তো  মা  দে  র   ব  ই

ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বীজ রোপিত হয়েছিল শৈশবেই

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩২ এএম

উন্নত ও মানবিক দেশ গঠনের জন্য প্রয়োজন আলোকিত মানুষ। জ্ঞানে, প্রজ্ঞায়, মানবিকতায় উদ্ভাসিত মানুষ। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আজীবন আলোকিত মানুষের সন্ধান করেছেন। মানুষের মাঝে আলো জে¦লে দিতে গড়েছেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এই প্রতিষ্ঠানের আপ্তবাক্যও তাই ‘আলোকিত মানুষ চাই।’ শিশুদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র দেশব্যাপী বইপড়া কর্মসূচি পালন করে। জ্ঞানের আধার, আনন্দের অবারিত উৎস বইকে শিশুদের কাছে পৌঁছে দিতে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কাজ করে চলেছে। কর্মজীবনের শুরু জগন্নাথ কলেজে এবং পরে ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। সবার কাছে তিনি শ্রদ্ধেয় ‘সায়ীদ স্যার’। ছিয়াশি বছরের এই চিরতরুণের কাছে এলে মনে হয় সময় থমকে গেছে। সবার শ্রদ্ধেয় ও জাতির দিকনির্দেশক। আজকের কিশোর পাঠকদের কৌতূহলী হওয়া স্বাভাবিক তিনি ছেলেবেলায় কেমন ছিলেন? দুষ্টু নাকি শান্তশিষ্ট? চটপটে নাকি সহজ সরল। তাদের কৌতূহল মেটাতেই যেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ লিখেছেন ‘আমার বোকা শৈশব’।

বইয়ের নামটা শুনেই নিশ্চয় বুঝতে পারছ, শিশু সায়ীদকে এখনকার আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ মোটেই চটপটে বা মেধাবীর আখ্যা দিতে চান না। তিনি নাকি কিছুটা বোকাই ছিলেন। এই বইয়ের শুরুতেই মন্তব্য করেছেন, ‘শিশু হিসেবে আমি এদের মতো (পাঁচ বছর বয়সেই যারা দেড় দুবছরের ঘটনা অবলীলায় বলতে পারে) একেবারেই মেধাবী ছিলাম না, সবকিছুতেই ছিলাম পিছিয়ে পড়া।’ নিজের শৈশবকে কেন বোকা শৈশব বলছেন আর নিজেকে কেন মেধাবী বলতে নারাজ তার কারণ ব্যাখ্যায় কয়েকটা দৃষ্টান্ত হাজির করেছেন লেখক। ছোটবেলায় তিনি বেশ লাজুক ছিলেন। মানুষের সামনে অস্বস্তিবোধ করতেন। একসঙ্গে বেশি মানুষ দেখলে কী করবেন ভেবে পেতেন না। এক বছরের বড় ওপরের ক্লাসের ছাত্রদের মনে হতো বেজায় বড়। কয়েকজন মেয়েকে একবার রাস্তায় হেঁটে যেতে দেখে তাদের জায়গা দিতে গিয়ে একেবারে রাস্তা ছেড়ে ড্রেনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। লেখক ব্যাখ্যা করেছেন ছেলেবেলার সেই কাজের কারণ। তার ব্যাখ্যায়, তিনি নিজেকে তখন বেশিরকম ছোট আর নগণ্য ভাবতেন। সেই অপরিসীম হীনম্মন্যতার জন্য অন্যদের অত বড় মনে হতো। এই হীনম্মন্যতা নিজের বিকাশের জন্য যে মোটেও ভালো নয় তা তিনি বুঝেছিলেন স্কুলের দিনগুলোতেই। তবে এই হীনম্মন্যতাকে পরাজিত করতে পেরেছিলেন তার অপর একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে। তা হলো, মানুষের প্রতি সুগভীর ভালোবাসা। মানুষের হৃদয়ে স্থান পাওয়ার আকাক্সক্ষা। সেই ছোটবেলাতেই তিনি খুঁজে বের করতে চেয়েছিলেন কীভাবে মানুষের মনে স্থান পাওয়া যায়। সেই অল্পবয়সে কতটুকুই বা তার সাধ্য? কোন আশ্চর্য ক্ষমতা দেখিয়ে ও মুগ্ধ করে তিনি মানুষের মনে স্থান পাবেন? অবশেষে তিনি মনে করলেন, আর কিছু না হোক, অন্তত একটা জিনিস তো অন্তত অপরকে দেওয়ার ক্ষমতা তার আছে। তার বিনীত আচরণ, সততা আর ভালোবাসা। এই উপলব্ধিবোধই সেদিন থেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলতে শুরু করল। বিনীত আচরণ অর্থাৎ শিষ্টাচার, নমনীয়তা, নিয়মানুবর্তিতা, গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রভৃতি। এগুলো কি মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ গুণগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়? আর সততা? সততার অর্থ কথা দিয়ে কথা রাখা, মিথ্যাচার না করা, অজুহাত না দেওয়া প্রভৃতি। জীবনের যেকোনো মুহূর্তে এই গুণ অর্জন গৌরবের। যত দ্রুত হয় ততই মঙ্গল। সর্বশেষ হলো, ভালোবাসা। এর মধ্যে অন্তর্নিহিত রয়েছে ক্ষমা, সর্বজীবে প্রেম, মানবতা, মমতা প্রভৃতি। সন্দেহ নেই, যেদিন তিনি জীবনের জন্য এই সিদ্ধান্ত নিলেন যে, মানুষের হৃদয়ে স্থান পাওয়ার জন্য তিনি নিজের আচরণকে যথাসম্ভব নমনীয় রাখবেন, সততা বজায় রাখবেন এবং ভালোবাসা ছড়াবেন সেদিন থেকে তার জীবন আর সাধারণ রইল না।

