বাংলা একাডেমির ‘একতরফা’ সিদ্ধান্তে ‘প্রাণহীন’ বইমেলার আয়োজন

প্রাকৃতিক দুর্যোগের অজুহাতে ‘মানবিক ও বাণিজ্যিক বিপর্যয়’ মেনে নেবে না প্রকাশক সমাজ

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৯ পিএম

আজ বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ শত শত প্রকাশকের প্রাণের দাবি ও অস্তিত্বের সংকটকে উপেক্ষা করে একতরফাভাবে আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’ শুরুর যে ঘোষণা দিয়েছে, আমরা সৃজনশীল প্রকাশকবৃন্দ তাতে গভীর বিস্ময় ও চরম হতাশা প্রকাশ করছি। দেশের সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্পের সিংহভাগ অংশীজনের যৌক্তিক দাবি ও রূঢ় বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে আমরা ‘আত্মঘাতী’, ‘অগণতান্ত্রিক’ ও ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে মনে করি।

এর আগে বাংলা একাডেমি ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত বইমেলা আয়োজনের যে ঘোষণা দিয়েছিল, নির্বাচনলগ্নের বাস্তবতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমর্থন না থাকায় সেই সিদ্ধান্ত বাতিল হয়। এখন আবার কোনো অংশীজনের সাথে আলোচনা না করেই তড়িঘড়ি করে ২০ ফেব্রুয়ারি তারিখ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে যা প্রকাশকদের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কেন এই সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক ও আত্মঘাতী?

বাংলা একাডেমি তাদের প্রেস রিলিজে ঈদের পরে (এপ্রিল মাসে) মেলা আয়োজনে ঝড়-বৃষ্টি ও গরমের অজুহাত দেখিয়েছে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ‘সম্ভাবনা’র চেয়ে চোখের সামনে দেখা দেওয়া ‘নিশ্চিত মানবিক ও বাণিজ্যিক বিপর্যয়’ অনেক বেশি ভয়ের।

আমাদের আপত্তির যৌক্তিক কারণসমূহ আবারও স্পষ্ট করছি:

১. ভূতুড়ে মেলা ও পাঠকশূন্যতা: ২০ ফেব্রুয়ারি রোজার দিনে বইমেলা শুরু হলে পাঠক ও দর্শনার্থীরা মেলায় আসবেন না এটাই ধ্রুব সত্য। পাঠক ও ক্রেতা ছাড়া বইমেলা কেবল একটি ‘নিষ্প্রাণ সরকারি আনুষ্ঠানিকতা’ ছাড়া আর কিছুই হবে না।

২. মানবিক বিপর্যয় ও মানবাধিকার: মেলার প্রাণ হলো স্টলকর্মীরা, যাদের অধিকাংশই ছাত্র। সারাদিন রোজা রেখে, ইফতার ও দীর্ঘ তারাবিহ নামাজের পর এই হাজারো শিক্ষার্থীকে দিয়ে স্টলে কাজ করানো কি অমানবিক নয়? বাংলা একাডেমি কি এই ‘মানবিক অধিকার লঙ্ঘন’-এর দায় নেবে?

৩. নিশ্চিত অর্থনৈতিক আত্মহত্যা: গত দেড় বছরে কাগজ ও উপকরণের দাম বৃদ্ধি এবং বিক্রয় মন্দায় প্রকাশনা শিল্প এমনিতেই ধুঁকছে। এই সময়ে জোর করে একটি ব্যর্থ মেলা চাপিয়ে দিয়ে প্রকাশকদের নিশ্চিত লোকসানের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

আমাদের সম্মিলিত অবস্থান ও চ্যালেঞ্জ:

আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, প্রকাশক ও বাংলা একাডেমি পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়; বরং সহযোগী। সে কারণেই আমরা বাংলা একাডেমি ছাড়াও সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার শরণাপন্ন হয়েছি। মেলার আয়োজক একাডেমি হলেও মেলার ‘আত্মা’ হলো প্রকাশক ও পাঠক। যেখানে প্রকাশকরা প্রস্তুত নন এবং পাঠকরা আসার সুযোগ পাবেন না, সেখানে মেলা কার জন্য?

বাংলা একাডেমি এপ্রিলে ঝড়-বৃষ্টির ভয় দেখাচ্ছে। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলছি ঈদের পরে মেলা হলে যদি ঝড়-বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়, তবে সেই ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্পূর্ণ দায়ভার আমরা প্রকাশকরাই নেব। কিন্তু জেনেশুনে রোজার মধ্যে মেলা করে যে ‘নিশ্চিত মৃত্যু’ আপনারা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন, তার দায়ভার কে নেবে?

সতর্কবার্তা ও দাবি:

ইতিমধ্যে ৩২টি প্যাভিলিয়ন ও ১৫২টি স্টলের স্বনামধন্য প্রকাশকরা লিখিতভাবে রোজার মধ্যে মেলা না করার এবং ঈদের পরে মেলা আয়োজনের পক্ষে সম্মতি ও স্বাক্ষর প্রদান করেছেন। এছাড়াও আজকে আয়োজিত এক জুম মিটিংয়ে উপস্থিত সমস্ত প্রকাশক তাদের পূর্বের সিদ্ধান্তের বিষয়ে অনড় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাই এই বিশাল অংশকে বাদ দিয়ে মেলা আয়োজন করলে তা ইতিহাসের অন্যতম ‘ব্যর্থ ও কলঙ্কিত আয়োজন’ হিসেবে গণ্য হবে।

আমরা এখনো সরকারের উচ্চপর্যায় ও বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করছি দয়া করে প্রকাশকদের বক্তব্য ও বাস্তবতা অনুধাবন করুন। জেদ বজায় রাখতে গিয়ে একটি জাতীয় উৎসবকে ধ্বংস করবেন না। অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করুন এবং পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর উৎসবমুখর পরিবেশে মেলা আয়োজনের ব্যবস্থা করুন। অন্যথায়, উদ্ভুত যেকোনো পরিস্থিতির দায়ভার আয়োজক প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হবে।

ধন্যবাদান্তে,

সাধারণ প্রকাশকবৃন্দের পক্ষে (জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়)

১. মেছবাহউদ্দীন আহমদ (প্রকাশক, আহমদ পাবলিশিং হাউজ)

২. এ.কে নাসির আহমেদ (প্রকাশক, কাকলী)

৩. মাজহারুল ইসলাম (প্রকাশক, অন্যপ্রকাশ)

৪. মনিরুল হক (প্রকাশক, অনন্যা)

৫. সৈয়দ জাকির হোসাইন (প্রকাশক, অ্যাডর্ন)

৬. মো. জহির দীপ্তি (প্রকাশক, ইতি প্রকাশন; সদস্য, অমর একুশে বইমেলা কমিটি ২০২৬)

৭. মাহরুখ মহিউদ্দীন (প্রকাশক, ইউপিএল; সদস্য, অমর একুশে বইমেলা কমিটি ২০২৬)

৮. মাহাবুব রাহমান (প্রকাশক, আদর্শ; সদস্য, অমর একুশে বইমেলা কমিটি ২০২৬)

৯. মো. মোবারক হোসেন (পাণ্ডুলিপি সমন্বয়ক, প্রথমা প্রকাশন)

১০. ইকবাল হোসেন সানু (প্রকাশক, লাবনী)

১১. মিজানুর রহমান (প্রকাশক, শোভা প্রকাশ)

১২. ইফতেখার আমিন (প্রকাশক, শব্দশৈলী)

প্রয়োজনে: +৮৮০ ১৭১১-৫২১১৩৪ (মনিরুল হক, প্রকাশক অনন্যা)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত