বিক্ষোভ-অবরোধে শাবিপ্রবিতে অচলাবস্থা

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৪৯ এএম

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (শাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। এ নির্বাচনের ওপর চার সপ্তাহের স্থগিতাদেশ জারি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দায়ের করা রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল সোমবার বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।

শাকসু নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণের জন্য প্রথমে ১৭ ডিসেম্বর দিন নির্ধারণ করলেও পরে তা ২০ জানুয়ারি (মঙ্গলবার) করা হয়। ১৯৯৭ সালের ২৫ আগস্ট সর্বশেষ শাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২৮ বছর পর মঙ্গলবার এই নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল।

এদিকে শাকসু নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবি) চরম অচলাবস্থা বিরাজ করছে। অন্যদিকে নির্বাচন স্থগিতের প্রতিবাদে শাবি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেছেন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।

নির্বাচনে স্বতন্ত্র ভিপি পদপ্রার্থী মমিনুর রশিদ শুভ, একজন সদস্য পদপ্রার্থী এবং আরেকজন শিক্ষার্থী এ তিনজন সম্প্রতি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল, গাজী কামরুল ইসলাম সজল, রাশনা ইমাম, মনিরুজ্জামান আসাদ প্রমুখ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ হোসাইন লিপু এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।

ব্যারিস্টার মনিরুজ্জামান আসাদ সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রয়েছে। শুধু শাকসু নির্বাচনই নয়, সারা দেশে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও অন্যান্য সংগঠনের নির্বাচনের শিডিউল ছিল। নির্বাচন কমিশনের চিঠির পর সবাই সেগুলো স্থগিত করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৫ জানুয়ারি চিঠি দিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচন করার নির্দেশ দিয়েছে। তাই সারা দেশে যখন সব নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে,তখন শাকসু নির্বাচন কমিশনের কী স্বার্থ যে এ সময়েই নির্বাচন করতে হবে এ কারণেই রিট করা হয়েছে।

ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশে কোনো স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি। শুধু নিরাপত্তাজনিত কারণে এবং প্রভাবমুক্তভাবে জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য সীমিত সময়ের (চার সপ্তাহ) স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে যেকোনো সময় নির্বাচন হতে পারে।’

শাবিতে অচলাবস্থা : শাকসু নির্বাচন কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনা ও অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষকদের অসহযোগিতা, নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের পদত্যাগ, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের মধ্যেই হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের খবর আসে। গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের শিক্ষক লাউঞ্জে সংবাদ সম্মেলন করে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের নেতারা শাকসু নির্বাচনে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দেন।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক ড. আশরাফ উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. শাহ মো. আতিকুল হক এবং ইউট্যাবের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম।

তারা জানান, নির্বাচন ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তারা শঙ্কিত ও বিব্রত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনে দায়িত্বে থাকা বিএনপিপন্থি আটজন শিক্ষক পদত্যাগ করেছেন। এরপর শাকসু নির্বাচন নির্ধারিত সময়ে আয়োজনের দাবিতে শিক্ষার্থীরা দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য প্রশাসনিক ভবনে অবস্থান করছিলেন। একই দাবিতে দুপুর আড়াইটার দিকে শিক্ষার্থীরা প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে উভয় দিকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীরা জানান, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচনের স্পষ্ট ঘোষণা না এলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

অন্যদিকে একই দিনে ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল)-এর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে নির্ধারিত সময়েই শাকসু নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানানো হয়। ইউটিএল সাস্ট চ্যাপ্টারের সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ নির্বাচন শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি। গত রবিবার স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী মামুনুর রশীদ শুভ হাইকোর্টে রিট করেন। রিটে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সব ধরনের নির্বাচন বন্ধ রাখার নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে শাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন অবৈধ বলে দাবি করা হয়।

একই দিন দুপুরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘টর্চার ওয়াচডগ বাংলাদেশ’ শাকসু নির্বাচনের একটি জরিপ ফলাফল প্রকাশ করে। জরিপ অনুযায়ী শীর্ষ তিন পদে শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের জসিম উদ্দিন জানান, জরিপের স্বচ্ছতা প্রমাণে ইতিমধ্যে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নিয়ে জরিপ চালানো হয়েছে এবং এর সফলতার হার ৯৭ শতাংশ।

নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কোর্টের রায় থাকায় আমরা তা লঙ্ঘন করতে পারি না। আমাদের কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রয়েছে। তবে আজ জরুরি সিন্ডিকেট সভা আছে, সেখানে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

শাবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএম সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা প্রশাসনিক ভবনে অবরুদ্ধ ছিলাম। হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছে এবং আমাদের তা মেনে চলতে হবে।’

হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের পর শিক্ষার্থীরা রিটকারী ভিপি প্রার্থী মামুনুর রশীদ শুভকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন এবং পুনরায় সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করেন। তবে বিকেল ৫টার দিকে শিক্ষার্থীরা অবরোধ প্রত্যাহার করেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা ক্যাম্পাসে অবস্থান করছেন।

শিবিরের বিক্ষোভ : শাকসু নির্বাচন হাইকোর্টে স্থগিত হওয়ায় প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ঢাকা মহানগর ছাত্রশিবির। গতকাল বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি হয়ে শাহবাগ মোড়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সমাবেশে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, হারার আশঙ্কায় নির্বাচন কমিশনের সামনে অবস্থান নিয়ে তরুণদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নির্বাচন বন্ধ করার চেষ্টা ছাত্রসমাজ কখনো মেনে নেবে না। তিনি আরও বলেন, একটি রাজনৈতিক দল হাইকোর্টে গিয়ে এমন রায় আদায় করেছে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অধিকার খর্ব করা হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) ভিপি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, হঠাৎ করে একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন বন্ধের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। নির্বাচন বাস্তবায়নের পথে যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করতে হবে। তা না হলে দেশের জনগণ ও শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে নামবে। ঢাবি শিবির সভাপতি ও ডাকসুর এজিএস মহিউদ্দিন খান বলেন, যারা শিক্ষার্থীদের দ্বারা প্রত্যেকটি ছাত্র সংসদে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, শিক্ষার্থীরা যাদের লাল কার্ড দেখিয়েছে তারা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আরেকটি ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ করতে চায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত