নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য, আয়, সম্পদ, ঋণ ও দায় বিবরণী কতটা সঠিক এবং আয় ও সম্পদ কতটা বৈধ উপায়ে অর্জিত তা যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশনের পরিচালক মো. তৌহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই আহ্বান জানানো হয়।
এতে বলা হয়, হলফনামায় প্রার্থীরা নিজেদের অর্জিত সম্পদ কতটা দেখিয়েছেন, পুরোটা দেখিয়েছেন কিনা কিংবা দেশে-বিদেশে সম্পদের হিসাবে তথ্য গোপন করেছেন কিনা- তা যাচাই যেমন অনিবার্য। তেমনি যে আয় ও সম্পদ অর্জনের তথ্য হলফনামা বিশ্লেষণে পাওয়া যাচ্ছে তা বৈধ আয়ের সঙ্গে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ- এ বিষয়গুলো যাচাইসাপেক্ষে জবাবদিহি নিশ্চিতের উদ্যোগ নিতে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও রাজস্ব বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
‘নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি’ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ ও ‘নো ইওর ক্যান্ডিডেট’বা কেওয়াইসি ড্যাশবোর্ড উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে টিআইবির পক্ষ থেকে এ মন্তব্য করা হয়।
এবিষয়ে পর্যবেক্ষণ করে টিআইবি বলে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে দ্বৈত নাগরিকত্ব বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া বাধ্যতামূলক এবং হলফনামার সঙ্গে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণও দাখিল করতে হয়। এবারের নির্বাচনে ২১ প্রার্থী বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব রয়েছে এবং তা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন হলফনামায়। কিন্তু টিআইবির নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা সত্ত্বেও কমপক্ষে দুজন প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি হলফনামায় উল্লেখ করে করেননি।
টিআইবির অধিকৃত তথ্যানুযায়ী, তারা বৃটিশ নাগরিক ছিলেন। আরেকজন প্রার্থীর ঘোষিত নির্ভরশীলের নামে ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যে কেনা ১.৪ মিলিয়ন পাউন্ড বাংলাদেশি টাকায় ২১০ কোটি টাকা মূল্যের বাড়ির সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে যা উক্ত প্রার্থীর হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি। নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী বাড়িটি কেনার ক্ষেত্রে শেল কোম্পানির আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। যার মূল মালিকানা কোম্পানির নিবন্ধন দেখানো হয়েছে আরব আমিরাতের দুবাইতে। আবার একজন প্রার্থী বিদেশে তার নিজের কোনো সম্পদের তথ্য না দিলেও স্ত্রীর নামে দুবাইতে ফ্ল্যাটের মালিকানা রয়েছে। একজন প্রার্থী বিদেশে তিনটি ফ্ল্যাটের মালিকানা থাকার ঘোষণা দিলেও সংখ্যাটি কমপক্ষে তিনগুণ এবং বিনিয়োগের সম্ভাব্য পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। আরেকজন প্রার্থী বিদেশে নিজস্ব মালিকানায় কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকার কথা স্বীকার না করলেও অনুসন্ধানে ১১টি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে। যার মধ্যে আটটিই বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত। একজন প্রার্থীর কর স্বর্গে (ট্যাক্স হেভেন কান্ট্রি) কোম্পানির নিবন্ধন থাকার পুরোনো তথ্য অনেকটাই প্রকাশিত থাকলেও এ বিষয়ে হলফনামায় উল্লেক করেনি।
হলফনামায় দাখিলকৃত তথ্য যাচাই করার সক্ষমতা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই, থাকলেও তার পূর্ণ ব্যবহার করা হয় না মন্তব্য করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রার্থীদের দাখিলকৃত হলফনামার তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের ব্যাপক তারতম্য দেখা গেছে। হলফনামার মাধ্যমে যে তথ্য দেওয়া হয় তা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন আছে। তথ্য গোপন করা হয়েছে কিনা, উল্লেখিত সম্পদ বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাকি দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত এবং দাখিলকৃত আয় বা সম্পদের বিপরীতে প্রদেয় করের পরিমাণ বাস্তবসম্মত কিনা- এই তিনটি বিষয় অনুসন্ধান করা জরুরি। তাতে করে জনগণের কাছে স্পষ্ট হবে তারা নির্বাচনে কেমন প্রার্থী পেতে যাচ্ছেন। কিন্তু এই তিনটির কোনোটিই কার্যত হয় না। তাই নির্বাচন কমিশনসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ বিষয়গুলো যাচাই করে সময়োচিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা করেন তিনি।
টিআইবির হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। যাতে চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৯৮১ জন এবং তাদের প্রায় ১৩ শতাংশ স্বতন্ত্র। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলগুলোর প্রার্থীদের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে। ইসলামপন্থী দলগুলোর প্রার্থী মোট প্রার্থীর ৩৬ শতাংশের বেশি, বিগত ৫টি নির্বাচনের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। প্রতিবারের মতো এবারও নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণের হার নগণ্য এবং জুলাই সনদে প্রস্তাবিত ৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা কোনো রাজনৈতিক দলই পূরণ করতে পারেনি।
প্রার্থীদের পেশা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৪৮ শতাংশের বেশি প্রার্থী মূল পেশা বিবেচনায় ব্যবসায়ী। আইন ব্যবসা ও শিক্ষকতা পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন যথাক্রমে ১২.৬১ ও ১১.৫৬ শতাংশ প্রার্থী। রাজনীতিকে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন ১.৫৬ শতাংশ প্রার্থী।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্যের ভিত্তিতে কোটিপতির সংখ্যা ৮৯১। অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের মোট মূল্যের ভিত্তিতে ২৭ জন প্রার্থীর সম্পদ রয়েছে শত-কোটি টাকার ওপর। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থীর সাড়ে ২৫ শতাংশেরই কোনো না কোনো ঋণ বা দায় আছে।
প্রার্থীদের সর্বমোট ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকার বেশি। সর্বশেষ পাঁচ নির্বাচনের মধ্যে এবার ঋণ বা দায়গ্রস্ত প্রার্থী সবচেয়ে কম হলেও, মোট ঋণের পরিমাণে তা সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে বর্তমানে মামলা আছে ৫৩০ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে, যা মোট প্রার্থীর ২২.৬৬ শতাংশ। আর অতীতে মামলা ছিল ৭৪০ জন বা ৩১.৬৪ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে। এবার সকল দলের প্রার্থীদের ঘোষিত সর্বমোট নির্বাচনী ব্যয় ৪৬৩.৭ কোটি টাকা, প্রার্থী প্রতি গড় ব্যয় সাড়ে ২২ লাখ টাকা। ঘোষিত সবচেয়ে বেশি ব্যয় বিএনপির ১১৯.৫ কোটি টাকা, দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ব্যয় ৮০.৬ কোটি টাকা।
হলফনামা বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, ২৫৯ প্রার্থীর তুলনায় তাদের স্বামী-স্ত্রী বা নির্ভরশীলদের অস্থাবর সম্পদ বেশি, ১১৮ প্রার্থীর তুলনায় তাদের স্বামী-স্ত্রী বা নির্ভরশীলদের বাড়ি বা ফ্ল্যাট সংখ্যা বেশি এবং ১৬৪ প্রার্থীর তুলনায় তাদের স্বামী-স্ত্রী বা নির্ভরশীলদের জমির পরিমাণ বেশি।
