এখনই ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ সম্ভব নয়

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:২৭ এএম

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ-পরবর্তী সময়ের মতো বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার উপযুক্ত সময় হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় সাবেক দুই মার্কিন কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠকে তাদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সাবেক শাসকরা এখনো তাদের অপরাধ অস্বীকার করে যাচ্ছে; ফলে এ ধরনের প্রক্রিয়া শুরুর পরিবেশ তৈরি হয়নি।’

প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় দায়িত্ব পালন করা সাবেক দুই মার্কিন কূটনীতিক আলবার্ট গোম্বিস ও মোর্স ট্যান এদিন সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানেই ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের সম্ভাব্যতা নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়।

নেলসন ম্যান্ডেলার ‘বন্ধু’ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘সত্য ও পুনর্মিলন প্রক্রিয়া’ ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণের কথা তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশে এখনো উপযুক্ত সময় আসেনি। কোথা থেকে শুরু করবেন? সত্য ও জাতীয় পুনর্মিলন তখনই আসে, যখন আপনি স্বীকার করেন যে আপনি ভুল ছিলেন, যখন আপনি আপনার অপরাধের জন্য অনুশোচনা ও অনুতাপ দেখান এবং সঠিক পরিবেশ সৃষ্টি করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের (সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার) কোনো অনুতাপ নেই। বরং তারা দাবি করছে, জুলাই আন্দোলনের সময় নিহত যুবকদের হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। তাদের অপরাধের পাহাড়সমান প্রমাণ আছে, সেগুলো সব জঘন্য অপরাধ, তবুও তারা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আসছে।’

বর্ণবাদের বিভাজন দূর করে সংহতি ফিরিয়ে আনতে ১৯৯৫ সালে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন করে দক্ষিণ আফ্রিকা। সত্য উদঘাটন, বিচার ও পুনর্মিলনের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে দেশটিতে ওই কমিশন করা হয়।

দীর্ঘ সময় ধরে দেশে গুম, খুন, হত্যার মতো নানা রাষ্ট্রীয় অপরাধের ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিক যে ‘ক্ষত’ তৈরি হয়েছে, তা সারাতে এবং অপরাধীদের ‘শোধরাতে’ দক্ষিণ আফ্রিকার আদলে এরকম কমিশন গঠনের আলোচনা অভ্যুত্থানের পর থেকেই ছিল।

এর আগে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গত বছর এক অনুষ্ঠানে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের প্রস্তাব ভেবে দেখার কথা বলেন। তবে পরে ওই বছর জুন মাসে আইন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ ধরনের কমিশন গঠনের বিষয়ে সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিতেই : সাক্ষাৎকালে মার্কিন কূটনৈতিকদের অধ্যাপক ইউনূস বলেন, নির্বাচন ঘিরে ভুয়া খবর ও পরিকল্পিত বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন আয়োজন এবং ফল ঘোষণার পর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কে কী বলল, তা বিবেচ্য নয়। ১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে এর এক দিন আগে বা পরে নয়। নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখর পরিবেশে। নির্বাচনকালে অন্তর্বর্তী সরকার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে। প্রশাসন থাকবে পক্ষপাতমুক্ত এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।

সাবেক ভারপ্রাপ্ত আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট আলবার্ট গোম্বিস এবং সাবেক অ্যাম্বাসাডর-অ্যাট-লার্জ মোর্স ট্যান আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ সফরে এসেছেন।

প্রায় এক ঘণ্টার এ বৈঠকে নির্বাচন ছাড়াও জুলাই বিপ্লব ও এর পরবর্তী পরিস্থিতি, তরুণ আন্দোলনকারীদের উত্থান, জুলাই সনদ ও গণভোট, নির্বাচন ঘিরে ভুয়া খবর ও অপতথ্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকার প্রচার চালাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, জনগণের সমর্থনে জুলাই সনদ অনুমোদিত হলে তা গণতান্ত্রিক শাসনের একটি নতুন অধ্যায় সূচনা করবে এবং ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রের কোনো সুযোগ থাকবে না।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, সাবেক স্বৈরাচারী শাসনের সমর্থকরা নির্বাচন নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরির জন্য ভুয়া খবর ও অপতথ্য ছড়াচ্ছে। তবে জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন। ক্রমেই তারা এআই-সৃষ্ট বিভ্রান্তিকর ভিডিও শনাক্ত করতে পারছে।

সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি গোম্বিস এ বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন, বিশ্ব জুড়ে ভুয়া খবর এখন গণতন্ত্রের ‘প্রধান শত্রুদের একটি’ হয়ে উঠেছে। এ হুমকি মোকাবিলায় আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

দুই কূটনীতিকই গত দেড় বছরে দেশ পরিচালনায় প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকার প্রশংসা করেন। বৈঠকে এসডিজি সমন্বয়ক ও জ্যেষ্ঠ সচিব লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন।

