নতুন সরকারের ওপর চাপ তৈরি করবে প্রস্তাবিত পে-স্কেল

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৫০ পিএম

কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আয় না বাড়লেও বেতন-ভাতা এবং ঋণের সুদ পরিশোধের খরচ বৃদ্ধির কারণে ক্রমেই বাড়ছে পরিচালন খাতের ব্যয়। বিপরীতে উন্নয়ন খাতে ব্যয় কমছে। ব্যয় মেটাতে প্রতি বছর দেশি-বিদেশি উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিতে হয় সরকারকে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান না করেই সরকারি চাকুরেদের নতুন বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব বাস্তবায়নে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি খরচ জোগাড় করা পরবর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, বাড়তি এ ব্যয় মেটাতে সরকারকে বাধ্য হয়ে ঋণ নিতে হবে, যা সুদবাবদ ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দেবে। রাজস্ব বাড়াতে গিয়ে যদি অযৌক্তিকভাবে ভ্যাটের মতো পরোক্ষ কর বাড়ানো হয়, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সাধারণ মানুষের পক্ষে বাড়তি করের বোঝা নেওয়ার সুযোগ নেই।

সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা করে সরকারের আর্থিক সংগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন-ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ তাদের।

অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বেতন বৃদ্ধির ফলে বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়বে না। সরকার সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ নিচ্ছে।

পে-কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের এ খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণের বেশি করতে হবে। কিন্তু সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়ছে না, সুদের ব্যয় সামাল দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। এসব আমলে নিয়ে সরকার সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অস্বাভাবিক মাত্রায় বাড়িয়েছে।

লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে হিসাব করলে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই সরকারের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। এ সময় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, কিন্তু আদায় হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) হিসাবে সরকারের উন্নয়ন খরচ আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। এ সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বা উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ মাত্র ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা, যা এডিপির মাত্র ৫ শতাংশের মতো।

এবারের বাজেটে সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা খরচের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা চলে যাবে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ, আসলসহ অন্যান্য পরিচালনা খরচে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ বলছেন, বেতন বাড়ানো দরকার। কিন্তু তার চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বেশি জরুরি। কারণ বেতন দ্বিগুণ বাড়লে পণ্যের দাম তিন-চারগুণ বেড়ে যেতে পারে। ফলে তখন সমস্যা আরও প্রকট হবে।

গত পাঁচ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আয় বেড়েছে গড়ে ৩৫ শতাংশ। বিপরীতে ৪২ শতাংশ ঋণ বেড়েছে। ঘাটতি মেটাতে সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার ১ লাখ ৮৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ঋণ নেয়।

অর্থ বিভাগের তথ্যমতে, সরকারি ব্যয়ের বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে বেতন-ভাতা, পেনশন ও ঋণের সুদ পরিশোধে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ২৫ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে পরিচালন খাতে ব্যয় হয়েছে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা। আর উন্নয়ন খাতে ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৬ শতাংশ গেছে পরিচালন ব্যয়ের পেছনে।

গত পাঁচ অর্থবছরে প্রতি বছরই ধারাবাহিকভাবে পরিচালন ব্যয়ের বিপরীতে কমছে উন্নয়ন ব্যয়। উন্নয়ন ব্যয়ের সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্ক রয়েছে। উন্নয়ন খাতে ব্যয় বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। ব্যয় কমে গেলে কর্মসংস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নতুন বেতন কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের উন্নয়ন খাতের ব্যয় আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে।

সরকারি চাকরিজীবীদের সব গ্রেডের একসঙ্গে বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, সরকারের বর্তমান রাজস্ব আয় কম। প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। এ অবস্থায় মোটা অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি হলে তা বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য কঠিনই হবে। বেতন বৃদ্ধির আগে অর্থায়ন কীভাবে হবে, তা নিশ্চিত করা দরকার।

তার ভাষায়, পরিচালন ব্যয় বাড়ালে তা পরিশোধের পথ আগে ঠিক করে নিতে হবে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নিচের গ্রেডে যতটুকু বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে, সেটির যৌক্তিকতা রয়েছে। এখন শুধু এ স্তরে হাত দিলেই হতো। সব পর্যায়ে মোটা অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি করলে সরকারকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ‘পে-কমিশন সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে বাজেটে ন্যূনতম ১ লাখ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এটি পরিচালন ব্যয়ের অংশ এবং এ ক্ষেত্রে ঋণ করা কোনো বিকল্প হতে পারে না। কারণ, ধার করে বেতন দেওয়া কখনোই টেকসই অর্থায়ন পদ্ধতি হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায় বাড়ানো অথবা অন্য ব্যয় কমানো দুটি উপায় আছে। অন্য ব্যয় কমানোর জায়গাও সীমিত। আবার গত কয়েক বছর ধরে নানা চেষ্টার পরও রাজস্ব আয় ৪ লাখ কোটির টাকার ওপর উঠছে না। বেতন-ভাতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে, সে অঙ্ক মেলাতে পারছি না।’

বেসরকারি খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের বেসরকারি খাত এক ধরনের সংকটকাল অতিক্রম করছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নির্বাচন ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহী হচ্ছেন না। বিনিয়োগ না বাড়ায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চ সুদহার, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও আমদানি ব্যয়ের চাপ বেসরকারি খাতের সংকটকে আরও গভীর করছে। আগামী কয়েক মাসে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনীতির স্থবিরতা কাটবে, সেই প্রত্যাশাও কম।

সরকারি হিসাবে দেশে এখন বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। কিন্তু পছন্দমতো কাজ পান না, এমন লোকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। তাদের ছদ্মবেকার বলা হয়।

আইএমএফ, স্ট্যাটিস্টা ও জেপি মরগান রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির গড় হার নেমে এসেছে ৩ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোও গত বছর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। ভারতের মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে ১ শতাংশের নিচে, শ্রীলঙ্কায় তা প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি আর পাকিস্তানে ৬ শতাংশের নিচে। অথচ বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখনো প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশের ঘরে। অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে মূল্যস্ফীতি এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে এনেছে, যদিও তা এখনো অনেক বেশি।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মজুরি বৃদ্ধি না পাওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে টানা তিন বছর ১০ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম। বাজারে জিনিসপত্রের দামও বেড়েছে। দারিদ্র্য কমার পরিবর্তে তা বেড়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। কারণ বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানো অত্যন্ত কঠিন। এতে সমাজে বৈষম্য বাড়িয়ে বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

এর আগে ২০১৫ সালে বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের পাশাপাশি অতিরিক্ত ৫ ও ১০ শতাংশ বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছেন। এ ছাড়া সহজ শর্তে গাড়ি কেনার ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের ভাতাও তারা ভোগ করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত