নীরব পদচারণায় শক্তিশালী আগমন

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৯ এএম

রাজনীতির মাঠ সব সময় বজ্রকণ্ঠের অপেক্ষায় থাকে না। কখনো ইতিহাস গড়ে ওঠে নীরবতার ভেতর দিয়ে। বিনয়ী কণ্ঠের কয়েকটি বাক্যে জন্ম নেয় ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। ব্যারিস্টার জাইমা রহমানের সাম্প্রতিক উপস্থিতি, ঠিক তেমনই নীরব অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে। তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বড় কোনো রাজনৈতিক ঘোষণা দেননি। উচ্চকিত স্লোগান কিংবা কঠোর ভাষার আশ্রয় নেননি। খুব সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে, শান্ত কণ্ঠে শুধু বলেছেন তিনি শিখতে এসেছেন। কিন্তু এই একটি বাক্যের ভেতরেই যেন লুকিয়ে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার অঙ্গীকার, ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। জাইমা রহমানের বক্তব্যে সরাসরি রাজনীতি ছিল না, কিন্তু রাজনীতির গভীর অর্থ ছিল প্রতিটি শব্দে। এটি ছিল এমন এক আগমন, যা উচ্চারণের চেয়ে উপলব্ধিতে বেশি শক্তিশালী। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান- বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ খুলে দিয়েছিলেন। আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া- গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে আপসহীন অবস্থান নিয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান-দীর্ঘ নির্বাসনে থেকেও যিনি দল পরিচালনা করেছেন, নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ রেখে রাজনীতিকে সচল রেখেছেন। এই তিনটি নাম শুধু একটি পরিবারের ইতিহাস নয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের শক্ত স্তম্ভ। ব্যারিস্টার জাইমা রহমান সেই ইতিহাসেরই উত্তরাধিকার। কিন্তু তিনি উত্তরাধিকারকে নামের ভারে বহন করতে আসেননি; তিনি এসেছেন তা বুঝতে, শিখতে এবং নিজের মতো করে আত্মস্থ করতে। তার বক্তব্যে কোনো অহংকার ছিল না। ছিল না ‘আমি আসছি নেতৃত্ব দিতে’ এমন কোনো ঘোষণা। বরং ছিল বিনয়ী স্বীকারোক্তি রাজনীতি শেখার আগ্রহ, মানুষের কথা শোনার মানসিকতা এবং সময়কে বুঝে চলার প্রত্যয়।

তারেক রহমান যখন রাজনীতির ময়দানে এসেছিলেন, তা ছিল প্রত্যক্ষ ও স্পষ্ট।  কিন্তু জাইমা রহমান সেই পথ অনুসরণ করেননি। তিনি যেন ইতিহাসের পাঠশালা থেকে প্রথমে পাঠ নিতে চেয়েছেন। এটি কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি এক ধরনের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। কারণ রাজনীতির মাঠে শক্তিশালী হওয়া মানেই সব সময় আগে কথা বলা নয় অনেক সময় আগে শুনতে শেখাটাই বড় শক্তি। গত ১৭ বছর ধরে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, কীভাবে তার বাবা তারেক রহমান বিদেশে থেকেও বাংলাদেশের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। কীভাবে আধুনিক প্রযুক্তি, রাজনৈতিক কৌশল এবং সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে দল পরিচালনা করেছেন। এই নীরব পর্যবেক্ষণই জাইমা রহমানের রাজনৈতিক পাঠ্যক্রম। জাইমা রহমানের রাজনৈতিক উপস্থিতির প্রথম দৃশ্যমান মুহূর্তটি আসে এক গভীর শোকের সময়ে। দাদি, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জাতি যখন শোকাহত, তখনই প্রকাশ্যে আসেন জাইমা রহমান। দাদির মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, তা ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির এক অধ্যায়ের সমাপ্তি। এই শোকের মুহূর্তেই জাইমা রহমানের উপস্থিতি ছিল দৃঢ় ও সংযত। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা যখন ঢাকায় এসে শোক জানাচ্ছিলেন, তখন বাবার পাশে তার সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তার শুভেচ্ছা বিনিময় নিছক প্রটোকল নয় তা ছিল রাজনীতির ভাষায় এক নীরব ইঙ্গিত। শোকের মুহূর্তে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি, কোনো আলোচনায় যাননি। কিন্তু তার উপস্থিতিই বলে দিচ্ছিল তিনি প্রস্তুত হচ্ছেন দায়িত্ব নিতে। রাজনীতিতে নতুন মুখ মানেই অনেক সময় অতীতের ছায়া এমন ধারণা থাকে। কিন্তু জাইমা রহমান সেই ছায়ার ভেতর থেকেও নিজের আলোর সম্ভাবনা তৈরি করছেন। তিনি কাউকে অনুকরণ করতে আসেননি, আবার কাউকে অস্বীকার করতেও নয়। তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ছিল আত্মপরিচয়ের স্পষ্টতা। তিনি জানেন তিনি কোথা থেকে এসেছেন, আবার এটাও জানেন যে সামনে যেতে হলে শিখতে হবে, বুঝতে হবে, সময় নিতে হবে। এই বিনয়ই তার সবচেয়ে বড় শক্তি।

আমাদের রাজনীতিতে বিনয় বিরল, আর বিরল জিনিসই সাধারণত সবচেয়ে মূল্যবান। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব নতুন নয়, কিন্তু জাইমা রহমানের উপস্থিতি এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। তিনি আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে; উত্তরাধিকার দিয়ে নয়, প্রস্তুতি দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। জাইমা রহমান এখনো কোনো পদে নেই, কোনো দায়িত্বে নেই। কিন্তু রাজনীতির মাঠে তার হাতেখড়ি হয়ে গেছে। আর এই হাতেখড়ি হয়েছে কোনো ঘোষণা দিয়ে নয় একটি বিনয়ী উচ্চারণে, একটি শান্ত উপস্থিতিতে। ব্যারিস্টার জাইমা রহমান সেই দ্বিতীয় পথের যাত্রী বলে মনে হচ্ছে। জাইমা রহমান এখনই সক্রিয় রাজনীতিতে নামছেন না বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে তাকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে এমন ইঙ্গিত স্পষ্ট। দলীয় ফোরাম, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, নীতি-সংলাপ এবং ধীরে ধীরে সাংগঠনিক পরিচিতির পথেই তার অগ্রযাত্রা হতে পারে। এটি বিএনপির জন্যও কৌশলগতভাবে নিরাপদ। কারণ, এতে নতুন নেতৃত্ব আসবে ধীরে, অভ্যন্তরীণ সংঘাত ছাড়াই। ব্যারিস্টার জাইমা রহমান এখনো রাজনীতির মঞ্চে পূর্ণাঙ্গ চরিত্র নন তিনি একটি সম্ভাবনার নাম। তবে এই সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তিনি শব্দের চেয়ে নীরবতাকে বেছে নিয়েছেন, দাবি করার চেয়ে শেখার কথা বলেছেন। রাজনীতিতে কখনো কখনো এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী আগমনের সূত্র।

লেখক :  সিনিয়র সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত