সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডি হ্যাক করাকে ইঙ্গিত দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সামনে থেকে মোকাবিলার সাহস নেই দেখে ডাকাতের মতো, চোরের মতো পেছনে লেগেছে। তিনি বলেন, ‘নিজেদের আদর্শ, কর্মসূচি, পরিকল্পনা, বক্তব্য ও চরিত্র নিয়ে আসুন। বলতে পারবেন? আমাদের দল, আমাদের সরকারই পারবে একটি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে। বগলের তলে ঋণখেলাপি আর আপনি দেবেন বাংলাদেশ দুর্নীতিমুক্ত করে? এ কথা শুনে পেঁচাও হাসবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত কয়েক দিনে বাংলাদেশে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। তার প্রতিবাদ আমি করি। আমারও পিছু লেগেছে। সামনে থেকে মোকাবিলা করার সাহস নেই, তাই এখন পেছন থেকে লেগেছে। হ্যাঁ, পেছনের লোকরা পেছনেই পড়ে থাকবে, সামনে যেতে পারবে না। ওরা পেছন থেকে চাবুক মারবে, সিংহ পুরুষের মতো সামনে যাওয়ার সাহস হবে না।’
গতকাল সোমবার কক্সবাজার, লোহাগড়া ও সীতাকু-ে পৃথক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। সে সময় জামায়াতের নায়েবে আমির আ. ন. ম. সামশুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, কক্সবাজার জেলা আমির ও কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী অধ্যক্ষ নুর আহমেদ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমদ, জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, ঢাকসুর জিএস এসএম ফরহাদ, এনসিপি নেতা ডাক্তার ফাহমিদা মিতু, কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী শহর জামায়াতের আমির আব্দুল্লাহ আল ফারুক, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ভিপি শহিদুল আলম বাহাদুরসহ ১১-দলীয় জোটের নেতারা।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘জনগণ সব চালাকি বোঝে। জনগণ কেউ বোকা না। এখন রটাচ্ছে কোন আমলে কোন কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, ১১ দল ক্ষমতায় এলে জামায়াতের নেতৃত্বে এদের সবাইকে বাদ দিয়ে দেবে। আমাদের অঙ্গীকার ইনসাফ কায়েম। যেদিন থেকে নতুন বাংলাদেশের জন্ম হবে, সেদিন থেকে বাংলাদেশকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হবে, ইনশাআল্লাহ। এই বাংলাদেশ “উইল নট গো ব্যাক, উইল গো ফরওয়ার্ড”, ইনশাআল্লাহ।’
জামায়াতের আমির দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন, ‘আমরা পেছনের দিকে তাকাব না, সামনের দিকে এগিয়ে যাব। সেদিন থেকে আমরা সবার কাছে সততার আশা করব, স্বচ্ছতার আশা করব, দায়িত্বশীলতার আশা করব। আমরা চাই না সরকারের কোনো অফিস দলীয় ঠিকানা হোক। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা জনগণের হবেন, কোনো দলের হবেন না।’
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন জুলাই যোদ্ধাদের আশা পূরণের নির্বাচন উল্লেখ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই নির্বাচন হচ্ছে মা-বোনদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ, একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার নির্বাচন। এই নির্বাচন হচ্ছে শিশুর স্বপ্ন মেলে ধরার নির্বাচন। এই নির্বাচন হচ্ছে যে পচা, ঘুণেধরা রাজনীতি ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে, তার বিদায় জানানোর নির্বাচন। এটি ২০১৮ কিংবা ২০১৪ সালের নির্বাচন নয়। আগামী ১২ তারিখ এ দেশের আপামর জনগণ ফ্যাসিবাদকে লাল কার্ড দেখাবে। যারা জুলাই চেতনা ধারণ করে না, আমরা তাদের পক্ষে নেই।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘ডাকসু থেকে শুরু, আপাতত জকসুতে এসে থেমেছে। দেখেননিই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। যেখানেই এখন নির্বাচন, সেখানেই হারু পার্টি। হারার ভয়ে এখন সব নির্বাচন ঠেকিয়ে দেয়। এই যে জনস্রোত, এটা শুধু কক্সবাজারে নয়, এটা পুরো ৫৬ হাজার বর্গমাইলের দৃশ্য। এর আগে জুলাই তরুণরা জানিয়ে দিয়েছে, আমরা ইনসাফের পক্ষে, পুরনো রাজনীতির পক্ষে নেই, ফ্যাসিবাদের পক্ষে নেই।’
বিরোধীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘জোর করে মানুষের মন দখল করবেন? তা হবে না। মাহমুদা (ডা. মাহমুদা মিতু) কিন্তু বলেছে, তাকে নিয়েও বুলিং করা হচ্ছে, অপমান করা হচ্ছে। সে কে? তাদের (জুলাই যোদ্ধা) কারণেই তো আজকে অনেকে জেল থেকে বের হয়েছে। তাদের কারণে অনেকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছেন। তাদের কারণে অনেকে দেশে আসার সুযোগ পেয়েছেন। আজকে সেই উপকারকে আপনি উপহাস করেন? এটা তাদের জন্য বুমেরাং হবে, ইনশাআল্লাহ।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘জুলাই যোদ্ধারা রাস্তায় নেমে বলেনি, আমাদের বেকার ভাতা দেন। তারা বলেছে, আমাদের কাজ দেন। আমার পাওনা কাজটি আমার হাতে তুলে দেন। আমু-মামুর টেলিফোন আর কোটায় আমার মেধা যেন হারিয়ে না যায়। এই ছিল তাদের দাবি।’ তিনি বলেন, ‘যুবকরা বলেছে আমার মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী আমার যেটা প্রাপ্য, আমার হাতে সেটা দেন। আমরা যুবকদের বলছি পরিষ্কারভাবে, আমরা যুবকদের হাতে বেকার ভাতা তুলে দিয়ে অপমানিত করব না। আমরা তাদের প্রত্যেকটি হাতকে মজবুত করে গড়ে দেব, দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে। তারপর কাজ তুলে দিয়ে বলব এবার আগাও। এ দেশ তোমার এবং চিৎকার দিয়ে তারা বলবে, আমিই বাংলাদেশ।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সেই বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক বানাতে চাই যুবসমাজকে। বন্ধুগণ, বিভিন্ন ধরনের অনেক কিছু রটায়। কারা করে এগুলো? যখন দেখে চতুর্দিকে অন্ধকার, তখন দিনকে রাত মনে হয়। কী করবে, কী বলবে হিসাব খুঁজে পায় না। কিন্তু মনে রাখবেন, এ দিয়ে জনগণের ভালোবাসার জোয়ার ঠেকানো যাবে না। জনগণের দেহের ওপর চাবুক মারতে পারবেন, মনের ওপর চাবুক মারতে পারবেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘অতীতের অনেক কিছু নিয়ে আমরা ছাড় দিতে পারি, কিন্তু কিছু বিষয়ে ছাড় দিতে পারব না। যেমন : আবু সাঈদের হত্যাকারীরা, আবরার ফাহাদের হত্যাকারীরা। এদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত কোনো ছাড় নেই। শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকারীদের জন্য কোনো দয়া-মায়া নেই। এটি ন্যায্যতার দাবি।’
তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘এই কক্সবাজার এখন পর্যন্ত কেন হংকং হতে পারল না, কেন সাংহাই হতে পারল না, কেন সিঙ্গাপুর হতে পারল না? পারল না অসৎ, দুর্নীতিবাজ ও ব্যাংক ডাকাতদের কারণে। এরা জনগণ নিয়ে চিন্তা করে না। নিজেরা পড়ে আছে বাংলাদেশে, চৌদ্দ গোষ্ঠী পাঠিয়েছে বিদেশে। এরাই আমাদের দেশ লুটেপুটে শেষ করে দিয়েছে।’
আজ গাজীপুরে যাচ্ছেন : গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, জামায়াত আমির আজ মঙ্গলবার গাজীপুরে যাচ্ছেন। তিনি দুপুরে গাজীপুরের ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজবাড়ী মাঠে ১১ দলীয় জোট আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখবেন।
জামায়াতের আমির এর আগে ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর সকালে গাজীপুর জেলা শহরের রাজবাড়ী ময়দানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে শাহাদাতবরণকারী পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।
গাজীপুর জেলা জামায়াতের আমির ডা. জাহাঙ্গীর আলম ও গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক জামাল উদ্দিন জানান, দীর্ঘদিনের দুঃশাসন, অনিয়ম ও বৈষম্যে ক্লান্ত মানুষের জন্য এই জনসভা হবে আশার নতুন ঠিকানা। এই জনসভা থেকে জনগণের ভোটাধিকার, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হবে।
