কারিগরি প্রশিক্ষণে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪০ এএম

স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩-এর জরিপে দেখা যায়, দেশের ৩৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ তরুণ জনগোষ্ঠীর কোনো শিক্ষা, প্রশিক্ষণ কিংবা কাজ নেই। অর্থাৎ, তারা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছেন না, আবার কোথাও কর্মরতও নন। জনশুমারি ২০২২-এর প্রতিবেদন অনুসারে, এই জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন মোট ১ কোটি ৮ লাখ ১১ হাজার ৪০৪ জন। প্রতিবছর এর পরিমাণ বাড়ছে। বিপুল এই জনসংখ্যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কোনো অবদান রাখতে পারছে না, বরং বোঝা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। তাদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত প্রকল্প ‘অ্যাকসেলারেটিং অ্যান্ড স্ট্রেনদেনিং স্কিলস ফর ইকোনমিক ট্রান্সফরমেশন (অ্যাসেট)’।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীন কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের লক্ষ্য দেশীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের উপযোগী দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তোলা। প্রকল্পটি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার মান উন্নয়ন, সংক্ষিপ্ত কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান, এন্টারপ্রাইজভিত্তিক প্রশিক্ষণ সহজীকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মজীবনে প্রবেশে সহায়তা প্রদানসহ নানাবিধ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। ঢাকার আগারগাঁওয়ে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ভবনে অবস্থিত অ্যাসেট প্রকল্পের কার্যক্রম ২০২১ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়েছে এবং চলবে এ বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

অ্যাসেট প্রকল্পের অন্যতম বড় উদ্যোগ হচ্ছে সম্পূর্ণ বিনা খরচে বেকার যুবসমাজকে স্বল্পমেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান করা। ২ লাখ ৩ হাজার তরুণ-তরুণীকে ৪৩টি অকুপেশন বা বিষয়ে ৩৬০ ঘণ্টা বা তিন মাস মেয়াদি এ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড অনুমোদিত সরকারি-বেসরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং মন্ত্রণালয়-অ্যাফিলিয়েটেড টিটিসি ও আরপিটিআইয়ের মাধ্যমে এসব প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ১৭৪টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশব্যাপী ৬৪ জেলায় চলমান এ প্রশিক্ষণে নিয়মিত উপস্থিতি ও কম্পিটেন্ট হওয়া সাপেক্ষে সাধারণ প্রশিক্ষণার্থীরা মাসে ১,৫০০ টাকা এবং নারী, প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রশিক্ষণার্থীরা মাসে ২ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন। পাশাপাশি যাতায়াত ভাতা হিসেবে প্রত্যেককে দৈনিক ১০০ টাকা করে প্রদান করা হচ্ছে।

১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী যে কেউ এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারেন। তবে নারী ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সদস্যদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ফেশিয়াল রিকগনিশন ক্যামেরা ও বায়োমেট্রিক হাজিরা পদ্ধতি চালু রয়েছে। সব ধরনের ভাতা ও বৃত্তি সরাসরি ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। আর প্রশিক্ষণ শেষে এনএসডিএ-এর মাধ্যমে প্রদান করা হয় সরকারি সার্টিফিকেট। শুধু তাই নয়, পাস করার পর যাতে প্রশিক্ষণার্থীরা মর্যাদাসম্পন্ন কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারেন, সে বিষয়েও প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়ে থাকে। এ পর্যন্ত ১,৩৩,৬৩৭ জন এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৪৯০ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

কর্মে নেই, আবার পড়ালেখাও করছেন না এমন জনযুবগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে অ্যাসেট প্রকল্প বিশেষভাবে চালু করেছে এন্টারপ্রাইজভিত্তিক প্রশিক্ষণ বা ইবিটি। এটি মূলত পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের অংশ হিসেবে ইন্ডাস্ট্রি বা কলকারখানার মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষা প্রদানের বাস্তবমুখী কার্যক্রম। এর আওতায় ছয়টি ক্যাটাগরিতে মোট ২ লাখ ২২ হাজার ৫০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদি প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে EMTP-Soft Skills, ১৪ দিনের  MMTP-Soft Skills, ২১ দিনের  SUTP-Technical Skills, ৩ মাসের ADTP/TSTP- Technical Skills এবং ৬ মাসের IHTP-Technical Skills Training)|

মোট ছয় ধরনের এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিল্প মালিক থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা, কলকারখানার উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি নতুন নতুন কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য সারা দেশের বেকার ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকেও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। যুক্ত হচ্ছে রি-স্কিলিং এবং আপস্কিলিং প্রশিক্ষণও। শিল্প দক্ষতা পরিষদ (ISC) বা শিল্প সংস্থা (Industry Association) অথবা শিল্প সহযোগীদের (Industry Partner) নিয়ন্ত্রণাধীনে ও প্রত্যক্ষ তদারকিতে এবং শিল্প-কারখানার সরাসরি নেতৃত্বে এসব প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।

ইতিমধ্যে ৩৩টি ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং তাদের সাত শতাধিক ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে প্রায় ৫০ হাজার জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ কোর্সের মতো ইবিটি প্রশিক্ষণও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রেও নারী ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সদস্যদের একইভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে দেওয়া হয় বৃত্তি, ভাতা এবং সার্টিফিকেট। একটাই লক্ষ্য, হতে হবে দক্ষ এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথে এগিয়ে যাচ্ছে কারিগরি শিক্ষার জনপ্রিয় এ প্রকল্প।

ভর্তির তথ্য

৩৯টি সরকারি টিএসসি, ১টি নেকটার ও ৬টি বিটাক-এ এই প্রশিক্ষণ শুরু হবে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। ৬৪টি সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ শুরু হবে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে। ২৪টি বেসরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে (এসটিপি) এই প্রশিক্ষণ শুরু হবে ১ এপ্রিল থেকে। প্রতিষ্ঠানের তালিকা ও বিস্তারিত তথ্যের জন্য ভিজিট করুন www.asset-dte.gov.bd  এবং www.AproMIS.aap  এ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত