একটি অপ্রিয় সত্য কথা বলি। বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, আমি-আপনি যা করছি, সবই কি অপরের কল্যাণে! তাহলে নিজের জন্য কে, কী করছি? আমার কথা বাদ দিন। আপনাকে বলি দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি (গুটিকয়েক) করছেন। দেশের মানুষের কল্যাণ-অকল্যাণ চিন্তা করছেন সর্বক্ষণ। খাওয়া-দাওয়া, ঘর-সংসার, আত্মীয়-স্বজন ভুলে সাধারণ মানুষকে নিয়ে দিন-রাত রাজনৈতিক চিন্তায় সময় পার করছেন। জীবনের গতিধারা যখন এমন স্রোতে বইছে তখন আপনি, কোন পরশ পাথরের স্পর্শে শত কোটি টাকার মালিক হলেন? মনে অদ্ভুত প্রশ্ন আসে বারবার। কোনো উত্তর পাই না। বিশেষ করে, আমরা যারা জাতীয় রাজনীতির ‘রা’ বুঝি না। আচ্ছা, রাজনীতি করলে কি টাকা আসে! কীভাবে? কে দেয়, কেন?
আমরা যারা পরিশ্রম করে দিন-রাত পড়াশোনা করেছি, নিজেকে উন্নত করব বলে, আমরা যারা শিক্ষার ছোঁয়া নিয়েছি- স্বচ্ছলতার সঙ্গে জীবন কাটাব বলে, আমরা যারা সৎ থেকেছি এ পর্যন্ত, অন্যের অভিশাপ মুক্ত থাকব বলে দেখি, তারাই এখন মহামূর্খ। ছাত্রজীবনে রাজনীতি করলেও, কেন যে রাজনীতিকে ‘পেশা’ হিসেবে নেওয়ার ইচ্ছে হলো না! ঘেন্না হয় নিজের ওপর, প্রচ- ঘেন্না। সমাজ যেদিকে চলে যাচ্ছে, তখন মনে হয় মদন মোহন তর্কালঙ্কারের লেখা শিশুতোষ ছড়া ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে’ অথবা ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/ সারা দিন আামি যেন ভালো মনে চলি/ আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে/ আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে।’ সতীনাথ বসাকের ‘আদর্শলিপি’তে স্থান পাওয়া ছড়াগুলোই আমাদের মগজ ধোলাই করেছে। ছোট্টবেলায় পড়া এই সত্য কথাগুলো, মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারি না। অনেক সুযোগ ছেড়ে আসার পর, ছা-পোষা জীবন চালাতে হয়। বর্তমানে অর্থই যখন সবকিছু, তখন ফালতু কথা পড়া বা শোনার সময় কোথায়? প্রথমেই অনেকে প্রশ্ন করেন এটা পড়লে বা জানলে কি টাকা আসবে! কখনো বলছি না, অনর্থ অর্থের মূল। এ রকমও বলছি না যে অর্থই অনর্থের মূল। এর কারণ হচ্ছে, যাদের কাছে অর্থ-মেধা নেই, তাদের আবার অর্থ-অনর্থ কী?
বর্তমানে চারদিকে অস্থিরতার মূল কারণ হচ্ছে, আমাদের শিক্ষার বিনাশ হয়েছে ভালোমতো। এর মানে হলো শিক্ষা এবং রাজনীতিকে প্রায় ধ্বংস করা হয়েছে। সফল হয়েছে ষড়যন্ত্র। ব্যর্থ হয়েছে নিজেকে উন্নত করার মুক্ত, সুন্দরস্পর্শী কথাগুলো। আর কী লাগে? দেশ ও সমাজ ক্ষয়ে যেতে বেশিদিন লাগবে না। বাচ্চারা, তালিয়া বাজাও। নিজেকে বেশ ফুরফুরে লাগছে না! বাংলাদেশের মানুষই এখন নিজ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে। তাদের মধ্যে কোনো সমষ্টিগত বন্ধন নেই। সবাই অনেকটা আলগা টাইপ। মনে হয়, টান দিলেই আলাদা হয়ে যাবে। পারলে তাদের মাথা নুয়ে আসে, দেনেওয়ালার পদস্পর্শে। এখানেও সেই অব্যর্থ মহৌষধ, অর্থ! কী যে মহাশক্তি লুকিয়ে আছে এখানে, কে জানে! মানে কী? জানে না আবার! হয়তো এমনই বলবে অনেকে। তাইতো মহর্ষি মনমোহনের কথা বলি ‘আমি অভাজন/সদা শঙ্কিত মন/অর্থহীন এ সংসারে/নাই কোনো বিদ্যা-বুদ্ধি/ হে অর্থ, করিতে তোমার স্তুতি/তোমার অজস্র মহিমা কীর্ত্তন/কে করিতে পারে।’ এবার পড়েছি গ্যাঁড়াকলে। এই বিষয়টা যে কাকে বলি! সমাধান কার পদস্পর্শে, কে জানে? জানে, জানে। যারা জানে, তাদের আমরা চিনি না। জানব তো দূরের কথা। কিন্তু এইভাবে না জানা, অদৃশ্য মহাশক্তিধরদের কাছেই সাধের জীবন বিলিয়ে দিতে হবে? এটা কি বেসরকারি ক্রয় চুক্তি, নাকি সরকারি ইজারা!
লেখক : সাংবাদিক
