শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে পরিবার নিয়ে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বেড়াতে এসেছিলেন চাকরিজীবী রাসেল মিয়া। মেলায় আসতে যানজটের কারণে তাকে ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। কাঞ্চন ব্রিজের পূর্ব পাড় থেকে মেলা পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার রাস্তা তাদের হেঁটে আসতে হয়েছে। এতে স্ত্রী সুমা আক্তার প্রবেশ করেই খানিকটা অসুস্থ হয়ে পড়েন। শুধু সুমা আক্তার নন, গতকাল মেলার ১৪তম দিনে পূর্বাচলে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় আসতে দর্শনার্থীদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এদিন মেলায় দর্শনার্থীর সমাগম অনেক বেশি হওয়ায় মেলার চারপাশের রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে দর্শনার্থীদের দূরদূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে মেলায় যেতে হয়।
১৯৯৫ সাল থেকে বাণিজ্য মেলার আসর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বসলেও গত ৫ বছর ধরে এ আসর পূর্বাচলে বসছে। পূর্বাচলের আসরে যত দিন যায় ততটাই বাড়ে দর্শনার্থীদের ভিড়। ভিড়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে মানুষের ভোগান্তিও। রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে মেলায় আসতে সময় লেগে যায় ৪-৫ ঘণ্টা। এর অন্যতম কারণ মেলাকে ঘিরে এশিয়ান বাইপাস, গাজীপুর বাইপাস ও তিনশ ফুট সড়কের দীর্ঘ যানজটের কারণে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ যানজটের কারণে মেলায় দর্শনার্থীদের পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরাও। এ ছাড়া রাস্তা দখল করে অবৈধ পার্কিং ও অবৈধভাবে বসা ফুটপাতের দোকান তো রয়েছে। এ কারণেও যানজটে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এছাড়া মেলায় যাওয়া-আসায় তিন থেকে চারগুণ ভাড়া তো আছেই। তারপরও এত ভোগান্তি পেরিয়েও মেলায় আসছেন দর্শনার্থীরা।
গতকাল শুক্রবার মেলার ১৪তম দিনে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। মেলা শেষের দিকে হওয়ায় দর্শনার্থীর সঙ্গে সঙ্গে স্টলগুলোতে বাড়ছে ক্রেতাদের ভিড়। এতে ব্যবসায়ী ও বিক্রয়কর্মীদের যেন দম ফেলার ফুরসত নেই।
ছুটির দিন হওয়ায় মেলার ভেতরে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় রাখা হয় নাচ-গানসহ নানা আয়োজন। এদিন মেলায় বেশিরভাগ স্টলেই ছিল উপচেপড়া ভিড়। তবে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে গৃহস্থালি, ইলেকট্রনিক্স, প্রসাধনী, কাশ্মীরি স্টলগুলোতে। এছাড়া শিশু পার্ক ও রেস্তোরাঁগুলোতে বসার কোনো জায়গা ছিল না। মেলার ভেতরে শিশু পার্কে যেন দাঁড়ানোর কোনো জায়গা ছিল না। শিশু পার্কের ভেতরে রাইডগুলোর টিকিট কাটতে দর্শনার্থীদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। বেশি লোকের সমাগম হওয়ায় রেস্তোরাঁগুলো খাবারের দাম দর্শনার্থীদের কাছে বেশি নেওয়া হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন মেলায় আসা দর্শনার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এদিকে হাইওয়ে পুলিশ যানজট নিরসনের চেষ্টা করলেও এত লোকের সমাগমে তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। যানজটে আটকে থাকে শত শত যানবাহন।
জিতু ভুঁইয়া নামে এক মেলার কসমেটিক্স ব্যবসায়ী বলেন, মেলা এত লোকের সমাগম আগে দেখিনি। মেলা শেষের দিকে হওয়ায় আমরাও পণ্যে অনেক ছাড় দিচ্ছি। ছাড় পেয়ে ক্রেতারাও পণ্য কিনছেন হরদম।
সাইদুর রহমান নামে এক থ্রি-পিস ব্যবসায়ী বলেন, মেলায় এত লোকের সমাগম দেখে ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি ফুটেছে। এত টাকা দিয়ে মেলায় স্টল বরাদ্দ নিয়েছি। বিক্রি আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো হচ্ছে। মেলায় বিক্রি বেশি হলে আমাদের লোকসান হবে না আশা করি। আমরা ক্রেতা আকর্ষণে বিভিন্ন ছাড় দিচ্ছি। ছাড় পেয়ে ক্রেতারাও কিনছেন নিজেদের পছন্দের পণ্য।
রাজধানীর ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে খোকন মিয়া স্ত্রীকে নিয়ে বাণিজ্য মেলায় বেড়াতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, আমি সরকারি একটি ব্যাংকে চাকরি করি। আজ শুক্রবার ছুটির দিন তাই স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে মেলায় এসেছি। মেলায় অনেক ভিড়। কোথাও পা ফেলার জায়গা নেই। ভিড়ের কারণে মেলার চারপাশের রাস্তায় অনেক যানজট। যানজটের কারণে ২ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে মেলায় এসেছি।
কথা হয় মহিবুর রহমান নামে এক দর্শনার্থীর সঙ্গে। তিনি বলেন, মেলায় অনেক লোকের সমাগম হয়েছে। মেলায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। মেলায় সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে। এখানে গান শুনে ভালো লাগল। তবে আসার সময় যে যানজট দেখলাম তা কতক্ষণে শেষ হবে তা বলা যাচ্ছে না।
কথা হয় অর্পা নামে এক দর্শনার্থীর সঙ্গে তিনি বলেন, বাণিজ্য মেলায় আসতে দুপুর ২টার দিকে যাত্রাবাড়ী থেকে রওনা হই। মেলায় এসে পৌঁছেছি সন্ধ্যা ৭টার দিকে। রাস্তাঘাটের দীর্ঘ যানজটের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছিলাম। মেলা থেকে ফিরতেও একই ভোগান্তিতে পড়তে হবে। বাণিজ্য মেলা দেখলাম এবার অনেক জমে উঠেছে।
যানজটে আটকে থাকা পিকআপ চালক রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ৩ ঘণ্টা ধইরা মেলার সামনে জ্যামে বইয়া রইছি। মাল লইয়া টঙ্গী যামু। এই জ্যাম কহন শেষ অইব কহন যামু। আগে জানলে মেলার সামনে দিয়া না গিয়া অন্যদিক দিয়া যাইতাম।
কথা হয় অটোরিকশা চালক আব্বাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, কাঞ্চন ব্রিজ ও তিনশ ফুট সড়ক পুরোটাই যানজটে আটকে আছে। গাড়ি একটু নড়ছে না। যানজটের কারণে দর্শনার্থীরা হেঁটে মেলায় যাচ্ছে। এই যানজট কখন শেষ হবে কেউ বলতে পারে না।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান হাসান আরিফ বলেন, শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় মেলা কানায় কানায় পরিপূর্ণ থাকে। মেলায় দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা দিতে বিপুল পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রাখা হয়েছে। মেলা দর্শনার্থীদের আসা যাওয়ার জন্য ২০০টির অধিক বিআরটিসির শাটল বাস রাখা হয়েছে। দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি হলে বাসের সংখ্যাও বাড়ানো হয়।