শিপিং করপোরেশনের লাভজনক অবস্থান ধরে রাখতে হবে: সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) যেভাবে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়েছে তা ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন একটি শক্তিশালী ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান থাকতে হবে। ভবিষ্যতে এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে যাতে এই প্রতিষ্ঠানের আয় দিয়ে প্রতিষ্ঠানই আরও শক্তিশালী হয়, বহরে নতুন নতুন জাহাজ যুক্ত হয়। গতকাল বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিএসসি কর্তৃক বাস্তবায়িত ছয়টি জাহাজ ক্রয় প্রকল্পের জন্য গৃহীত ঋণ পরিশোধ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঘোষিত লভ্যাংশ বাবদ সরকারের পাওনা হিসেবে ২০৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন ড. ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টার কাছে চেক হস্তান্তর করেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন ও বিএসসি ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক।

সরকারপ্রধান বলেন, বিএসসির বহরে আরও জাহাজ যুক্ত হলে নাবিকদের মধ্যে উৎসাহ বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। মেরিন একাডেমিগুলোর প্রশিক্ষকদের যথাযথ সম্মানি দিয়ে ধরে রাখতে হবে, যাতে তারা বিশ্বমানের নাবিক তৈরি করতে পারে।

কমোডর মাহমুদুল মালেক জানান, বিএসসির জন্য জি-টু-জি ভিত্তিতে ছয়টি জাহাজ ক্রয়/সংগ্রহের লক্ষ্যে বাস্তবায়িত ছয়টি নতুন জাহাজ ক্রয় (প্রতিটি প্রায় ৩৯,০০০ ডিডব্লিউটি সম্পন্ন তিনটি নতুন প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার এবং তিনটি নতুন বাল্ক ক্যারিয়ার) শীর্ষক প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ সরকার (অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ) ও চীন সরকার (চায়না এক্সিম ব্যাংক)-এর মধ্যে ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর একটি ঋণচুক্তি সই হয়। উক্ত ঋণের মূল বা আসলের পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি ইউয়ান (১ হাজার ৪৫৭ কোটি ৬৭ লাখ ৯৮ হাজার ৭৮৫) টাকা। এরই ধারাবাহিকতায় উক্ত ঋণ পরিশোধের জন্য ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর সরকারের অর্থ বিভাগ ও বিএসসির মধ্যে অন্য একটি চুক্তি সই হয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে ২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারকে (অর্থ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়) বিএসসি থেকে ১৩ বছরের মধ্যে পরিশোধ করা হবে।

চুক্তির শর্ত মতে গ্রেস পিরিয়ডকালে সুদের পরিমাণ ৪৭৫ কোটি ২৫ লাখ ১৩ হাজার টাকার চেক ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে।

প্রকল্পটির মাধ্যমে সর্বশেষ জাহাজ সংগ্রহের সুদীর্ঘ ২৭ বছর পর গত ২০১৮-১৯ মেয়াদে বিএসসির বহরে উক্ত ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ যুক্ত হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় সংগৃহীত ছয়টি জাহাজের মধ্যে পাঁচটি জাহাজ (এমভি বাংলার জয়যাত্রা, এমভি বাংলার অর্জন, এমটি বাংলার অগ্রযাত্রা, এমটি বাংলার অগ্রদূত এবং এমটি বাংলার অগ্রগতি) বর্তমানে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পরিম-লে পণ্য পরিবহন সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছে।

বিএসসি ৫৪ বছরের ইতিহাসে সর্বশেষ অর্থবছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা আয় করে সর্বোচ্চ মুনাফা (৩০৬.৫৬ কোটি টাকা) অর্জন করে। এই অগ্রগতিতে প্রকল্পের মাধ্যমে বহরে সংযুক্ত পাঁচটি জাহাজের ভূমিকা অপরিসীম।

প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বিএসসি এরই মধ্যে বেশ কিছু নতুন জাহাজ সংগ্রহের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ সংগ্রহের আওতায় প্রথম জাহাজ (বাংলার প্রগতি) গত ২৮ অক্টোবর থেকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করেছে। দ্বিতীয় জাহাজটি (বাংলার নবযাত্রা) আগামী ৩০ জানুয়ারি ডেলিভারির জন্য সূচি নির্ধারিত রয়েছে। পাশাপাশি, সরকারি অর্থায়নে দুটি এমআর প্রোডাক্ট অয়েল ট্যাংকার এবং নিজস্ব অর্থায়নে একটি আল্ট্রাম্যাক্স আকারের বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ অর্জনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ ছাড়া চীন থেকে জি-টু-জি ভিত্তিতে আরও চারটি নতুন বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল) সংগ্রহসহ বেশ কিছু জাহাজ অর্জন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত