিট থেকে এবং পরের বছর দ্বিতীয় ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া সেখানে একই সক্ষমতার আরও একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নেরও পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের। রসাটমের চিফ সাসটেইনেবিলিটি অফিসার পোলিনা লিয়ন দেশ রূপান্তরকে জানান, পারমাণবিক শক্তিকে এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমান গুরুত্বে কম-কার্বন উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বে মোট বিদ্যুতের প্রায় ১০ শতাংশ এবং কম-কার্বন শক্তির এক-চতুর্থাংশ আসে এই খাত থেকে, যা প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ এড়ায়। পারমাণবিক শক্তি ছাড়া নেট-জিরো লক্ষ্য বাস্তবে প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাব বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনে বৈশ্বিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অন্তত দ্বিগুণ করতে হবে। ব্রাজিলে সদ্য সমাপ্ত জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-২৮) আরও এক ধাপ এগিয়ে ২০৫০ সালের মধ্যে এই সক্ষমতা তিনগুণে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সম্প্রদায়। সেজন্য দরকার আন্তর্জাতিক সমন্বিত উদ্যোগ।
পোলিনা লিয়ন জানান, পারমাণবিক শক্তির গুরুত্ব বাড়ছে শুধু পরিবেশগত কারণে নয়, বরং নির্ভরযোগ্যতার জন্যও। কারণ বায়ু বা সৌরশক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করা সম্ভব নয়। কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ রয়েছে।
তার ভাষায়, পারমাণবিক শক্তির গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন বায়ু ও সৌরশক্তির মতোই কম, কিন্তু একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নœ বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে, যা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বড় আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি ৫০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও (এসএমআর বা স্পল মডুলার রিয়্যাক্টর) এখন বৈশ্বিক বাজারে বড় আলোচনার বিষয়। এটি সাশ্রয়ী, দ্রুত নির্মাণযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
লিয়ন বলেন, একটি এসএমআর তৈরি করতে খরচ বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় প্রায় ১০ ভাগের এক ভাগ। আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা লাতিন আমেরিকার মতো অঞ্চলের জন্য এই এসএমআর হতে পারে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের টেকসই পথ।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, কয়েক বছর আগেও যেখানে মাত্র ৩১টি পারমাণবিকচালিত দেশের মধ্যে ৯টি তাদের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান-এনডিসিতে পারমাণবিক শক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল, এখন সে সংখ্যা ২০ ছাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক দেশ এখন পরিষ্কারভাবে পারমাণবিক শক্তিকে জলবায়ু সমাধানের অংশ হিসেবে দেখছে।
রসাটম নিজেও রাশিয়ার হালনাগাদ এনডিসিতে পারমাণবিক প্রকল্প যুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গেল বছরের শেষ দিকে দেশটি সিদ্ধান্ত নেয়, ২০৪২ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তির অংশ ২০ থেকে বাড়িয়ে ২৪ শতাংশ করা হবে।
এ বিষয়ে লিয়ন বলেন, ‘আমরা দেখিয়েছি কীভাবে পারমাণবিক প্রকল্পগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করলে জলবায়ুগত সুবিধা পাওয়া যাবে। রাশিয়ায় কম-কার্বন বিদ্যুতের অর্ধেকের বেশি আসে পারমাণবিক শক্তি থেকে। এর অংশ বাড়লে দেশের জলবায়ু পারফরম্যান্স আরও উন্নত হবে।’
বিশ্বব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পারমাণবিক খাতে বড় অগ্রগতি : গত বছর বিশ্বব্যাংক পারমাণবিক প্রকল্পে অর্থায়নের ওপর ১০ বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এটিকে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধিতে টার্নিং পয়েন্ট বা মোড় ঘোরানো হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক এই দাতা সংস্থাটি ঘোষণা দেয়, তাদের ভবিষ্যৎ কৌশলে পারমাণবিক প্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
লিয়ন বলেন, এটি ছিল এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত, যা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, পারমাণবিক শক্তি ‘পরিচ্ছন্ন জ্বালানি’, যা সবুজ অর্থায়নের দরজা খুলে দিয়েছে। বিশেষ করে এসএমআর প্রকল্পে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে।
রসাটম এখন দ্রুত পারমাণবিক প্রযুক্তির নানামুখী উন্নয়নে কাজ করছে, যা অত্যাধুনিক এবং আগামীর জন্য বড় সহায়ক। এর মধ্যে ফাস্ট নিউট্রন রিয়্যাক্টর, ভাসমান ও অনশোর এসএমআর এবং ক্লোজড ফুয়েল সাইকেল অন্যতম। বেলয়রস্ক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চতুর্থ ইউনিটে বিশ্বের একমাত্র কার্যকরী ফাস্ট নিউট্রন রিয়্যাক্টর চলছে, যেখানে মিশ্র অক্সাইড জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব উদ্ভাবন পারমাণবিক শক্তির কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো এবং পরিবেশগত দক্ষতা বাড়ানোর জন্য তৈরি।
লিয়ন আরও বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি চক্র বন্ধ করতে পারলে ব্যবহৃত জ্বালানি পুনর্ব্যবহার করা যায়, একই সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদও সংরক্ষণ সম্ভব। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি দ্বি-উপাদানের পারমাণবিক ব্যবস্থা তৈরি করা যাতে টেকসই পারমাণবিক শক্তি নিশ্চিত করা যায়।’
বিশ্ব এখন কপ-৩০-এর আলোচনায় ব্যস্ত। লক্ষ্য একটাই ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পারমাণবিক সক্ষমতা তিনগুণ বাড়ানোর পথে দেশের নীতি, অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সমন্বয় করা। লিয়নের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ইতিমধ্যেই হয়েছে। কারণ পারমাণবিক শক্তি এখন বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনার অংশ। সামনে প্রয়োজন গ্রিন ফাইন্যান্সে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে পারমাণবিকের স্থান নিশ্চিত করা এবং সব কম-কার্বন প্রযুক্তিকে সমান গুরুত্ব দেওয়া।
বিশ্ব যখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানির নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে পারমাণবিক শক্তি নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং তার অনিবার্য সহযোগী। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি রূপান্তরকে পরিচ্ছন্ন, নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী রাখতে পারমাণবিক শক্তি এখন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে।