ইতিমধ্যে জনসভা সফল করতে গাজীপুর মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক প্রস্তুতি ও প্রচার-প্রচারণা চলছে। জনসভায় গাজীপুরের পাঁচটি আসনে জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেবেন জামায়াতের আমির।
১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই : এদিকে চট্টগ্রাম নগরীর বন্দর স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় জামায়াত আমির ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে’র প্রার্থীদের ভোট দিয়ে বিজয়ী করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আমি জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না। আমি এ দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই।’ তিনি বলেন, “চট্টগ্রামের এই সমুদ্রপাড়ের মানুষ ঢেউ-জলোচ্ছ্বাসকে ভয় পায় না। এ ভয়কে যারা জয় করেছে, ১২ তারিখও তারা জয় করবে। এদিন নতুন ইতিহাস তৈরি হবে। জুলাইকে আঁকড়ে ধরার জন্য ‘হ্যাঁ’ ভোটকে বিজয়ী করতে হবে। একই সঙ্গে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীদের যেখানে যার হাতে যে প্রতীক আমরা তুলে দেব তার পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।”
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “চট্টগ্রাম মহানগরী শুধু বন্দরনগরী নয়, শুধু বাণিজ্যিক রাজধানী নয়; এটি এক সুদীর্ঘ সংগ্রামী ইতিহাস আর প্রতিরোধের রাজধানী। বাংলাদেশে ৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণা এখান থেকেই হয়েছিল। চট্টগ্রামের গর্বিত সন্তান বর্তমানে এলডিপির চেয়ারম্যান ড. অলি আহমদ বীরবিক্রম চিৎকার দিয়ে বলেছিলেন ‘উই রিভোল্ট’। জিয়াউর রহমান সাহেবকে হাতে ধরে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আজ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমি লড়াই করেছি রণাঙ্গনে। জাতীয়তাবাদী দল গঠনে আমি ছিলাম তৃতীয় ব্যক্তি। তিনি এখন বলেন, আমি বিএনপিতে নাই থাকতে পারি না। কারণ, এটি জিয়াউর রহমান সাহেবের বিএনপি নয়। এটি বেগম জিয়ারও বিএনপি নয়।”
চট্টগ্রামকে গর্বের চট্টলা হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, ‘অনেকে আক্ষেপ করে বলেন, এটা এখন নামে বাণিজ্যিক রাজধানী, ভেতরে ফকফকা। কিছু মানুষ যুগ যুগ ধরে চট্টগ্রাম বন্দরকে বিক্রি করে কপাল বানিয়েছে। আগামীতে এই সুযোগ আর দেওয়া হবে না। জনগণের বন্দর জনগণের হবে।’
তিনি বলেন, ‘এ বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। এ জন্মভূমির প্রতি ইঞ্চি মাটির পাহারাদারি করা আমাদের দায়িত্ব। এর আধইঞ্চি মাটিও আমরা কাউকে দেব না। জুলাই যোদ্ধারা বলেছিল জীবন দিব জুলাই দিব না। আমরা তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলছি জীবন দিব মাটি দিব না। কোনো আধিপত্যবাদ আর বাংলাদেশে মানা হবে না। বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। আমাদের যুব সমাজ প্রমাণ করেছে দেশের মর্যাদা রক্ষার জন্য যেকোনো সময় বুক চিতিয়ে লড়াই করতে তারা প্রস্তুত।’
চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক আহসান উল্লাহ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাত উল্লাহ, ডাকসু জিএস ফরহাদ হোসেন, জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা মিতু, ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য মনোনীত চট্টগ্রাম-৮ আসনের প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফ, চট্টগ্রাম-৯ আসনের ডা. এ কে এম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম-১০ আসনের অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী, চট্টগ্রাম-১১ আসনের প্রার্থী মো. শফিউল আলমসহ জামায়াতে ইসলামী ও জোটভুক্ত বিভিন্ন দলের স্থানীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন।
এর আগে ডা. শফিকুর রহমান মহেশখাল, কক্সবাজার, লোহাগাড়া ও সীতাকু-ে পৃথক চারটি নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখেন।