পরিণত বয়সে ছেলেবেলার ঘটনা লিখতে বসায় লেখকের কাছ হয়তো সবকিছু বেশি রকমের ছেলেমানুষী বলে মনে হয়েছে। কিন্তু ঘটনাগুলো আনন্দময় ও ঘটনাবহুল ছেলেবেলাকেই নির্দেশ করে। মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে মুকুন্দ সাহার রাজকীয় বাড়িতে যাওয়া এবং সেখানে সাদর আপ্যায়ন লাভ, স্বপ্নে হাতির পিঠে চড়ে রাজা হওয়া, কলকাতায় গিয়ে এক নতুন জগতের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, চিড়িয়াখানা আর শিল্পী কামরুল ইসলামের মুকুল ফৌজের স্মৃতি তার শিশুমনে চিরস্থায়ী হয়ে আছে। মফস্বল হয়ে উঠতে থাকা করটিয়ায় তার শৈশব ছিল অবাধ ও দুরন্তপনায় ভরা। গাছে চড়া, মাঠে খেলা, পুকুরে সাঁতার, লুকিয়ে খাবার খেয়ে নেওয়া, যা আর পাঁচটা সাধারণ ছেলেরা করে তার শিশু সায়ীদও করেছেন। সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে কিছু স্মৃতি। কিছু মধুর, কিছু তিক্ত। তবে সব স্মৃতিই তাকে কিছু না কিছু শিখিয়েছে। যেমন মিটসেফ থেকে চুরি করে দুধ খেতে গিয়ে মিটসেফসহ পড়ে গিয়েছিলেন। আবার সাঁতার শেখার ব্যাপারটাও অদ্ভুত উপায়ে। তার মা তাকে পুকুরে ছুড়ে দিয়ে পাড়ে দাঁড়িয়েছিলেন। আর তিনি নিজের চেষ্টায় নিজেকে ভাসিয়ে রাখার কৌশল শিখে ফেললেন। এমন সব রোমাঞ্চকর ঘটনা দিয়ে পূর্ণ ‘আমার বোকা শৈশব বইটি’।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে বলা হয় ‘আলোকিত মানুষ’-এর স্বপ্নদ্রষ্টা। তার লেখায়, বক্তৃতায় তিনি ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। তার কথা ও লেখা পরিবর্তন বহু মানুষের জীবন। এই দৃষ্টিভঙ্গি তার জীবন থেকে উৎসারিত। শৈশবের সিদ্ধান্তই তাকে এই পথে ধাবিত করেছে। যৌবন ও মধ্যবয়সে পেয়েছে তার দৃষ্টিভঙ্গির পূর্ণতা। কিন্তু এর বীজ রোপিত হয়েছিল শৈশবেই। তার শৈশবের আলেখ্য ‘আমার বোকা শৈশব’ বইটি তার প্রমাণ। বইটিতে যে ইতিবাচকতার কথা বলা হয়েছে তা তোমাদের এগিয়ে দেবে মহৎ জীবনের পথে।

বইটি তোমাদের ভালো লাগবে।

সুলতানা রাজিয়া

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত