মুসলমানদের চাপে রাখার ঘোষণা আসাম মুখ্যমন্ত্রীর

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:১৬ এএম

আসামে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বাংলাভাষী মুসলমানদের লক্ষ্য করে অত্যন্ত তীব্র ও বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। রাজ্যে চলমান ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন (স্পেশাল রিভিশন বা এসআর) প্রক্রিয়ার মধ্যেই তিনি দলীয় কর্মীদের প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছেন এ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যত বেশি সম্ভব অভিযোগ দায়ের করতে এবং তাদের চাপের মধ্যে রাখতে।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৭ জানুয়ারি ডিব্রুগড় (বা ডিগবই) এলাকায় এক সরকারি অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্বীকার করেন, বিজেপি কর্মীরা ইচ্ছাকৃতভাবে এ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ফর্ম-৭-এ অভিযোগ করছে। তিনি বলেন, এটি কোনো গোপন বিষয় নয় বরং দলের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান।

তার মতে, যদি এ অভিযোগগুলো না করা হয় তাহলে মনে হবে আসামে কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নেই। তিনি এই প্রক্রিয়াকে ‘অস্তিত্বের লড়াই’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং দাবি করেন, এ সম্প্রদায়কে চাপে না রাখলে তারা জমি, সম্পত্তি ও রাজনৈতিক অধিকার দখল করে নেবে।

মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায়, ‘যদি আমরা মিঁয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ না করি, তাহলে মনে হবে আসামে অবৈধ বিদেশি বলে কিছু নেই। আমি দলের সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছি যেন তারা যত বেশি সম্ভব অভিযোগ করে শুধু মিঁয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে। এদের চাপে রাখতে হবে, না হলে তারা আমাদের মাথার ওপর চড়ে বসবে। এটা অসমীয়াদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।’

তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন কীভাবে এই ‘চাপ’ সৃষ্টি করা যায়। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গুয়াহাটিতে অনেক মুসলমান অটোচালক রয়েছে তাদের অটোতে উঠে ভাড়া কম দিতে হবে (যেমন, ৫ টাকার জায়গায় ৪ টাকা), প্রয়োজনে উৎপাত করলে হাত তোলা যাবে। যেসব ক্ষেত্রে তারা কাজের সুযোগ নিয়েছে, সেখানে আক্রমণাত্মক হতে হবে। তিনি কন্ট্রাক্টরদেরও নির্দেশ দিয়েছেন মিঁয়াদের বাদ দিয়ে স্থানীয় অসমীয়াদের সুযোগ দেওয়ার জন্য। ভোটার তালিকা থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান সব ক্ষেত্রেই এ ‘সম্মিলিত আক্রমণ’-এর কথা বলেন তিনি।

তার এ মন্তব্য রাজ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন, কারণ সরকারের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ এখন নিরাপদ নয় বলে মনে করা হচ্ছে। গুয়াহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী হাফিজ রশিদ আহমেদ চৌধুরী এই বক্তব্যকে সংবিধানবিরোধী বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘একজন মুখ্যমন্ত্রী রাজনৈতিক স্বার্থে একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এভাবে হেনস্তার আহ্বান জানাচ্ছেন এটা শুধু দুর্ভাগ্যজনক নয়, অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর ফলে বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। আমরা আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

আসাম বিধানসভার বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকিয়া সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি লিখেছেন। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেছেন, ভোটার তালিকার এ সংশোধন প্রক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে, যা সাংবিধানিক ভোটাধিকার লঙ্ঘন করছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ‘মিঁয়া’দের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে নোটিস জারি করা হচ্ছে তাদের হয়রানি করার জন্য।

সারা আসাম সংখ্যালঘু ছাত্র সংগঠনের সভাপতি ইমতিয়াজ আলী বলেন, রাজনৈতিক ভাষা এতটা নিম্নমানের হয়ে গেছে যে, পরিবারের সঙ্গে টিভি দেখতেও অস্বস্তি হয়। তিনি বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে গণতান্ত্রিক অধিকার চুরির কথা বলছেন। এর সামাজিক প্রভাব ভয়াবহ হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর।’

পূর্বতন বিজেপি বিধায়ক ও বর্তমান কংগ্রেস নেতা আমিনুল হক লস্কর প্রশ্ন তুলেছেন নির্বাচন কমিশনের কাজে মুখ্যমন্ত্রীর এভাবে হস্তক্ষেপ ও প্রকাশ্য বক্তব্য দেওয়ার অধিকার আছে কি? তিনি বলেন, ‘এটা সংবিধানের অবমাননা। নির্বাচন কমিশন স্বাধীন সংস্থা, সরকার নয়।’

বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বয়ানে ‘মিঁয়া’ শব্দটি বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২০১৬ ও ২০২১ সালের নির্বাচনে ‘সরাইঘাটের যুদ্ধ’ সেøাগান দিয়ে এ ইস্যু তোলা হয়েছিল। এবার মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, ২০২৬-এর নির্বাচন হবে ‘আদি বাসিন্দা বনাম অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দ বদলালেও মূল বার্তা একই রয়ে গেছে। এ ঘটনা রাজ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ানোর পাশাপাশি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত