ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিনই রাজধানীতে গুলিবিদ্ধ হন ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচন করার ঘোষণা দেওয়া ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। ওই ঘটনায় আতঙ্ক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সম্ভাব্য প্রার্থী থেকে শুরু করে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। সরকার অবশ্য ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ শুরু করে। এ ছাড়া রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার এবং সশস্ত্র রক্ষী (রিটেইনার) নিয়োগের সিদ্ধান্তের কথা জানান। গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি নীতিমালাও জারি করে। এরপর থেকে প্রতিদিনই জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে অন্ত্রের লাইসেন্স নেওয়ার আবেদন। এরপর থেকে রিটেইনারের জন্যও আবেদন বেড়েছে। তবে মন্ত্রণালয় বলছে, অধিকাংশ প্রার্থীরই নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সহিংসতার ঝুঁকি নেই বলে জেনেছেন গোয়েন্দারা।
মনোনয়ন যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের পর আগামী নির্বাচনে ২৯৮টি আসনে ১ হাজার ৯৮১ প্রার্থী নির্বাচন করছেন। তবে এই বিপুলসংখ্যক প্রার্থীদের মধ্যে থেকে এখন পর্যন্ত (২৪ জানুয়ারি) অস্ত্রের লাইসেন্স চেয়ে আবেদন করেছেন ৫০ জনের মতো প্রার্থী; যাদের মধ্যে মাত্র আটজনকে লাইসেন্সের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই অনুমতি দিচ্ছে মন্ত্রণালয়। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের বরাতে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, অধিকাংশ প্রার্থীরই নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সহিংসতার ঝুঁকি নেই। যাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকির আশঙ্কা করা হচ্ছে, তাদের তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। সেভাবেই অস্ত্র ও রিটেইনারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখার যুগ্ম সচিব জিয়া উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রার্থীরা বেশিরভাগই জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। অনেকে ফোনে আলাপ করছেন। তবে আবেদন করলেই অনুমতি দেওয়া হবে না। সবাইকে অস্ত্রের অনুমতি দিয়ে দিলেই তো হয় না। যিনি অস্ত্র কেনবেন, তিনি তো নির্বাচনের পর এই অস্ত্রটি তো আর ফেরত দিয়ে দেবেন না। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনা করেই অনুমতি দেওয়া হবে। আর যেকোনো ব্যক্তিকে অনুমতি দেওয়ার আগে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘নতুন নীতিমালার আওতায় অনুমোদিত লাইসেন্সের মেয়াদ হবে নির্বাচনের ফল ঘোষণার তারিখ থেকে পরবর্তী ১৫ দিন। ওই সময়ের পর এই লাইসেন্স স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে। তবে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সপ্রাপ্তির জন্য জারি করা নীতিমালার অন্যান্য শর্ত পূরণ হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সাময়িক লাইসেন্সকে সাধারণ লাইসেন্সে রূপান্তর করতে পারবে। লাইসেন্সের মেয়াদ অতিক্রান্ত হলে বা লাইসেন্স বাতিল হওয়ার পরও কোনো লাইসেন্সধারী ওই লাইসেন্সের বিপরীতে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নিজ দখলে রাখলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন মোতাবেক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
‘রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ও রিটেইনার নিয়োগ নীতিমালা’য় বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা এবং নির্বাচনকালীন সহিংসতা প্রতিরোধে রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স এবং রিটেইনার নিয়োগের লক্ষ্যে সরকার এই নীতিমালা প্রণয়ন ও জারি করেছে। নীতিমালায় রিটেইনারের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং পদপ্রার্থীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত ও অনুমোদিত সশস্ত্র ব্যক্তি।
যারা লাইসেন্স ও রিটেইনার পাবেন
এই নীতিমালার আওতায় যাদের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ও রিটেইনার নিয়োগের অনুমতি দেওয়া হবে, সে বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ অর্থ, সরকার কর্র্তৃক স্বীকৃত বর্তমান বা সাবেক উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং ‘পদপ্রার্থী’ অর্থ, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য উপযুক্ত কর্র্তৃপক্ষের কাছে মনোনয়নপত্র দাখিলকারী ব্যক্তি এটা পাবেন।
লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্যতা
আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য সরকার কর্র্তৃক স্বীকৃত রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হতে হবে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করতে হবে, উপযুক্ত কর্র্তৃপক্ষ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থা) কর্র্তৃক যাচাই করা নিরাপত্তাঝুঁকি বিদ্যমান থাকতে হবে, শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা থাকতে হবে এবং অস্ত্র সংরক্ষণের নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে। এই নীতিমালার অধীনে লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে এ-সংক্রান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা অন্যান্য নীতিমালা ও বিধান প্রযোজ্য হবে। তবে ব্যক্তিগত আয়কর প্রদানসংক্রান্ত অংশ শিথিলযোগ্য হবে।
রিটেইনার নিয়োগের শর্ত
নীতিমালায় বলা হয়েছে, শুধু প্রকৃত নিরাপত্তাঝুঁকি থাকলে রিটেইনার নিয়োগ অনুমোদন করা হবে; রাজনৈতিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে রিটেইনার নিয়োগ করা বা অনুমোদন করা যাবে না; কোনো রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা পদপ্রার্থী লাইসেন্সপ্রাপ্তির যোগ্য হলে এবং তিনি আগ্নেয়াস্ত্র ক্রয়ে অসমর্থ হলে বা অনিচ্ছুক হলে বৈধ লাইসেন্সসহ আগ্নেয়াস্ত্র আছে, তা পরিচালনায় সক্ষম এবং কোনো রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা পদপ্রার্থীর রিটেইনার হতে ইচ্ছুক, এমন কোনো ব্যক্তিকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ রিটেইনার নিয়োগ করতে পারবেন। এই নিয়োগ লাইসেন্স প্রদানকারী কর্র্তৃপক্ষ কর্র্তৃক অনুমোদিত হতে হবে।
রিটেইনারের যোগ্যতা
রিটেইনারের যেসব যোগ্যতা লাগবে, সেগুলো হলো, বাংলাদেশি নাগরিক ও ন্যূনতম বয়স ২৫ বছর; অপরাধমুক্ত ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্সপ্রাপ্ত; আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত (সশস্ত্র বাহিনী বা বাংলাদেশ পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা অগ্রাধিকার পাবেন; সরকারি হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত মেডিকেল ফিটনেস সনদপ্রাপ্ত)।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, একজন রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা পদপ্রার্থীর জন্য সর্বোচ্চ একজন রিটেইনার নিয়োগ হবে; নির্দিষ্ট মেয়াদের পর রিটেইনারের মেয়াদও সমাপ্ত হবে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, রিটেইনারের অনুকূলে কোনো আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু করা হবে না। রিটেইনার শুধু আগ্নেয়াস্ত্র বহনকারী হবেন। অস্ত্রসংক্রান্ত সব দায় লাইসেন্সধারীর ওপর বর্তাবে।
আচরণবিধি
এই নীতিমালার আওতায় আগ্নেয়াস্ত্র নিলে কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। এ বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে, অস্ত্র বহনকালে সর্বদা লাইসেন্স এবং অনুমোদন সঙ্গে রাখতে হবে; এই অস্ত্র ব্যবহার করে কাউকে ভয়ভীতি প্রদর্শন বা হয়রানি করা যাবে না; নিরাপত্তা ছাড়া অন্য কোনো কাজে বা উদ্দেশ্যে এই লাইসেন্সের আওতাভুক্ত অস্ত্র ব্যবহার করা যাবে না; এই লাইসেন্স এবং লাইসেন্সভুক্ত অস্ত্র হস্তান্তর করা যাবে না; প্রত্যেক লাইসেন্সধারীর জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্দেশ তাৎক্ষণিকভাবে পালন বাধ্যতামূলক হবে।
ভোটের আগে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
প্রার্থীদের নিরাপত্তা সংকট না দেখলেও আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির সার্বিক বিবেচনায় ৩১ জানুয়ারির মধ্যে বৈধ অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ-সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে নিকটস্থ থানায় বৈধ অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে। এ ছাড়া ঘোষিত তফসিল অনুসরণে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সধারীদের আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও প্রদর্শন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ থাকবে।
তবে ‘রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের অনুকূলে’ ‘আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ও রিটেইনার নিয়োগ নীতিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে বৈধভাবে মনোনয়নপত্র দাখিল ও গৃহীত জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী এবং তার সশস্ত্র রিটেইনারের ক্ষেত্রে বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধকরণ-সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে না।
এতে আরও বলা হয়েছে, এ আদেশ লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে দ্য আর্ম অ্যাক্ট ১৮৭৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারার বিধান অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
