গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সম্মানের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে স্মরণ করল নাগরিক সমাজ। এতে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, বিশিষ্ট নাগরিক, গবেষক, চিকিৎসক, শিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিনিধি, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি ও বিভিন্ন পেশাজীবী নেতারা। খালেদা জিয়ার জন্য আয়োজিত শোকসভায় বক্তারা বলেন, খালেদা জিয়া শুধু একটি দলের নেত্রী ছিলেন না, তিনি সত্যিকার অর্থেই মানুষ ও দেশের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন, যা দলমত নির্বিশেষ লাখ লাখ মানুষের তার জানাজায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশের গণতন্ত্র দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম করেও টিকেছিল বলে মন্তব্য করে বক্তারা আরও বলেন, চরম নিষ্পেষণ এবং রাজনৈতিক নিপীড়ন সয়েও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া উদারতার মানসিকতা দেখিয়েছেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর কোনো বিদ্বেষ ছড়াননি। বরং তারুণ্যের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে জ্ঞানভিত্তিক দেশ ও জাতি গড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার দেখানো পথেই সবাইকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা। গতকাল শুক্রবার খালেদা জিয়ার স্মরণে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘অপরাজেয় বেগম খালেদা জিয়া’ শীর্ষক নাগরিক শোকসভায় এ আহ্বান জানান বক্তারা। সভা শেষে তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়।
দুপুরের পর থেকেই অনুষ্ঠানস্থলে আসতে শুরু করেন আমন্ত্রিত অতিথিরা। অনুষ্ঠানে যোগ দেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে নাগরিক শোকসভা শুরু হয়। তেলাওয়াত করেন বিশ্বজয়ী হাফেজ সালেহ আহমদ তাকরিম। এরপর শোকগাথা পাঠ করেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন। শোকসভার শৃঙ্খলা রক্ষায় অনুষ্ঠানস্থলসহ আশপাশ এলাকায় বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
শোকসভায় দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘বিগত সরকার যখন তাকে নানাভাবে নিষ্পেষণ করল, হাউজ অ্যারেস্ট করা হলো, যেখানে হৃদয়বিদারকভাবে তার চিকিৎসা হলো না। ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট তিনি যে বাণী দিলেন, সেটা ধ্বংস ও প্রতিহিংসার বিপরীতে তার উদারতা। তার এই মানসিকতা আমরা মনেপ্রাণে ধারণ করতে পারলে আগামীর বাংলাদেশ হবে ভিন্ন রকম।’ তিনি আরও বলেন, ‘জ্ঞানভিত্তিক ভবিষ্যৎ দেশ গড়তে তার যে আহ্বান, সেদিকে আমাদের যেতেই হবে। আগামীর নেতৃত্বকে বলব, খালেদা জিয়ার যে শেষ বাণী জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার, সেটা যেন আমরা সবাই ধারণ করি।’
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘খালেদা জিয়ার প্রতিহিংসা থেকে সরে আসার বার্তা দিয়েছিলেন। উত্থান পর্বে খালেদা জিয়া বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে দলকে উত্তরণ করেন। সরকার পরিচালনায় আরেকটি অবস্থায় তাকে দেখা গেছে। আর ২০০৭ পরবর্তী সময়ে তাকে নিগৃহীত হতে হয়েছে, তিনি ভিকটিম হয়েছেন নানাভাবে। তবে উত্থান পর্বেই আপসহীনতার তকমা তিনি পেয়ে গেছেন। শেষ পর্বে তিনি যে ভিকটিম হয়েছেন, সেটা মানুষের কাছে সহানুভূতির সৃষ্টি করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘খালেদা জিয়ার শেষ বক্তব্য প্রতিহিংসা থেকে সরে আসার বার্তা দেয়। মনে রাখতে হবে, অন্যকে আলো দিতে হলে নিজেকে মোমবাতি হতে হয়।’
যায়যায়দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, ‘যে করেই হোক, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যেন হয়। সরকার বলছে ওইদিনটি হবে উৎসবের, আমরাও তেমনটাই চাই। পুলিশ বাহিনী ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে সেটাই প্রত্যাশা। সবাই উৎসাহের সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে যাবেন, ভোট দেবেন। অন্যথায় এই শোকসভা ব্যর্থ হবে। শোককে শক্তিতে পরিণত করবেন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার মাধ্যমেই। ভোট বানচালের কোনো ষড়যন্ত্রকে সফল হতে দেবেন না।’
খালেদা জিয়ার একটা অদ্ভুত বিচার হয়েছিল, উদ্ভট বিচার আসিফ নজরুল : অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, “খালেদা জিয়ার একটা অদ্ভুত বিচার হয়েছিল, উদ্ভট বিচার। সেই বিচারে উনি শকড হয়েছিলেন অন্যপক্ষের আইনজীবীর কথা শুনে। উনি অবাক হয়ে বলেছিলেন ‘আমি মেরে খেয়েছি এতিমের টাকা?’ বিস্মিত এবং ব্যথিত হয়ে বলা এ বাক্যটাকে বিচারক লিখেছিলেন, ‘বেগম জিয়া নিজেই স্বীকার করেছেন তিনি কাজটা করেছেন’।” তিনি বলেন, ‘আমি আইনের ছাত্র হিসেবে বলি এত জঘন্য একটা বিচার হয়েছে। এটার বিপক্ষে বিবৃতি লিখে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি, ফোন করেছি বিভিন্ন মানুষকে, কিন্তু হাইকোর্টে কী করবেন না করবেন, এই ভয়ে চারজনের বেশি রাজি হয়নি। চারজনের তো বিবৃতি হয় না, এজন্য পত্রিকায় ধরাতে পারিনি।’
আইন উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘খালেদা জিয়ার অনেক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল। উনি সৎ ছিলেন, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, আত্মত্যাগী ছিলেন, দেশপ্রেমিক ছিলেন। তার মধ্যে রুচির এক অবিস্মরণীয় প্রকাশ ছিল। তিনি পরমতসহিষ্ণু ছিলেন। বাংলাদেশকে ভালো থাকতে হলে খালেদা জিয়াকে আত্মস্থ করতে হবে।’ আসিফ নজরুল আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ আজকে স্বাধীনভাবে ঘৃণাও প্রকাশ করতে পারছে, স্বাধীনভাবে ভালোবাসাও প্রকাশ করতে পারছে। এজন্যই এক নেত্রীর ঠাঁই হয়েছে মানুষের হৃদয়ে, আরেকজনের ঠাঁই হয়েছে বিতাড়িত ভূমিতে।’
শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন। উপস্থাপনা করেন আশরাফ কায়সার ও কাজী জেসিন। শোকসভায় ঢাকার কূটনীতিকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, পাকিস্তান, চীন, সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও কাতারসহ ২৩টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ প্রফেসর মাহবুব উল্লাহ, সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) নূরুদ্দিন খান, অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের পক্ষে বক্তব্য রাখেন বিশপ সুব্রত বি গোমেজ, নাগরিক সমাজের পক্ষে অর্থনীতিবিদ ও পাবলিক পলিসি বিশ্লেষক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষে আইসিসিবির প্রেসিডেন্ট মাহবুবুর রহমান।
শিক্ষক সমাজের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান এসএম ফায়েজ, শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. তাসনিম আরেফা সিদ্দিকী, কূটনৈতিক আনোয়ার হাশিম, চিকিৎসক সমাজের পক্ষে প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসক দলের প্রধান প্রফেসর ডা. এফএম সিদ্দিক, নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি এ. কে. আজাদ, পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, ক্রীড়াবিদদের পক্ষে সাবেক ক্রিকেটার আকরাম খান, ব্রিটিশ আইনজীবী ও মানবাধিকার নেত্রী আইরিন খান, আইনজীবী শাহদীন মালিক, গবেষক ও অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. রাশেদ আল তিতুমীর, ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক ব্যবসায়ী সিমিন রহমান, বিপিকেএসর সিইও এবং ডিপিআইর প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তার দুলাল, তরুণ সমাজের পক্ষে লেখক ও চিন্তক ফাহাম আব্দুস সালাম, চাকমা রাজা ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী, দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন প্রমুখ।
৪০ দিন ধরে রাজধানী ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। পরদিন সংসদ প্রাঙ্গণেই জনসমুদ্রে তার জানাজা সম্পন্ন হয়। এরপর জিয়া উদ্যানে স্বামী, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের পাশে সমাহিত করা হয় তাকে। তার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়, দাফনের দিনে রাখা হয় সাধারণ ছুটি আর বিএনপির পক্ষ থেকে দলের চেয়ারপারসনের মৃত্যুতে পালন করা হয় সাত দিনের শোক।
