জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) অতিরিক্ত পরিচালক আজিজুর রহমান তার ভাই ইকবাল হোসেন ও ভায়রা মোস্তাক আহমেদের নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে করোনা সংক্রমণের সময় কিট সরবরাহ করে কোটি কোটি হাতিয়ে নিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি দুবাইয়ে ৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে লোকসান হওয়ায় ব্যবসায়িক পার্টনাকে দেশে আসতে দেননি। পার্টনারের প্রতিষ্ঠান দখল করার পাশাপাশি পার্টনারের স্ত্রীর ফ্ল্যাটের মূল দলিল নিয়ে গেছেন। তার স্ত্রীর বিও অ্যাকাউন্ট ও ব্যাংকে ৩৪ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আজিজুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে। শুধু আজিজুর রহমানই নন, তিনিসহ ১৩ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। গেল বছরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি দুদক অভিযোগের অনুসন্ধানে নামে। দুদকের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগের অনুসন্ধান করছেন বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, গত বছর ২৪ আগস্ট জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তর থেকে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিবকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। এনএসআইয়ের প্রশাসন থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, এনএসআইয়ের ১৩ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানের অনুরোধ জানানো হচ্ছে। চিঠিতে যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয় তারা হলেন এনএসআইয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আজিজুর রহমান, এমএসকে শাহীন, মোহাম্মদ জহীর উদ্দিন, যুগ্ম পরিচালক জিএম রাসেল রানা, এফএম আকবর হোসেন, জহরলাল জয়ধর, শেখ খায়রুল বাসার, মো. ইসমাইল হোসেন, মো. নাজমুল হক, শেখ শাফিনুল হক, বদরুল আহমেদ এবং উপপরিচালক কামরুল হাসান ও আমিনুল হক।
জানা গেছে, এ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গত বছর ৩০ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে দুদক চেয়ারম্যানকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ের পরিচালক র হ ম আলাওল কবির স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তরের (এনএসআই) ১৩ জন কর্মকর্তার আর্থিক অনিয়ম ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধানপূর্বক এনএসআইয়ের প্রতিবেদন প্রেরিত চিঠির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।
দুদকের তথ্য বলছে, চিঠি পাওয়ার পর গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। ১৭ ডিসেম্বর অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এনএসআইয়ের ১৩ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। সম্প্রতি ১৩ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অনুসন্ধানে পৃথক ১৩টি টিম গঠন করা হয়েছে। অনুসন্ধান টিম সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণ চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছে।’
দুদকের টেবিলে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে, এনএসআইয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আজিজুর রহমান তার ভাই ইকবাল হোসেন ও ভায়রা মোস্তাক আহমেদকে সামনে রেখে কোম্পানি খুলে করোনাকালে করোনাভাইরাস শনাক্তকরণ কিট সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা লোপাট করেছেন। এ ছাড়া তিনি রাজধানীর প্রগতি সরণিতে ল্যাব কোয়েস্ট লিমিটেড নামের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে লাইফকোড টেকনোলজিস্টের প্রতিনিধি সৈয়দ তবিবুর রহমানের মালিকানার শেয়ার মালিকের অনুস্থিতিতে স্বাক্ষর করে ছোট ভাই ইকবাল হোসেনের নামে স্থানান্তর করেন। আজিজুর রহমান যৌথভাবে তবিবুর রহমানের সঙ্গে দুবাইয়ে ব্যবসা করতে গিয়ে ৭ কোটি ৫৮ লাখ বিনিয়োগ করে লোকসান দেন। ওই টাকা উদ্ধারের জন্য তিনি তবিবুর রহমানকে ভয়ভীতি দেখিয়ে দেশে আসতে দেননি। তবিবুর রহমান দুবাই থাকাকালে তার স্ত্রী রাশিকা খাতুনের পাসপোর্ট জব্দ করেন এবং তার নামে থাকা বনানীর ফ্ল্যাটের দলিলের ফটোকপিতে সই করে মূল দলিল নিয়ে নেন।
অভিযোগে বলা হয়, আজিজুর রজমানের স্ত্রী গৃহিণী হওয়া সত্ত্বেও তার নামে বিভিন্ন বিও অ্যাকাউন্ট খুলে শেয়ার কেনাবেচা ও স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে ৩৪ কোটি টাকার লেনদেন করেন। এ টাকার উৎস জানাতে পারেননি তিনি। আজিজুর রহমান নিজের ও স্ত্রীর নামে বিও অ্যাকাউন্ট খুলে প্রচুর অর্থের ব্যবসা করেছেন।
অতিরিক্ত পরিচালক এমএসকে শাহীন : এমএসকে শাহীন কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন হোটেল থেকে বিপুল পরিমাণ চাঁদা নিয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকালে প্রার্থীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করেন। তিনি ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা খরচ করে সিলেটে ছয়তলা বাড়ি করেছেন। ঢাকায় তার কয়েকটি ফ্ল্যাট রয়েছে।
অতিরিক্ত পরিচালক জহির উদ্দীন : মোহাম্মদ জহির উদ্দীন ২০১১ সালে পাকিস্তানের ইসলামাবাদের বাংলাদেশ হাইকমিশনে কূটনৈতিক হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে ভিয়েনা কনভেনশনের আওতায় আমদানিকৃত হার্ড লিকার বিধিবিধান অমান্য করে গোপনে কালোবাজারে বিক্রি করে দেন তিনি। অর্জিত টাকা বৈধ অর্জন হিসেবে দেশে পাঠান, যা মানিলন্ডারিং অপরাধের শামিল। অন্যদিকে, হাসান তৌফিক ইমামকে অবৈধভাবেভাবে ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের অধিকার পাইয়ে দেন তিনি। জহির উদ্দীন ক্ষমতার অপব্যবহার করে ২০১৭ সালের ১৮ নভেম্বর হাসান তৌফিক ইমামসহ ছয়জনকে দুটি গাড়িতে করে ভিআইপি লাউঞ্জে ঢোকান। তারা ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস কার্যক্রম শেষ করে চায়না সাউদার্ন ফ্লাইটে ওঠার সময় বোর্ডিং ব্রিজের ১০ নম্বর গেটে নিরাপত্তা তল্লাশিকালে ১ লাখ মার্কিন ডলারসহ ধরা পড়েন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, জহির উদ্দীন ঢাকা বোট ক্লাব, গুলশান ক্লাব, নোয়াখালী ক্লাবের অনারারি সদস্যপদ গ্রহণ করেছেন। তবে এ ব্যাপারে কর্র্তৃপক্ষের অনুমোদন নেননি, সদস্যপদ নিয়েও কর্র্তৃপক্ষকে জানাননি। তার দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে ১৫২৮ স্কয়ার ফুটের একটি ফ্ল্যাটের উল্লেখ রয়েছে। তিনি নিজের নামে ও স্ত্রীর নামে দুটি ফ্ল্যাট কিনেছেন, যা সংশ্লিষ্ট আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি একটি ফ্ল্যাট কেনার আগে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছেন এবং তার স্ত্রীর নামে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন থেকে নেওয়া স্টাফ লোনকে অর্থের উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন। বিষয়টি শুধু সংশ্লিষ্ট বিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিকই নয়, তিনি প্রতারণার আশ্রয়ও নিয়েছেন। তার ফ্ল্যাট ক্রয়ের অর্থের উৎস পাকিস্তান থেকে হার্ড লিকার বিক্রি করে পাওয়া অর্থ; এ টাকা মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে সাদা টাকা হিসেবে স্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগও করেন। তার সম্পদ বিবরণী উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে ১৬০০ স্কয়ার ফুটের একটি ফ্ল্যাটের কথা উল্লেখ আছে, যদিও এটি কেনার অর্থের উৎস ছিল না। তিনি বিষয়টি কর্র্তৃপক্ষকে জানাননি। গাজীপুরে চার শতাংশ জমি কেনার বিষয়েও কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেননি তিনি। এসব বিষয়ে উৎস উল্লেখ না করা ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না নেওয়া বিধিবিধানের চরম লঙ্ঘন ও প্রচলিত দুর্নীতির আইনে অপরাধ।
যুগ্ম পরিচালক শেখ শাফিনুল হক : তিনি এনএসআইয়ের পরিচয় ব্যবহার করে রাজধানীর লালমাটিয়ায় প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট কিনেছেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শতকোটি টাকা মূল্যের সম্পদ অর্জন করেছেন। লালমাটিয়ার রোজ হ্যাভেন ভবনের অ্যাপার্টমেন্টের দাম বাজারমূল্য থেকে কম দেখিয়ে পরিশোধ করেছেন। তিনি তার মায়ের নামে বুকিং করে ফ্ল্যাটটি ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে মিলে মূল্য দেখান ৭৫ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ সালের সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী তার সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৬৫ লাখ ৪৪ হাজার ১৩২ টাকা। তবে তার চারটি ব্যাংক হিসাবে লেনদেন হয়েছে ৪ কোটি ৪৮ লাখ ৯৬ হাজার ৯২২ টাকা। তার স্ত্রী সোনিয়া সুলতানার আয়কর বিবরণী অনুযায়ী সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৩৭ লাখ ১ হাজার ৭৭ টাকা। কিন্তু স্ত্রীর একাধিক ব্যাংক হিসাবে লেনদেন হয়েছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ৬১ হাজার ৫৩৬ টাকা।
উপপরিচালক কামরুল হাসান : প্রকৌশলী আব্দুল হালিমের পক্ষে রেজাউল বিশ্বাস ও গাড়িচালক আরফান হোসেনের মাধ্যমে একটি ৫০ ইঞ্চি ওসাকা টিভি গ্রহণ করে তা সরকারি বাসায় ব্যবহার করছেন। তিনি পাবনা সদর উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. সোহেল হোসেন শাহিনকে বিজয়ী করাতে চুক্তি করেন। পরে তিনি চেয়ারম্যান প্রার্থীর বাসায় গিয়ে ২ লাখ টাকা গ্রহণ করেন এবং ৩ লাখ টাকা নির্বাচনের আগের রাতে নেওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। তার সহযোগী ছিলেন এনএসআই অফিসের ফিল্ড স্টাফ মুকুল। তিনি পাবনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম পাকনকে জেলা পরিষদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী করতে সহযোগিতা করেছেন। তিনি জেলা পরিষদের ভেতরে মেয়ে নিয়ে গিয়ে অবাধে মেলামেশা করেন। পাবনা জেলা পরিষদের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ভুয়া বিল ভাউচারে উত্তোলনের পর ২০ লাখ টাকার ভাগ নেন।
