সব ধর্মের মানুষের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। যেখানে ঘর থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল, রাস্তাঘাট ও গণপরিবহন সব জায়গায় নারীরা নিরাপদ থাকবে। তিনি বলেন, ঢাকায় নারীদের নিরাপত্তা আজ সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা। মা-বোনেরা চলাচলে নিরাপদ বোধ করেন না। ছিনতাই, মাদক, কিশোর গ্যাং সব মিলিয়ে আতঙ্কের পরিবেশ। আমরা নারীদের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ব।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গতকাল বুধবার জামায়াত আমির তার নিজ নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৫ আসনে গণসংযোগকালে এসব কথা বলেন। গতকাল সকাল থেকে কাফরুল হাইস্কুল, মনিপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয় মাঠ, মিরপুর ১০ নম্বর ফলপট্টিসহ বিভিন্ন অলিগলিতে গণসংযোগ ও পথসভায় বক্তৃতা করেন তিনি। বেলা সাড়ে ১১টায় উত্তর কাফরুল হাই স্কুল প্রাঙ্গণে প্রবেশের সময় শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া ও ভালোবাসায় অভিভূত হন আমিরে জামায়াত। ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এসে তার সঙ্গে হাত মেলালে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি আজ খুবই আনন্দিত। স্কুলের গেট দিয়ে ঢোকার সময় যখন সোনামণিরা আমার সঙ্গে হাত মেলাতে এগিয়ে এসেছে, সে দৃশ্য আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।’
গণসংযোগ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মূসাসহ স্থানীয় নেতাকর্মী, অভিভাবক ও সাধারণ জনগণ।
ন্যায়-ইনসাফের ভিত্তিতে দেশকে কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করতে সারা দেশে জামায়াতসহ জোট প্রার্থীদের বিজয়ী করার আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আল্লাহ যদি আমাদের দেশসেবা করার সুযোগ দেন এবং আপনারা দোয়া ও ভালোবাসা দিয়ে আমাদের সমর্থন করেন, তাহলে আমাদের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অগ্রাধিকার হবে শিক্ষা। কারণ শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতিই উন্নত হতে পারে না। তিনি বলেন, ‘আমরা দুটি বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে চাই নৈতিক শিক্ষা এবং পেশাগত শিক্ষা। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে এ দুটিরই মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। আমরা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে এসব বিষয়ে অগ্রাধিকারভিত্তিতে কাজ করব, ইনশাআল্লাহ।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষাক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা ও মানহীন শিক্ষার কারণেই আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করে নিজেদের দেশ-বিদেশে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারছে না। শিক্ষার মান নিশ্চিত করে নৈতিকতা ও পেশাগত দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে তারা বিশ্বের যে কোনো জায়গায় নিজেদের গর্বিত নাগরিক হিসেবে তুলে ধরতে পারবে। তখন কাজই তাদের খুঁজে নেবে।’
এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির, মিরপুর-১৫ আসনের পরিচালক আবদুর রহমান মুসা, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলামসহ প্রমুখ।
মিরপুরসহ ঢাকা মহানগরীকে একটি নিরাপদ শহর হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা থাকবে। সবার জন্য উন্নয়ন নিশ্চিত করে একটি ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে। যানজটের অভিশাপ থেকে ঢাকাবাসীকে মুক্ত করা হবে। শিশুপার্ক, খেলার মাঠ ও সবুজায়ন নিশ্চিত করা হবে। একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য রাজধানী তৈরি করা আমাদের প্রত্যয়। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে সৎ, যোগ্য ও দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সব ধর্মের মানুষ নিরাপদ থাকবে। ব্যবসায়ীরা নিশ্চিন্তে ব্যবসা করতে পারবেন এমন পরিবেশ তৈরি করা হবে।
আমিরে জামায়াত বলেন, আজ আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আমি গভীর দায়িত্ববোধ অনুভব করছি। কারণ মিরপুর শুধু ঢাকার একটি এলাকা নয় মিরপুর হলো সংগ্রামের প্রতীক, সাহসের প্রতীক, প্রতিবাদের প্রতীক। এই মিরপুর জুলাই বিপ্লবের অন্যতম দুর্গ ছিল। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এই মিরপুরই আজ অবহেলা, দখলদারি, যানজট, জলাবদ্ধতা, অপরাধ আর অনিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, যানজট আজ আমাদের নিত্যদিনের সমস্যা। বাস আছে, কিন্তু শৃঙ্খলা নেই। ফুটপাত দখল হয়ে গেছে, মানুষ বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামছে। এটি পরিকল্পিত অব্যবস্থাপনার ফল। আপনারা আমাদের দায়িত্ব দিলে সঠিক ব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে আনা হবে।
ডা. শফিক বলেন, বাস রুট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে। ঢাকায় মেট্রোরেলের পরিসর আরও বাড়ানো হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে। মনে রাখবেন, যাদের চাঁদা তোলার মানসিকতা রয়েছে, তারা ফুটপাত দখলমুক্ত করতে চাইবে না। স্থানীয় রাস্তাগুলোর পরিকল্পিত ও টেকসই সংস্কার করা হবে। জাতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে মিরপুরকে ঢাকার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা হবে।
আজ বৃহস্পতিবার জামায়াত আমির ঢাকার কারওয়ান বাজার পেট্রোবাংলার সামনে, মিরপুরের ওয়াক আপ উচ্চবিদ্যালয় মাঠ, মিরপুর-১২ কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ এবং বনানী কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ : জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের মান্যবর রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান। গতকাল জামায়াত আমিরের কার্যালয়ে সাক্ষাৎকারটি আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় বলে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায় দলটি। এ সময় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাড. এহসানুল মাহবুব জুবায়ের উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনাকালে আমিরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান বাংলাদেশ এবং ফিলিস্তিনের গভীর ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং জোর দিয়ে বলেন, দল-মত নির্বিশেষে বাংলাদেশের জনগণ সর্বদা ফিলিস্তিনের ন্যায়সংগত সংগ্রামের পাশে থাকবে। তিনি ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের দখল ও জোরপূর্বক উচ্ছেদের ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা অবিলম্বে বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জাতিসংঘ, ওআইসি ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ফিলিস্তিন পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের দোয়া, ভালোবাসা, সহযোগিতা ও অকৃত্রিম সমর্থন অব্যাহত থাকবে।
উত্তরে রাষ্ট্রদূত ফিলিস্তিনি জনগণের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের আন্তরিক সমর্থন ও সংহতির জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং আশা প্রকাশ করেন, এই সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
চট্টগ্রামে জামায়াতের জনসভা ২ ফেব্রুয়ারি : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নির্বাচনী জনসভা। জামায়াতে ইসলামীর আমিরসহ ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা জনসভায় বক্তব্য রাখবেন।
চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের এ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি মুহাম্মদ উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে জানান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে এই জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় আমির ডা. শফিকুর রহমান এতে প্রধান অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখবেন।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান বুধবার সকালে জনসভাস্থল চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি জনসভার সার্বিক প্রস্তুতি, মঞ্চ নির্মাণ, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ব্যবস্থা, স্বেচ্ছাসেবক টিমসহ বিভিন্ন দিক ঘুরে দেখেন এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। এ সময় তিনি বলেন, এই নির্বাচনী জনসভা চট্টগ্রাম মহানগরীর রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে এ জনসভা সর্বাত্মকভাবে সফল হবে বলে আমরা আশাবাদী।
মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, এ জনসভাকে ঘিরে চট্টগ্রামের তরুণ সমাজের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ছাত্র ও যুবসমাজ দলে দলে জনসভায় অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তরুণদের এই জাগরণ আগামীর রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
এ সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা খাইরুল বাশার, চট্টগ্রাম মহানগরীর সাংগঠনিক সম্পাদক ও শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি এসএম লুৎফর রহমান, চট্টগ্রাম মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য আমির হোছাইন, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সেক্রেটারি আবু তালেব চৌধুরী বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘের সভাপতি মুহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সেক্রেটারি মোহাম্মদ ইয়াসিনসহ মহানগরী জামায়াতে ইসলামী, শ্রমিক ও ছাত্র নেতারা এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা উপস্থিত ছিলেন।
